সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: জীবন অনেক সময় এমন জায়গায় থমকে যায়, যেন মনে হয় যে সব পথ বন্ধ। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যারা ধ্বংসস্তুপের উপরে দাঁড়িয়ে থেকেও নতুন প্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। উত্তরপ্রদেশের মৈনপুরীর যুবক সুরাজ তিওয়ারি (Suraj Tiwari) ঠিক তেমনই একজন। আজ আমরা তাঁর কথাই জানাবো এই প্রতিবেদনে। ২০১৭ সালে একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা তাঁর শরীর থেকে দুটি পা এবং একটি হাত কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু এই প্রতিকূলতা তাঁর স্বপ্নকে কখনও দমাতে পারেনি। আজ তিনি ইউপিএসসি উত্তীর্ণ হয়ে সফল আইআইএস অফিসার (UPSC Success Story)।
২০১৭ সালে বদলে যায় সুরাজের জীবন
আসলে ২০১৭ সালে নয়ডার একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত থাকাকালীন বাড়ি ফেরার পথে ভয়াবহ এক ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন সুরাজ। সেই দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর হাঁটু থেকে দুই পা এবং ডান হাত হারান। সবথেকে বড় ব্যাপার, বাঁ হাতের মাত্র তিনটি আঙুল অবশিষ্ট ছিল তাঁর। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের কাছে এটা জীবনের শেষ সময় বলেই মনে হবে। কিন্তু দিল্লির এইমসে চিকিৎসার সময়ই সুরাজ মনস্থির করে নেন যে, শারীরিক অক্ষমতা তাঁর ভাগ্য লিখতে পারবে না। তিনি তাঁর নিজের ভাগ্য নিজেই লিখবেন।
সুরাজের লড়াই যে শুধুমাত্র শারীরিক ছিল এমনটাও নয়, বরং মানসিক দিক থেকেও তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। যে বছর তিনি দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান, ঠিক সেই বছরই তাঁর ভাই আত্মহত্যা করেন। তাঁর বাবা রাজেশ তিওয়ারি পেশায় একজন সাধারণ দর্জি। ছেলের চিকিৎসা আর সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়তে হয়। এমনকি নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা হয়। মা আশা দেবীর কথায়, সেটি ছিল তাঁদের জীবনের সবথেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়।
৩ আঙুলে ইউপিএসসির প্রস্তুতি
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে কোনও নামিদামি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না সুরাজের। সেই কারণে হুইল চেয়ারে বসেই শুরু করে ফেলেন বাড়িতে নিজের প্রস্তুতি। মাত্র তিনটি সচল আঙুল দিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পড়াশোনা আর নোট লেখার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রম সার্থক হয় ২০২৩ সালে। দেশের সবথেকে কঠিন পরীক্ষা ইউপিএসসির প্রথম চেষ্টাতেই ৯১৭ তম র্যাঙ্ক অর্জন করে গোটা দেশকে চমকে দেন তিনি।
আরও পড়ুন: মাত্র ৩০০০ টাকায় আরামে হেসে খেলে ঘুরে আসুন দার্জিলিং! রইল পুরো গাইড
বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনফরমেশন সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক সুরাজ তিওয়ারি। যে হুইল চেয়ারে বসে তিনি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, আজও সেই হুইল চেয়ারে বসেই তিনি দেশের সেবা করছেন। তাঁর এই জীবন সংগ্রাম থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার উঠে আসে যে, জীবনের সবথেকে কঠিন সময়েও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে নেই। প্রতিকূলতাকে অজুহাত না করে তিন আঙুল দিয়েই সাফল্যের পথ প্রশস্ত করা যায়। আর নিজের ভিতর জেদ আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।












