কখনও ভেবে দেখেছেন মাত্র ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ আর্জেন্টিনা, ফুটবলে বিশ্বসেরা হলেও ভারত এখনও কেন ১৪২ নম্বরে?
গত ২ বছর আগে যেখানে ৪০ কোটি টাকা নেই বলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলার অফার প্রত্যাখ্যান করে AIFF (All India Football Federation)। যেখানে ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীর অনুরোধের পরেও ভরে না স্টেডিয়াম। সেখানে ২০২৫ সালে মেসিকে ভারতে আনার জন্য খরচ করা হল ১৫০ কোটি টাকা।
যেখানে ২০২৩-২৪-এ BCCI কামিয়েছে ৯৭৪১ কোটি টাকা, সেখানে AIFF-এর বার্ষিক বাজেটই মাত্র ১৩৪ কোটি টাকা। যেখানে ISL-এর টিকিট ১২০ টাকা হওয়া সত্ত্বেও লোক ভরে না স্টেডিয়ামে, সেখানে IPL-এ ৫০০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না টিকিট!
কিন্তু, জানলে অবাক হবেন – এই ফুটবলই ছিল এক সময় বাঙালি তথা ভারতবাসীর আবেগ। এই দেশেই শুরু হয়েছিল বিশ্বের তৃতীয় আর এশিয়ার সবথেকে পুরানো ফুটবল টুর্নামেন্ট। তাহলে হঠাৎ এমন কী হল যার জন্য আজ এত বেহাল অবস্থা ভারতীয় ফুটবলের? কেন বিশ্বসেরা ফুটবলের তালিকায় একেবারে পিছনে ভারত? কোন রাজনৈতিক নেতাদের কারণে এতটা পিছিয়ে পড়ল ভারতীয় ফুটবল? এই মুহূর্তে ঠিক কী করলে বিশ্বকাপে বিশ্বগুরু হতে পারবে ভারত? মোদী সরকারই বা কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো সেই সবকিছু তথ্য, যা এতদিন ধরে আমার-আপনার প্রত্যেকের কাছে অজানা হয়ে আছে।
ভারতে ফুটবলকে জনপ্রিয় করে তোলেন এক বাঙালি!
সালটা ১৮৭০। ব্রিটিশদের হাত ধরে প্রথমবার ভারতে আসে ফুটবল। আর ১৮৭২ সালে তৈরি হয় প্রথম ফুটবল ক্লাব – ক্যালকাটা এফসি। ধীরে ধীরে ফুটবলের ক্যাপিটাল হয়ে উঠেছিল কলকাতা। সেই সময়ে ফুটবল খেলত মূলত ইংরেজরাই।
তবে, এর পরিবর্তন ঘটান একজন বাঙালি, নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী। তিনিই ভারতীয়দের মধ্যে ফুটবলকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আর তাঁর নেতৃত্বেই ১৮৭৭ সালে কেবল ভারতীয়দের জন্য তৈরি হয় – দ্যা বয়েস ক্লাব। দেবের “গোলন্দাজ” সিনেমাটি তাঁর ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। এরপর ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্সি, ক্যালকাটা মেডিক্যাল, সেন্ট জেভিয়ার্স থেকেও তৈরি হয় একাধিক ফুটবল ক্লাব।
এরপর শুরু হয় বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় আর এশিয়ার সবথেকে পুরানো ফুটবল টুর্নামেন্ট! সালটা ১৮৮৮। ভারতের তৎকালীন বিদেশ সচিব মর্টিমার ডুরান্ড একটি টুর্নামেন্ট শুরু করেন, নাম হয় – ডুরান্ড কাপ। যা এশিয়ার সবচেয়ে পুরানো এবং বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীন ফুটবল টুর্নামেন্ট।
জন্ম হয় সবুজ-মেরুনের!
