দিনটা ২০২৬-এর ২৮শে ফেব্রুয়ারি। সকাল ঠিক ৬টা বেজে ৪৫ মিনিট। ইজরায়েল (Israel) থেকে টেকঅফ করে একটি ফাইটার জেট। এই জেটে ছিল এমন কিছু মিসাইল, যা ১০০০ কিমি দূরে থাকা টার্গেটকেও খতম করতে পারে নিমেষে।
এরপর, এয়ারস্পেসের নজরদারি এড়িয়ে ইরানের গা ঘেঁষে বেশ কিছুক্ষণ উড়তে থাকে ওই ফাইটার জেট। তারপর ঠিক ৯টা ৫০ বাজতেই, হামলা চালায় ইরানের পাস্তার স্ট্রিটের এক বিল্ডিংয়ে। একটি নয়, দুটি নয়, লঞ্চ করা হয় একসাথে ৩০টি মিসাইল। আর সেখানে তখন মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়েতুল্লাহ খামেইনি সহ ইরানের বেশ কিছু তাবড় তাবড় নেতা। আর হামলার মুহূর্তের মধ্যেই খতম হয়ে যায় প্রায় প্রত্যেকে।
তবে, আয়েতুল্লাহ খামেইনি কিন্তু ছোটখাটো কোনও নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বাধিনায়ক, সবথেকে সুরক্ষিত একজন ব্যাক্তি। এমনকি ইরানে যখনই কোনও বড় কিছু হত, খামেইনি মুহূর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে যেত। অধিকাংশ সময়েই তিনি বিভিন্ন শেফ হাউস কিংবা বাঙ্কারে গা ঢাকা দিয়ে থাকতেন।
তাহলে এত কিছুর পরেও তাঁকে কীভাবে খুঁজে পেল ইজরায়েল? কীভাবে ইরানের ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে চালানো হল এই নিখুঁত হামলা?
জানলে অবাক হবেন, ভারতের স্বাধীনতার পর তৈরি হওয়া এই দেশের জনসংখ্যা এক কোটিরও কম, অথচ ক্ষমতার দিক দিয়ে কাবু করতে পারে বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলিকে।
চারিদিকে শত্রু দিয়ে ঘেরা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে একাই রাজত্ব করে এই দেশ!
না আছে তেল, না আছে কয়লা, না আছে চাষের জন্য কোনও উর্বর জমি – অথচ আর্থিক ও সামরিক – সব দিক দিয়েই উন্নত এই দেশ।
এমনকি তাদের ডিফেন্স সিস্টেমকে ভয় পায়, সারা বিশ্বের ২০০ কোটি জনসংখ্যার ৫৭টি মুসলিম দেশ। জানলে অবাক হবেন, স্বয়ং আমেরিকাও ভয় পায় ইজরায়েলকে!
কিন্তু ভাবুন তো, সম্পূর্ণ মরুভুমিতে ঢাকা এই দেশ, যেখানে কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ নেই – সেখানে এত টাকা এল কোথা থেকে? মাত্র ৯৪ লক্ষের দেশ আর্থিকভাবে এতটা শক্তিশালী কীভাবে?
গুগল হোক বা ফেসবুক – এগুলিকে আমেরিকান কোম্পানি মনে হলেও, এগুলির পেছনে রয়েছেন ইজরায়েলি নাগরিক। প্রযুক্তিগতভাবে এই দেশ এতটাই উন্নত যে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আপনি তাদের ওপরেই নির্ভরশীল!
শুধু তাই নয়, সামরিক দিক দিয়ে এই দেশ এতটাই অ্যাডভান্স, যে এই দেশ থেকেই ফাইটার জেট থেকে শুরু করে মিসাইল কেনে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত সহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ! আর এই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে, তাদের এক একটা মিশন সম্পর্কে জানলে মাথা ঘুরে যাবে আপনার! তারা ছড়িয়ে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে!
