সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই প্রবাদ যেন আজও সমান ভাবেই প্রাসঙ্গিক। বছরের নানা উৎসবের মধ্যে চৈত্র মাসের বিশেষ পার্বণ হল নীলষষ্ঠী (Nil Sasthi 2026)। বিশেষ করে সন্তানের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বাংলার বহু মা এই ব্রত পালন করে থাকেন। আর প্রচন্ড গরমের মধ্যেও সারাদিন উপবাস থেকে সন্ধ্যায় শিবের আরাধনার প্রথা রয়েছে এই দিন। তবে চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে নীলষষ্ঠী কত তারিখে পড়ছে, কীভাবে পালন করবেন আর কী কী মাহাত্ম্য রয়েছে? জানুন বিস্তারিত।
সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়েদের ব্রত নীলষষ্ঠী
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, নীলষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য হল সন্তানের মঙ্গল কামনা। বহু মা এদিন নির্জলা উপবাস পালন করে থাকেন। সারাদিন কিছু না খেয়ে সন্ধ্যাবেলা শিবলিঙ্গে জল অর্পণ করেন আর মহাদেবের পূজা দেন। এরপর পূজার প্রসাদ গ্রহণ করে ব্রতভঙ্গ করা হয়। আর বাংলা সাহিত্যে সন্তানের মঙ্গল কামনার জন্য এই ভাবনার উল্লেখ বহুবারই দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গলকাব্যের প্রার্থনায় আমাদের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা আজও ফুটে ওঠে যে “আমার সন্তান যেন থাক দুধে-ভাতে!”
নীলষষ্ঠী ২০২৬ তারিখ ও সময়সূচি | Date And Time of Nil Sasthi 2026 |
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী আমরা জানতে পারছি, ২০২৬ সালের নীলষষ্ঠী বা নীল পূজা পড়বে আগামী ১৩ এপ্রিল সোমবার। আর বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যদি তা দেখি, তাহলে এই দিনটি পড়ছে ৩০ চৈত্র ১৪৩২ সন।
কেন নীলষষ্ঠীতে শিবের পূজা করা হয়?
জানিয়ে রাখি, সাধারণত ষষ্ঠীতে দেবী ষষ্ঠীর পূজা করার প্রথা রয়েছে। যেমন অশোক ষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী ইত্যাদি। কিন্তু নীলষষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম কিছুটা আলাদা। কারণ, এদিন দেবী ষষ্ঠীর পরিবর্তে মহাদেবের আরাধনা করা হয়। লোককথা মতে, রাজা দক্ষের যজ্ঞে স্বামী শিবের অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী আগুনে আত্মহুতি করেছিলেন। পরে তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা হিসেবে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন। সেই জন্যই তাঁর নাম হয় নীলাবতী। আর পরবর্তীতে রাজা নীলধ্বজ তাঁর কন্যা নীলাবতীর সঙ্গে শিবের বিবাহ দিয়েছিলেন। এমনকি গ্রাম বাংলার বিশ্বাস অনুযায়ী, চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন শিব ও নীলাবতীর বিয়ে হয়েছিল। তাই এই সময় নীলষষ্ঠী, গাজন আর চৈত্র সংক্রান্তি পালন করা হয়।
তবে এই দিনের সঙ্গে নীল শব্দটির সম্পর্ক রয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, মহাদেবের আরেক নাম নীলকন্ঠ। আর দ্বিতীয়ত, দেবী পার্বতীর আরেক রূপ নীল চণ্ডিকা বা নীলাবতী। পুরাণ অনুযায়ী, এই দিনে শিব আর নীলাবতীর বিবাহ হয়েছিল। তাই এই দিনটিকে নীলষষ্ঠী বলা হয়। আর শিবের পূজাকে অনেক জায়গায় নীলপূজা বলা হয়।
গাজন এবং চড়ক উৎসবের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
এদিকে নীলষষ্ঠীর পরের দিন চৈত্র সংক্রান্তি পালন করা হয়। আর এদিন হয় চড়কের মেলা। তারপরের দিন আবার শুরু হয় বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ। চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে বাংলার বহু গ্রামে গাজনের মেলা বসে থাকে। আর ওই সময় অনেক ভক্ত শিব-পার্বতীর সাজে ঘরে ঘরে ঘুরে ভিক্ষা সংগ্রহ করে থাকেন। পাশাপাশি চড়কপূজা এবং গাজনের নানা আচারও এই সময় পালন করা হয়।
ব্রত পালন করার কিছু নিয়ম
নীলষষ্ঠীর ব্রত পালনার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। প্রথমত, আগের দিন নিরামিষ খাবার গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্রতের দিন পূজা না হওয়া পর্যন্ত উপবাস থাকতে হবে। তৃতীয়ত, সন্ধ্যাবেলায় শিব পূজার পর প্রসাদ খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করতে হয়। পঞ্চমত, ব্রত ভঙ্গের পর ফল, সাবুদানা বা নিরামিষ খাবার গ্রহণ করতে হয়। আর অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ভক্তি এবং নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত যদি পালন করা হয়, তাহলে সন্তানের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু ও আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
আরও পড়ুন: ২০২৬-এ পয়লা বৈশাখ কত তারিখে পড়ছে? জানুন দিনটির মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য
নীলষষ্ঠীর পূজার সামগ্রী
নীলষষ্ঠীর দিন সাধারণত যে সমস্ত সামগ্রী ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কাঁচা দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি, গঙ্গাজল, বেলপাতা, চন্দন, আতপ চাল, বেল, ধুতরা ফুল, নীল অপরাজিতা ফুল, আকন্দ ফুলের মালা, নতুন মাটির প্রদীপ এবং ঘি। এছাড়াও অনেক মা তাঁদের সন্তানের নামে আলাদা করে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালিয়েও মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করে থাকেন।