এরপর সালটা ১৮৮৯। তৈরি হয় ঐতিহাসিক ক্লাব – মোহনবাগান।
আর ১৮৯৩ সালে তৈরি হয় IFA অর্থাৎ ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তবে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার ফুটবলকে পরিচালনা করা। আর এরপর ধীরে ধীরে সারা দেশে ফুটবল ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
এরপর সালটা ১৯১১। ইতিহাস তৈরি করে মোহনবাগান, প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে জয় করে IFA শিল্ড। ওই সময়ে এই ম্যাচ দেখতে এসেছিল প্রায় ৮০,০০০ দর্শক। এর আগে পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট শুধুমাত্র ব্রিটিশরাই জিততো।
জন্ম হয় AIFF-এর
এরপর সালটা ১৯৩৭। সারা ভারতের ফুটবল পরিচালনার জন্য তৈরি হয় AIFF অর্থাৎ অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন।
তবে এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও, ভারতীয় ফুটবলের কোনও উন্নতি হচ্ছিল না। কারণ, ফুটবলের সাথে প্রায় একই সময়ে শুরু হওয়া হকি এই সময় পর্যন্ত অলিম্পিকে একাধিক গোল্ড মেডেল জিতে নিলেও, ভারতের ফুটবল দল তখনও পর্যন্ত অলিম্পিক খেলতেই পারেনি।
এরপর সালটা ১৯৪০। ডুরান্ড কাপ জিতে ইতিহাস তৈরি করে মহামেডান। কারণ ব্রিটিশ শাসিত ভারতের এই দলে সমস্ত খেলোয়াড়ই ছিল ভারতীয়।
এরপর সালটা ১৯৪১। AIFF শুরু করে সন্তোষ ট্রফি। যা সেই সময় লীগ ফরম্যাটে খেলা হত। আর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এটিকে ভারতের উচ্চতম ঘরোয়া সম্মান হিসাবে বিবেচনা করা হত।
এরপর সালটা ১৯৪৮। প্রথমবার স্বাধীন ভারত অংশ নেয় অলিম্পিকে। খুব ভালো পারফরম্যান্স করলেও একটি নক আউট গেমে ফ্রান্সের কাছে দুই-এক গোলে হেরে যায় ভারত।
আসে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তাব!
এরপর সালটা ১৯৫০। FIFA World Cup-এর তরফ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারতকে। কিন্তু ভারত এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। কারণ হিসাবে জানানো হয়, এক – দল বাছাই হয়নি, আর দুই – অনুশীলনের সময় নেই। কিন্তু জানা যায় এর পিছনে ছিল অন্য কারণ। তবে কারণ যাই হোক, এই প্রস্তাব নাকচ করার ফল ভুগতে হয় আগামী ৩৬ বছর ধরে।
কারণ, ১৯৫৪ সালে FIFA ব্যান লাগিয়ে দেয় ভারতের ওপর। যার ফলে FIFA আর AIFF-এর মধ্যে শুরু হয় ঠাণ্ডাযুদ্ধ। আর AIFF সিদ্ধান্ত নেয় কোনও বিশ্বকাপ না খেলার। এরপর ১৯৮৬ সালে ভারত যখন ফের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বকাপে যাওয়ার, ততদিনে ছোট-ছোট দলগুলো ভারতের থেকে উন্নত হয়ে উঠেছিল। যার ফলে ভারতের কাছে আজও বিশ্বকাপ খেলা একটি স্বপ্ন হয়ে রয়ে গিয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ!
ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর দশক ছিল খুবই উজ্জ্বল। কারণ তখন ভারতের কোচ ছিলেন – সইদ আবদুল রহিম, ভারতের সর্বকালের সেরা কোচ। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫১ আর ১৯৬২ সালে ভারত এশিয়ান গেমসে সোনা জেতে। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক্সে ভারত প্রথম এশিয়ান দল হিসাবে সেমিফাইনালে পৌছায়। এই সময়ে ভারতের ফুটবল এতটাই ভালো ছিল, যে আমাদের ব্রাজিল অফ এশিয়া বলা হত। অজয় দেবগনের “ময়দান” সিনেমাটি তাঁর ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।