আজ India Hood ডিকোড-এ আমরা তুলে ধরবো এমন কিছু তথ্য, যা পাল্টে দেবে ইজরায়েল সম্পর্কে আপনার সমস্ত ধারণা। তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত দেখুন।
টার্গেট খামেইনি!
ইরান ও ইজরায়েলের এই দ্বন্দের সূত্রপাত কিন্তু আজকের নয়। এই দ্বন্দের সূত্রপাত হয় ইজরায়েলের জন্মের সময় থেকেই। আর এর পেছনের মূল কারণ ইজরায়েলের বাসিন্দা জিউশ অর্থাৎ ইহুদীরা। কারণ ইহুদীদের বেশ কিছু কারণে পছন্দ করতেন না মুসলিমরা। তাই ইহুদীদের রাষ্ট্র ইজরায়েলকে কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি ইরান।
তবে, কেবল এই একটি নয়, সময়ের সাথে সাথে এই দ্বন্দের আগুনে ঘিয়ের কাজ করেছে আরও একাধিক কারণ। যার মধ্যে অন্যতম হল – পরমাণু শক্তি।
আপনি যদি ইরান আর ইজরায়েলের শত্রুতার ইতিহাস সম্পর্কে সবিস্তারে জানতে চান, তাহলে এই নিয়ে আমাদের একটি বিস্তারিত ভিডিও রয়েছে। আপনি আই বাটনে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন ইরান-ইজরায়েল ডিকোড ভিডিওটি!
তবে দ্বন্দের কারণ যাই হোক না কেন, ইরানের সুপ্রিম লিডারকে মারাটা মোটেও সহজ ছিল না।
কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য ইজরায়েলকে করতে হয়েছে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা।
জানলে অবাক হবেন, ইরানের রাজধানী তেহরানের ট্র্যাফিক ক্যামেরা গত ১০ বছর ধরে হ্যাক করে রেখেছিল ইজরায়েল। যা থেকে ইরানের রাস্তার প্রতিটি কোণায় নজরদারি চালিয়েছিল তারা। নজর রাখা হয়েছিল বিভিন্ন নেতৃত্বদের ওপরেও। এমনকি ইরানের নেতৃত্বের মধ্যেও এমন একজন ছিলেন যিনি এই সব তথ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন ইজরায়েলকে।
ফলত কোন নেতা কার সাথে আসছে, কোন নেতার ডেলি রুটিন কি? কে কতগুলো গাড়ি নিয়ে আসে? কে কোথা দিয়ে কখন যায়? সব তথ্যই মজুদ ছিল ইজরায়েলের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে। পাশাপাশি ছিল কলিং ডেটা থেকে শুরু করে কথোপকথনের ইতিহাস এমনকি লোকেশন সহ সবকিছুই।
আর এই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য ইজরায়েল তৈরি করেছিল এমন একটি অ্যালগরিদম, যা সবকিছু বিশ্লেষণ করতো এবং নিয়মের বাইরে কিছু হলেই সেগুলোকে পয়েন্ট আউট করতো। সেই সবকিছু থেকেই জানা যায়, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ইরানের পাস্তার স্ট্রিটের কাছেই ওই বিল্ডিংয়ে ইরানের বেশিরভাগ নেতৃত্বরা একসাথে থাকবে। থাকবেন খামেইনি-ও। এই একই তথ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছিল আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ CIA-ও।
আর তারপরেই, ঠিক সময়ে, নিখুঁতভাবে হামলা চালায় ইজরায়েলি এয়ারফোর্স। আর বাকিটা তো আপনাদের জানাই।
অর্থাৎ, একদিকে প্রযুক্তিগত উন্নতি আর অন্যদিকে নিজেদের গোয়েন্দা বিভাগের সক্রিয়তা – এই দুইয়ে মিলেই এই মিশনকে সফল করেছে ইজরায়েল।
কিন্তু, একদিনে কি এতটা শক্তিশালী, এতটা উন্নত হয়েছে ইজরায়েল?
