ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়: হিন্দু ধর্মের পালনীয় একাদশীগুলির মধ্যে ষটতিলা একাদশী (Shattila Ekadashi 2026) অন্যতম। মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের এই একাদশী তিথির মাহাত্ম্য বর্ণনায় মুখর ভবিষ্যোত্তর পুরাণ।
এই একাদশীর বিশিষ্টতা – ব্রত পালনের সঙ্গে তিলের সংযোগে। এই ব্রত পালনের সময় ছটি বিভিন্ন উপায়ে তিলের ব্যবহার করা হয়। তিল দিয়ে স্নান, শরীরে তিল ধারণ, তিল ও জল সংযোগে তর্পণ, তিল ভোজন, তিল দান ইত্যাদি সংযুক্ত এই একাদশীর সঙ্গে। তিলের ছ প্রকার প্রয়োগ এবং ব্যবহারের কারণেই এই একাদশী ষটতিলা একাদশী নামে অভিহিত হয়।
শাস্ত্র মতে, তিল ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয়। তাই এই একাদশীতে ব্রাহ্মণকে জলপূর্ণ কলস, বস্ত্র, ছত্র, পাদুকা, গাভীর সঙ্গে তিলপাত্র দানেরও বিধান আছে। বিশ্বাস করা হয় যে, ঐ তিল থেকে পরবর্তী সময়ে যতো তিল উৎপন্ন হয় – যিনি তিল দান করেন, তিনি ততো বছর স্বর্গে অবস্থান করেন।
সাধারণভাবে এই ব্রত পালনের সময় একাদশীর দিন ভোরে স্নান করে উপবাসের সংকল্প নেওয়া হয়। স্নানের পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুজো করা হয়। যাঁরা ব্রত রাখেন তাঁরা এই দিন চাল, ডাল বা শস্যজাতীয় খাদ্য বর্জন করেন। অনেকেই এই একাদশীতেও ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর পুজো করেন।
মহামুনি পুলস্ত্য একসময় এই ব্রতের করণীয় বিধান বিষয়ে দালভ্য ঋষিকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, সেই নির্দেশ অনুসারে রাত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অর্চনান্তে হোমের বিধি আছে। প্রচলিত বিশ্বাস – রাত্রে শ্রীভগবানের নাম জপ করে রাত্রি জাগরণ করাও অত্যন্ত ফলপ্রদ।
এই ব্রত কথায় সংযুক্ত আছে এক ব্রাহ্মণীর কাহিনি। সেই ব্রাহ্মণী কঠোরভাবে ব্রত-তপস্যা করতেন, কিন্তু তিনি কখনও ভিক্ষুককে ভিক্ষা দান এবং ব্রাহ্মণকে অন্ন দান করতেন না। তাই মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গে গেলেও তাঁর আবাস ছিল শূন্য। সেখানে ধান, চাল কিছুই ছিল না। এজন্য ঐ ব্রাহ্মণী ভগবান বিষ্ণুর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে ভগবান বিষ্ণু তাঁকে তাঁর নিজের গৃহের দ্বার বন্ধ করে রেখে ব্রতের ফল প্রার্থনার পরামর্শ দেন। এদিকে, ঐ ব্রাহ্মণী স্বশরীরে স্বর্গে এসেছেন শুনে দেবপত্নীরা তাঁকে দেখতে আসেন। তখন ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শ মতোই ঐ ব্রাহ্মণী তাঁদের কাছে ব্রতের ফল প্রার্থনা করেন। এই প্রার্থনা শুনে এক দেবপত্নী তাঁকে ষট তিলা ব্রতের ফল প্রদান করলে ঐ ব্রাহ্মণী দিব্যদেহ লাভ করেন। তাঁর গৃহও ধন, ধান্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। – এই কাহিনির সূত্রেই মনে করা হয় – এই ব্রত পালনে দেবকৃপা লাভ হয়, ঘর ধন ধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শাস্ত্রমতে, স্নান – দানাদি কার্যে কালো তিল অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত হয়। ব্রাহ্মণের প্রাতঃকালে তিল দান, প্রেতোদ্দেশে হেমগর্ভ তিল দান – হিন্দু ধর্মে বহুল প্রচলিত। তিলকে শুদ্ধি ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হয়।
লোক বিশ্বাস – এই একাদশী ব্রত পালনে দারিদ্র্য দূর হয়, সমস্ত পাপ নাশ হয় এবং বৈকুণ্ঠ লোক প্রাপ্তি হয়।
এই ব্রতের মূল কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভজনা। কারণ তাঁর নাম আশ্রয় করলে মহাপাতকরূপ অন্ধকার বিনষ্ট হয় :
” তং নির্ব্ব্যাজং ভজ গুণনিধে পাবনং পাবনানাং শ্রদ্ধারজ্যন্মতিরততরামুত্তমঃশ্লোকমৌলিম্
প্রদ্যোন্নন্তঃকরণকুহরে হন্ত যন্নামভানো- রাভাসোপি ক্ষপয়তি মহাপাতকধ্বন্তরাশিম।”
কিন্তু এই ব্রত পালনের মাধ্যমে দান ও সংযমের যে শিক্ষা লাভ করা যায় – তার ভূমিকাও নিঃসন্দেহে অসীম।