এরপর ১৯৬৩ সালে রহিমের মৃত্যু হয়। ধীরে ধীরে ভারতীয় ফুটবলের পতন হতে শুরু করে। অবসর নেয় দলের একাধিক মূল খেলোয়াড়। তবে, এর পরেও বিভিন্ন সময়ে ভারতে একাধিক ভালো খেলোয়াড় এলেও দলের উন্নতি হয়নি সেইভাবে। কিন্তু কেন? কেন হারিয়ে গেল ফুটবলের স্বর্ণযুগ? তবে, এর পিছনে কোনও একটি নয়, রয়েছে অগুনতি কারণ –
প্রথমত, খালি পায়ে খেলা। যেখানে বিশ্বের সবাই বুট পরে খেলতো, সেখানে ভারত দীর্ঘদিন খালি পায়ে খেলেছে। বুট সর্বদাই খেলোয়াড়দেড় বাড়তি সুবিধা দেয়। তবে, এই নিয়ে AIFF অনেক পরে পদক্ষেপ নেয়।
দ্বিতীয়ত, কম সময়ের খেলা। যেখানে সারা বিশ্বে ৯০ মিনিটের খেলা হত, সেখানে আমাদের দেশে খেলা হত ৫০ মিনিটের। ফলত আমাদের খেলোয়াড়দের স্ট্যামিনা তৈরি হত না। এই নিয়মেও অনেক পরে পরিবর্তন করে AIFF।
তৃতীয়ত, কোচিং সমস্যা। রহিমের পর ভারতে আর ভালো কোনও কোচ তৈরি হয়নি, কারণ কোচ তৈরির কোনও কাঠামোই ছিল না। তুলনায় ইরান, যারা আমাদের সাথেই স্বাধীনতা হয়েছে, তাদের কাছে আজ ১৩৯ জন প্রো-লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচ আছে। আর ভারতে, মাত্র ১৪ জন।
চতুর্থত, ক্লাব বনাম দেশের দ্বন্দ্ব। ভালো খেলোয়াড়দের জন্য মোহনবাগান–ইস্টবেঙ্গল ভালো বেতন আর সম্মান দিত, সেখানে AIFF দিতো নামমাত্র পারিশ্রমিক। ফলে খেলোয়াড়রা ক্লাব বেছে নিত। আর যারা ক্লাবের সাথে দেশের হয়ে খেলতো তারা হয় ম্যাচ স্কিপ করতো, নাহলে ধীরে-সুস্থে খেলতো যাতে চোট না লাগে।
১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসের আগে, AIFF ক্যাম্প করলে খেলোয়াড়রা জানিয়ে দেয় — ক্যাম্পে গেলে ক্লাবের টাকা যাবে। শেষমেশ AIFF বাধ্য হয়ে মাসে ২০০০ টাকা দিতে রাজি হয়।
পঞ্চমত, গাছাড়া মনোভাব। যেমনটা আগেই বললাম, ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ৭টি বিশ্বকাপে ভারত একবারও টিম পাঠায়নি কোয়ালিফাই করার জন্য। কিন্তু, সেটা যদি আগেই পাঠাতো, তাহলে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকতো ভারত।
ষষ্ঠত, ক্রিকেট হয়ে ওঠে আবেগ। ১৯৮৩ সালে ভারত জিতে নেয় ক্রিকেট বিশ্বকাপ। আর এই জয় ভারতীয়দের রক্তের সাথে মিশিয়ে দেয় ক্রিকেটকে।
সপ্তমত, ফান্ডিং সমস্যা! ভারত বড় কোনও ম্যাচ খেলে না, ফলে ব্রডকাস্টিং রাইট থেকে টাকাও আয় করতে পারে না। পাশাপাশি রয়েছে একাধিক ফান্ডিং সমস্যা। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪-এ BCCI যেখানে আয় করেছে ৪৫০০ কোটি টাকারও বেশি, সেখানে AIFF-এর লোকসান ২৬ কোটি টাকা।
অষ্টমত, লীগ ব্যবস্থায় দেরি। ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, এমনকি জাপান-কোরিয়াতেও বহু আগেই চালু হয় আন্তর্জাতিক মানের ন্যাশনাল লীগ। কিন্তু, ভারতে প্রথম লীগ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। এর আগে স্টেট ফুটবল লীগ হলে, তাও হত মাত্র ৭টি রাজ্যে। ফলত রাজ্যের মধ্যেই সীমিত ছিল খেলোয়াড়রা। এরপর ২০০৭ সালে ন্যাশনাল লীগ পাল্টে শুরু হয় I-League। কিন্তু, সবই আন্তর্জাতিক লীগ ব্যবস্থার শর্ত পূরণে ব্যর্থ ছিল।
নবমত, বিদেশী ফুটবলের জনপ্রিয়তা। ঠিক ২০০১ সালে, ESPN, ভারতে আনে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জোয়ার। ভারতীয়রা দেশের ফুটবলের বদলে ভালোবেসে ফেলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, চেলসিকে। আর সেই ক্রেজ আগের থেকে এখন অনেকটাই বেড়েছে। রিপোর্ট বলছে, বর্তমানে ম্যান ইউয়ের ৩৮% ফ্যান ভারতীয়!