একদমই না। ১৯৪৮ সালের আগে ইজরায়েল নামের কোনও দেশই ছিল না। ১৯৩০ সালে হিটলার যখন ইহুদীদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার এবং মারধর করছিল, তখন এই ইহুদিরা নিজেদের সুরক্ষার্থে ইউরোপ ছেড়ে পালাতে থাকে। এবং তারা প্যালেস্টাইনকে নিজেদের পূর্বপুরুষদের ভূমি হিসেবে মনে করতো তাই সেখানে অনুপ্রবেশ করা শুরু করে। কিন্তু, সেখানের আরব লোকেরা ইহুদীদের আগমনকে মেনে নেয়নি। ফলে তারাও ইহুদীদের ওপর শুরু করে অত্যাচার। আর ওই সময়ে ব্রিটিশরাও ইহুদীদের বিরুদ্ধে নানা রকম পদক্ষেপ নেয়, ফলত শুরু হয় এক বিশাল বড় দাঙ্গা।
এরপর ১৯৪৭ সালে এই বিষয়টি জাতিসংঘে গিয়ে পৌঁছায়। আর ওই বছরের নভেম্বর মাসে প্যালেস্টাইন ভাগের প্রস্তাব পাশ হয়। পুরো ভুখন্ডকে হাফ হাফ করে ইজরায়েল আর প্যালেস্টাইন বানানো হয়।
১৯৪৮ সালের ১৪ই মে, ডেভিড বেন গুরিয়েন ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিম এশিয়ার এই দেশ ভুমধ্যসাগরের সাথে অবস্থিত, যার উত্তরে রয়েছে লেবানন, পূর্বে জর্ডান, দক্ষিণে ইজিপ্ট সহ আরও একাধিক আরব দেশ।
ইজরায়েলের দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে গাজা আর পূর্বে রয়েছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, যা নিয়ে প্যালেস্টাইন গঠিত। কিন্তু, ইজরায়েল দেশের মর্যাদা পেয়ে গেলেও, প্যালেস্টাইন এখনও দেশের মর্যাদা পায়নি।
যদিও স্বাধীনতার পর থেকেই, ১৯৪৮, ১৯৬৭ আর ১৯৭৩ সালে আরব দেশ আর ইজরায়েলের মধ্যে বড় বড় তিনটি যুদ্ধ হয়। সবেতেই ইজরায়েল জয়লাভ করে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর অধিকাংশ আরব দেশ ইজরায়েলের সাথে সমঝোতা করে নিলেও, প্যালেস্টাইন ও ইরানের মতন অন্যান্য চরমপন্থীরা এই শত্রুতা রেখে দেয়।
তবে, এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমেরিকা প্রথম থেকেই ইজরায়েল এবং ইহুদীদের সমর্থন করে এসেছে। আর সেই সমর্থন এক সময়ে নিয়ন্ত্রণে পরিনত হয়েছে। না এটা ভাববেন না, আমেরিকা ইজরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করে, বরং ইজরায়েল আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন।
আর এর কারণ, ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান, প্রযুক্তিগত উন্নতি, আবিষ্কার, প্রতিরক্ষা আর জাতীয়তাবাদী মনোভাব। ইজরায়েলের রয়েছে একাধিক উন্নতমানের গোয়েন্দা সংস্থা, যেমন – মোসাদ, শীন বেত, আমান।
আর এই খামেইনিকে মারা হোক কিংবা ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা, কিংবা শত্রুকে বের করে খতম করা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে মোসাদের ভূমিকা। এদেরকে সারা বিশ্বের মধ্যে সেরা গোয়েন্দা সংস্থা হিসাবে মনে করা হয়। এদের থেকে মাঝে মাঝে ট্রেনিং নিতে যায় স্বয়ং আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ CIA।
এখন যদি আপনি মোসাদ এবং মোসাদের বিভিন্ন মিশন সম্পর্কে একটি বিস্তারিত ভিডিও চান, তাহলে কমেন্টে লিখুন MOSSAD। যদি ৫০০ জন কমেন্টে MOSSAD লেখেন। তাহলে আমরা আপনাদের জন্য এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত ডিকোড ভিডিও করবো।
এবার জানবো, ঠিক কী কী কারণে এতটা উন্নত হল ইজরায়েল?
