আগে সমাজে যে “শিক্ষক”রা শ্রদ্ধা ও মর্যাদার প্রতীক – “গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু” শ্লোকই তাঁদের পরিচয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে “শিক্ষক” কিংবা “মাস্টারমশাই”দের সেই চিত্র বদলে গিয়েছে অনেকটাই। ঘুষ দিয়ে চাকরি, আন্দোলন, বেতন-বৈষম্য, চাকরির অনিশ্চয়তা ও রাজনীতির খেলায় শিক্ষকদের নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। কিন্তু, আজ আমরা এমন এক মাস্টারমশাই-এর গল্প শোনাবো যার কাছে অর্থ নয়, পড়ানোই ছিল মূল মন্ত্র, যিনি ২১ বছর আগে অবসর নিলেও আজও তিনি সকলের মাস্টারমশাই, যিনি শুধুমাত্র পড়ানোর জন্যই পেয়েছেন পদ্মশ্রী পুরষ্কার। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ছেড়েছিলেন উচ্চ বেতনের চাকরি!
সময়টা ১৯৬০-এর দশক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পরে পরেই শহরের বিভিন্ন বড় বড় স্কুলে চাকরির প্রস্তাব পেতে শুরু করেন সুজিত চট্টোপাধ্যায় (Sujit Chattopadhyay)। বেজায় খুশি মনে এক মিনিটও সময় নষ্ট করেননি তিনি, সমস্ত চাকরির প্রলোভন উপেক্ষা করে ফেরেন নিজের গ্রাম বর্ধমানের আউশগ্রামে। পড়ানোর ইচ্ছে অনেকদিন ধরেই, কিন্তু, অর্থের লোভে কোনও বড় প্রতিষ্ঠানে নয়, পড়ানোর ইচ্ছে নিজের গ্রামের সেই সমস্ত শিশুদের যাদের ঠিক মতো দু’বেলা খাবারও জোটে না, দাঁড়ানোর ইচ্ছে তাদের পাশে যাদের জীবনে কিছুই নেই প্রায় আর।
এরপর প্রায় ৩৯টা বসন্ত কাটিয়ে, নিজের গ্রামের স্কুলের ১৬৯ টাকার বেতন থেকে অবসর নেন মাস্টারমশাই। কিন্তু, স্কুল জীবন শেষ করলেও, পড়ানোর খিদে যেন কিছুতেই মিটছিল না মাস্টারমশাইয়ের। ভেবেছিলেন বাকী জীবনটা চা খেয়ে আর বাড়িতে বসেই কাটবে, কিন্তু এরপর একদিন হঠাৎ করেই মাস্টারমশাইয়ের পড়ানোর আগ্রহের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে তিনজন আদিবাসী মেয়ে।
অবসরের পরে হঠাৎ একদিন…
২০০৪ সালে অবসরের পর, হঠাৎ করেই একদিন মাস্টারমশাইয়ের দরজায় প্রায় ২৩ কিমি সাইকেল চালিয়ে হাজির হয় তিন আদিবাসী মেয়ে। হাতজোড় করে তারা মাস্টারমশাইকে বলে, “মাস্টারমশাই, আপনি কি আমাদের পড়াবেন?” তৎক্ষণাৎ রাজি হলেন মাস্টারমশাই, সাথে বললেন “আমাকে কিন্তু পড়ানোর মাইনে দিতে হবে, তোমরা রাজি তো?” তারা আমতা-আমতা করে জানায়, তারা চেষ্টা করবে। এরপর মাস্টারমশাই বলেন, “আমার ফি ১ টাকা। না, মাসে নয়, সারা বছরে মাত্র ১ টাকা!” তারা কিছুটা উৎফুল্ল মনে মাস্টারমশাইকে জড়িয়ে ধরে, আর শুধু ১ টাকা নয়, সাথে ৪টি চকলেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। কিন্তু, নিজের গ্রামের স্কুলে, নিজের ক্লাসরুমে পড়ানোর অনুমতি পাননি তিনি।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল এক নতুন যাত্রার। আর এই যাত্রা যে এতটা সুন্দর হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি সুজিত চট্টোপাধ্যায়। নিজের বারান্দা পরিষ্কার করে সেখানে পড়াতে শুরু করেন তিনি। ২০০৪ সালে, যে পাঠশালা শুরু হয় মাত্র ৩ জন মেয়েকে নিয়ে। আজ, প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৩,০০০-এরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করেন। তবে, তার মধ্যে বেশিরভাগটাই তরুণী আদিবাসী মেয়ে। যাদের মধ্যে অনেকেই প্রায় ২০ কিমি পথ হেঁটে পাঠশালায় আসে। শুরু হয় “সদাই ফকিরের পাঠশালা”।