দশমত, মূল স্তরে ব্যর্থতা। স্কুল স্তরে কোনও খেলা হত না। যুবদের জন্য যে সুব্রত কাপ হত, সেখানেও চলতো জালিয়াতি, বয়সের ফাঁকি। আর সুযোগ পেলেও, দেওয়া হত না কাঠামো। পুরুষ হোক বা মহিলা, ক্রিকেটে যেমন অনূর্ধ্ব ১৯, অনূর্ধ্ব ১৪, খেলানো হয়, ফুটবলে ছোটদের সেরম কোনও লীগ ছিল না। জানলে অবাক হবেন, আমাদের জাতীয় অনূর্ধ্ব ১৯ ফুটবল দলে ২০১৫ সালে কোনও কোচই ছিল না।
এবার আমরা জানবো, রিলায়েন্সের সাথে AIFF-এর চুক্তি কী আদৌ লাভজনক ছিল?
সালটা ২০১০। ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য AIFF, IMG-রিলায়েন্সের সাথে ৭০০ কোটি টাকার একটি চুক্তি করে। লক্ষ্য ছিল – IPL-এর মতো একটি নতুন পেশাদার লীগ চালু করা। মূল স্তর থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত উন্নয়ন করা। বিদেশি এক্সপার্ট এনে ভারতীয় ফুটবলকে ঢেলে সাজানো।
এর ফলে ২০১৩ সালে শুরু হয় ISL অর্থাৎ ইন্ডিয়ান সুপার লীগ। এর আগে যেখানে I-League-এ স্টেডিয়াম থাকতো ফাঁকা, সেখানে ISL-এ ভরতে থাকে স্টেডিয়াম। টিভিতেও দর্শক টানতে থাকে ফুটবল। বেড়ে যায় ভারতীয় ফুটবলের ব্র্যান্ড ভ্যালু। ফুটবল প্রথমবার পরিণত হয় মেইনস্ট্রিম বিনোদনে।
রিলায়েন্সের ফলে ফুটবলে আসে বড় স্পনসর, বাড়ে খেলোয়াড়দের বেতন। বিদেশি কোচেদের সাথে ঢোকে ফিটনেস, স্পোর্টস সায়েন্স, ডেটা অ্যানালিসিস। উন্নত হয় ব্রডকাস্ট মান। রিলায়েন্সের অধীনেই ভারতে প্রথমবার ফিফা ইভেন্ট, ২০১৭ সালের অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। যার ফলে উন্নত করা হয় বিভিন্ন স্টেডিয়ামের অবকাঠামো। কিন্তু, এর পরেই শুরু হয় সমস্যা।
ধীরে ধীরে শেষ হতে থাকে AIFF-এর স্বাধীনতা। কেবল হয়ে পড়ে এক অনুমোদনদাতা সংস্থা। ISL চালু হতেই I-League দ্বিতীয় শ্রেণীর লীগে পরিণত হয়। বানিজ্যিক সাফল্য এলেও ভারতীয় ফুটবলের সাফল্য আসে না। আন্তর্জাতিক স্তরে হারতে থাকে একের পর এক টুর্নামেন্টে। এর মূল কারণ ছিল ISL-এ প্রাধান্য পেত বিদেশী খেলোয়াড়রা। দেশের খেলোয়াড়রা সুযোগ পেতো কম। তাই এখনও আপনারা দেখতে পাবেন, মোহনবাগান হোক বা ইস্টবেঙ্গল, দলের প্রধান খেলোয়াড় বিদেশীরাই।
তবে, কী ISL একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা?
ISL-এর লক্ষ্য ছিল বানিজ্যিক জনপ্রিয়তা, কিন্তু সময়ের সাথে তাও ব্যর্থ হয়। এই লীগ ছিল ফিফার আদর্শেরও বিরোধী। অন্যদিকে, AIFF-এর দ্বৈত নীতির কারণে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে সবাই —একদিকে I-League শীর্ষ লিগ বলা হত, আর ISL-কে দেওয়া হত বেশি টাকা, প্রচার, রেফারি, ও সম্প্রচার।
ISL-এ বেতন ছিল আকাশছোঁয়া—শীর্ষ খেলোয়াড়রা পেত ২ থেকে ৫ কোটি, গড় খেলোয়াড়রা পেত ২৫ লক্ষ থেকে ১ কোটি। ফলে ভালো খেলোয়াড়রা ISL-এ চলে যায়, I-League দুর্বল হয়।
সময় গড়াতেই ISL-ও ধাক্কা খায়। গড় দর্শক ২৬ হাজার থেকে নেমে আসে ১৩ হাজারে। ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, রিলায়েন্স, ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি হিসাবে নেয় ৭৭৭ কোটি, কিন্তু ব্রডকাস্টিং থেকে আয় করে মাত্র ৫৪০ কোটি টাকা, অর্থাৎ ISL-এর লোকসান প্রায় ২৪০ কোটি টাকা।১২টি ক্লাবের মধ্যে কেবল বেঙ্গালুরু এফসি লাভে, বাকিরা লসে। বন্ধ হয়ে যায় এফসি পুনে সিটি। হারিয়ে যায় ডেম্পো, চার্চিল ব্রাদার্সের মতো ক্লাব। দুর্বল হয়ে পড়ে সেই ঐতিহাসিক ক্লাব মহামেডান।
ফিফা ব্যান করে দেয় ভারতীয় ফুটবলকে!