প্রথম কারণ – নেতৃত্ব
ইজরায়েলের এত উন্নতি, এত প্রভাব-প্রতিপত্তি, এত অর্থ – এই সবের পেছনে রয়েছে ইজরায়েলের নেতৃত্ব।
১৯৮৪ সাল নাগাদ, এই দেশের মূল্যবৃদ্ধি যেখানে বেড়ে গিয়েছিল ৪৪৫ শতাংশে, এক বছর পরে অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে সরকারের বেশ কিছু নীতির ফলে সেই মূল্যবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ২০ শতাংশে। অর্থাৎ সুদক্ষ নেতৃত্ব দিয়েই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল ইজরায়েল।
দ্বিতীয় কারণ – প্রতিটি নাগরিকই সেনা
দেশের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেম জাগানোর জন্য ইজরায়েলে রয়েছে একটি বিশেষ নিয়ম। সেখানে ১৮ বছরের পর প্রতিটি নাগরিকের মিলিটারি প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ ভাবুন, দেশের সব নাগরিকই সেনা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বর্তমানে ইহুদিরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক, তাদের শিকড়, তাদের আনুগত্যতা রয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের লোকেদের জন্য।
তৃতীয় কারণ – আত্মনির্ভর ইজরায়েল
শুরুর দিকে ইজরায়েল সামরিকভাবে নির্ভরশীল ছিল ফ্রান্স এবং আমেরিকার ওপর। কিন্তু, তারা খুব শীঘ্রই বুঝে যায় তাদের নিজেদের সক্ষমতা দরকার। তাই সময়ের সাথে সাথে ইজরায়েল নিজেকে উন্নত করেছে। নিজেদের অস্ত্রশস্ত্রকেও আধুনিক করেছে। ইজরায়েল আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ।
চতুর্থ কারণ – টাকার সৎ ব্যবহার
সরকারের কাছে যে টাকা বাঁচতো, সেই টাকায় দুর্নীতি নয়, বরং দেশের কল্যাণে, যেমন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণায় ব্যবহার করা হত। জানলে আরও অবাক হবেন, বিশ্বের প্রধান ৫০০টি টেক-জায়েন্টের মধ্যে ৮০টির গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে ইজরায়েলে। ইজরায়েলকে বলা হয় উদ্যোক্তাদের রাজধানী।
পঞ্চম কারণ – উন্নত প্রযুক্তি
ইজরায়েল মরুপ্রধান দেশ হলেও এরা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধুধু বালু প্রান্তরকে উর্বর ভূমিতে রুপান্তর করেছে। এরা শুধু নিজের দেশের জন্য তাজা ফল ও সবজি উৎপাদন করেছে তা নয়, এরা সেই ফসল রপ্তানিও করছে। বিশ্বের মধ্যে জনপ্রিয় ড্রিপ সেচ পদ্ধতি এই ইজরায়েলই শুরু করেছে।
ষষ্ঠ কারণ – ব্যবসা
তারা শুধু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে তাই নয়। তারা জানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে টাকা কামানো যায়। তাই তারা ভারত, আমেরিকার মতো বড় বড় দেশকে নিজেদের বন্ধুর তালিকায় রেখেছে। একদিকে তারা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে উৎপাদিত শস্য আবার অন্যদিকে রপ্তানি করে উন্নত সেরা সরঞ্জাম।