এখনও চলছে সদাই ফকিরের পাঠশালা…
আর সেই থেকে এখনও একইভাবে চলছে সুজিত মাস্টারমশাইয়ের “সদাই ফকিরের পাঠশালা”। সকাল ৬টায় নিজের গ্রামে হাঁটাহাঁটি করে নিজের দিন শুরু করেন তিনি। এরপর নিজের পাঠশালার দরজা খুলে দেয় দূর-দুরান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থীদের জন্য। বর্তমানে মাইনে বাড়িয়েছেন তিনি। ছাত্রদের থেকে এখন ১টাকার পরিবর্তে নিচ্ছেন ২টাকা। আর সফলতা? বছরের পর বছর ধরে, তাঁর ছাত্ররা কেউ অধ্যাপক, কেউ ডিপার্টমেন্টের প্রধান, কেউ আইটি পেশাদার হয়েছেন। বহু শিশু আর্থিকভাবে দুর্বল হলেও গতানুগতিক শিক্ষা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বহু ছাত্র সম্পন্ন করেছেন নিজেদের উচ্চশিক্ষা; আর মাস্টারমশাইকে সেই ছাত্ররা এখনও ফোন করলে মাস্টারমশাই তাদের কাছে নির্ভাবনায় আবদার করে বসেন চকোলেট!
সমাজসেবকও তিনি!
বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরের সমাজবিজ্ঞান এবং স্নাতক স্তরের বাংলা ভাষা পড়ান তিনি। এছাড়াও, তিনি সামাজিক-পরিবেশগত সচেতনতার একজন সক্রিয় কর্মী এবং এই গ্রামীণ অঞ্চলে তিনি সামাজিক এবং পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাত্রার সচেতনতা তৈরি করেন। তার এই পাঠশালা সকাল ৬:৩০ টায় শুরু হয়, শীতকালে কখনও কখনও সূর্যোদয়ের আগে শুরু হয়, এবং সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। তবে, শৃঙ্খলার প্রতি এখনও কঠোর সুজিত বাবু। তিনি ক্লাস বাঙ্ক করা যেমন পছন্দ করেন না, তেমনই ক্লাসে হাজিরার রেজিস্টার পরিচালনার পাশাপয়াশি, অভিভাবকদের সাথে আলোচনাও করেন। তাঁকে এই কাজে বর্তমানে সাহায্য করে তাঁর ভাগ্না উৎসব।
President Kovind presents Padma Shri to Shri Sujit Chatterjee for Literature and Education. A retired school teacher from Purba Bardhaman, West Bengal, he is recognised over the state for his free coaching center named “Sadai Fakirer Pathsala”. pic.twitter.com/N5qoMkGThj
— President of India (@rashtrapatibhvn) November 9, 2021
২০২১ সালে, নিজের শিক্ষকতার মাধ্যমে এক মাইলস্টোন স্থাপন করেন সুজিত চট্টোপাধ্যায়। স্বীকৃতি পান পদ্মশ্রীর। কারণ, তিনি ছিলেন এমন একজন গ্রামীণ শিক্ষক, যিনি নিজের স্বচ্ছল চাকরি ছেড়ে, স্বচ্ছল জীবন ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন গ্রামের পাঠশালায়, যিনি নিজের অবসর জীবনকে উৎসর্গ করেছেন সমাজকে, আর শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে এখনও আলোকিত করে চলেছে এই সমাজকে। তিনি বলেন, এখনও আমার মনে হয়, “ছাত্র-ছাত্রীরা আমার থেকে নয়, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে অনেক বেশি শিখি।