সালটা ২০০৯। AIFF-এর সভাপতি হন প্রফুল্ল প্যাটেল। তিনি কংগ্রেস নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে। কিন্তু তার পরেও তিনি থেকে যান পদে, হয় না কোনও নির্বাচন। আর এর পিছনে কারণ ছিল AIFF-এর ঢিলেঢালা সংবিধান। যেখানে ছিল না কোনও বয়সসীমা, কিংবা মেয়াদসীমা। যা জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন নিয়মের বিরোধী।
এরপর ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট AIFF-এর কমিটি ভেঙে দেয়, এবং তিনজনের একটি Committee of Administrators গঠন করে AIFF-এর দায়িত্বভার দিয়ে দেয়।
ফলত ২০২২ সালের ১৫ই আগস্ট, ফিফা ভারতকে ব্যান করে দেয়। ফিফা-র মতে এই কমিটি ছিল “তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ”। যা ছিল তাঁদের নিয়ম বিরুদ্ধ।
ভিশন ২০৪৭!
এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে AIFF-এর নতুন সভাপতি হন কল্যান চৌবে। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় ফুটবলকে উন্নত করার জন্য শুরু হয় ভিশন ২০৪৭। এর লক্ষ্য – স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে ভারতীয় ফুটবলকে বিশ্বের দরবারে শীর্ষে নিয়ে যাওয়া।
এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ২৪ বছরকে ৬টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এটা ৯৪টি স্লাইডের একটি বিস্তৃত প্রেজেন্টেশন। আপনারা এই লিঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন – https://www.the-aiff.com/media/uploads/2023/01/Vision-2047-The-Indian-Football-Strategic-Roadmap-2023-2047.pdf
সেখানে ১১টি মুল উদ্দেশ্য হল – গভর্নেন্স, কাঠামো, ডিজিটাল ট্রান্সফরম্যাশন, রেফারিং, ক্লাব, মূল স্তর, কোচিং, ট্যালেন্ট ডেভলপমেন্ট, জাতীয় টিম, মার্কেটিং, বানিজ্যিকরণ, এবং প্রতিযোগীতা।
এর লক্ষ্য ছিল –
এশিয়ার শীর্ষ ৪টি দেশের মধ্যে একটি হওয়া।
পুরুষ ও মহিলাদের দলকে এশিয়ার শীর্ষ ৩টি ফুটবল লীগে হতে হবে।
একজন করে আইকনিক খেলোয়াড় তৈরি করা পুরুষ ও মহিলা টিমে।
দুটি ফিফা মানের স্টেডিয়াম।
AIFF-এর রাজস্ব ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো।
সাড়ে তিন কোটি বাচ্চা ২০২৬ পর্যন্ত ফুটবল খেলবে।
১০ লক্ষ রেজিস্টার্ড খেলোয়াড় থাকবে, আড়াই কোটি বাচ্চাকে ফুটবলের পড়াশোনা করানো হবে।
একটি ন্যাশনাল লীগ হবে যেখানে ৩টি স্তর হবে।
সাথে ৪০টি টিম থাকবে।
ISL ও I-League-এ ১৪টি টিম হবে, আর আইলিগের সেকেন্ড ডিভিশনে ১২টি টিম থাকবে।
AIFF-এর এই উদ্যোগে ভারতীয় ফুটবল কেবল তখনই এগিয়ে যাবে, যখন আপনারা সমর্থন করবেন ভারতীয় ফুটবলকে, ভারতীয় খেলোয়াড়দের।