জানলে অবাক হবেন, ইজরায়েল, আমেরিকা আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলিকে ১০ শতাংশ সেনা সরঞ্জাম দেয়। আধুনিক যুদ্ধের মূল হাতিয়ার ড্রোন, আর সারা বিশ্বের ড্রোনের ৬০ শতাংশ ইজরায়েলে তৈরি হয়।
সপ্তম ও আসল কারণ – অস্তিত্বের লড়াই
এতক্ষণ ধরে যেগুলি বললাম, সেগুলি ইজরায়েলের উন্নতির অন্যতম কারণ হলেও, ইজরায়েলের এত শক্তির আসল কারণ হল তাদের অস্তিত্বের লড়াই। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। ইহুদীদের কেবলমাত্র একটিই দেশ ইজরায়েল। তাদের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস তারা ভোলেনি। মুসলিম হোক বা ব্রিটিশ – বারবার অত্যাচার করেছে এই ইহুদীদের ওপর! বিশ্বে যেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা ২০০ কোটি, সেখানে মুসলিমদের চোখের বিষ তথা ইহুদীদের জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটা তাদের উন্নতির মূল কারণ। একটা কথা নিশ্চয়ই আপনারা শুনেছেন – Necessity is the mother of invention. আর একথা প্রমাণ করেছে ইজরায়েল।
আমেরিকা কেন ভয় পায় ইজরায়েলকে? | Why Israel Is So Powerful?
আচ্ছা এতক্ষণ তো শুনলেন ইজরায়েল এত শক্তিশালী হল কীভাবে। কিন্তু আপনি কি জানেন কেন আমেরিকাও ভয় পায় ইজরায়েলকে?
এর জন্য আপনাদের জানতে হবে বেশ কিছু তথ্য। বলা যায় – আপনি ইজরায়েলকে পছন্দ নাই করতে পারেন, কিন্তু আপনি তাদেরকে অবহেলা কিংবা অবজ্ঞা করতে পারবেন না।
জানলে অবাক হবেন, আমেরিকায় যে সমস্ত কার্টুন দেখানো হয়, তার অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করে ইহুদীরা। আর সেই সকল কার্টুনে ইজরায়েলকে সৎ এবং মহান হিসাবে দেখানো হয়। ফলত ছোট থেকেই আমেরিকানদের মনে ইজরায়েল নিয়ে একটি সফট কর্নার তৈরি করা হয়ে আসছে। এমন একটি কার্টুন হল দ্যা প্রিন্স অফ ইজিপ্ট।
তবে, এখানেই শেষ নয়। জানলে অবাক হবেন, আমেরিকার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ২০ শতাংশ শিক্ষকই ইহুদী। এমনকি হলিউড সিনামের মাধ্যমে ছড়ানো হয় ইজরায়েল ভাবাবেগ। হলিউডের ৫৯ শতাংশ লেখক এবং পরিচালক সবাই ইহুদী। রিপোর্ট বলছে, আমেরিকার চারটি প্রধান ফিল্ম কোম্পানি ইহুদীদের। স্টিভেন স্পিলবার্গ – যিনি আমেরিকার অস্কারজয়ী পরিচালক, তিনিও ইহুদী ধর্মের লোক। শুধু তাই নয়, আমেরিকার একাধিক প্রধান সংবাদ সংস্থা ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রিপোর্ট বলছে, প্রধান আমেরিকান সংবাদ সংস্থাগুলির ৬১ জন লেখক ইজরায়েলপন্থী। ৩টি প্রধান নিউজ মিডিয়া কোম্পানির সিইও ইহুদী, যেমন সিএনএন, এনবিসি, এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস। সুতরাং, সিনেমা থেকে সংবাদ – যারা শুধু আমেরিকার নয়, সারা বিশ্বের পার্সপেকটিভ তৈরি করে সেখানেই নিয়ন্ত্রন চলে ইহুদীদের। হিন্ডেনবার্গ থেকে ব্লুমবার্গ – সবারই মালিক ইহুদী।
এছাড়া, ব্যাঙ্কিং সেক্টরের মধ্যে গোল্ডম্যান শ্যাক্স, জেপি মরগ্যান চেজ, ব্ল্যাক রক, ডিই শ, পে প্যাল সবই হয় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ইহুদী নিয়ন্ত্রিত।
এছাড়া ইন্টেল, যারা প্রসেসর তৈরি করে, এনভিডিয়া – যারা র্যাম এবং গ্রাফিক্স কার্ড তৈরি করে, এদের সবথেকে বড় হাব আছে ইজরায়েলে।
ডেল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল, তিনিও একজন ইহুদী।
ফেসবুকের মালিক মার্ক জাকারবার্গ একজন ইহুদী। তিনি বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম এবং ম্যাসেঞ্জারের মালিক।
এমনকি জানলে হবেন, বর্তমানে এআই-এর পথিকৃৎ ওপেন এআই অর্থাৎ চ্যাটজিপিটি-র সিইও স্যাম অল্টম্যান একজন ইহুদী।
এবার আসা যাক আরও বড় একটি চিত্রে। গুগল, অর্থাৎ যাকে ছাড়া আমাদের জীবন অসম্পূর্ণ। সেই গুগলের মালিক কারা? ল্যারি পেজ আর সারগেই ব্রিন। এরা দুজনেই ইহুদী। ইউটিউব থেকে শুরু করে গুগল প্লেস্টোর এবং গুগল পে সবকিছুই এদের অধীনে।
এমনকি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যাল্ভিন ক্লেন থেকে পোলো, র্যালফ লড়েন সবার মালিক ইহুদী। হোটেল ব্যবসায় প্রসিদ্ধ নাম হায়াত রেজেন্সির মালিকও একজন ইহুদী।
আশা করছি, পেগাসস মামলা আপনারা কেউই ভোলেননি। পৃথিবীর সবথেকে বড় হ্যাকিং সফটওয়্যার পেগাসস ইজরায়েলেরই তৈরি। যে সফটওয়্যারকে ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের, যে কোনও ব্যাক্তির কথোপকথন, মেল বা ম্যাএসজ হ্যাক করে নিতে পারে এই সফটওয়্যার। কয়েক বছর আগে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে এই সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ এনেছিল মমতা-রাহুল-রা।
অর্থাৎ, ব্যাঙ্কিং সফটওয়্যার থেকে আপনার সার্চ অপশন, ইমেল থেকে শুরু করে পেমেন্ট সবকিছুই কখনও প্রত্যক্ষ আবার কখনও পরোক্ষভাবে ইজরায়েলের অধীনে রয়েছে। ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ, অ্যাপল ডিভাইসের ফেস আইডি, ভিওআইপি কলিং থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রথম ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং সার্ভিস, নেটওয়ার্ক ফায়ারওয়াল, এন্ডোস্কপির জন্য ব্যবহৃত ছোট ক্যামেরা, হাইব্রিড শশার বীজ, ড্রিপ সেচ পদ্ধতি থেকে প্রতিরক্ষা খাতের একাধিক অস্ত্র সামগ্রী সবই ইজরায়েলের।
এদের কাছে রয়েছে অর্থ, রয়েছে বিস্তৃত প্রযুক্তি।
অনেকেই আবার বলছেন জেফ্রে এপস্টিন নিজেও একজন মোসাদের স্পাই, কিংবা মোসাদের হয়ে কাজ করতেন। যদিও এর কোনও সত্যতা এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু, অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই কারণেই আজ ট্রাম্পের ওপর ইজরায়েলের এত কর্তৃত্ব।
এবার আসি কেন ইজরায়েলকে হারানো অসম্ভব?
কোনও দেশ কতটা শক্তিশালী সেটা বোঝা যায়, সেই দেশের সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র, সৈন্যবল, আর্থিক ক্ষমতা, এবং পারমাণবিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে।
মাত্র ১ কোটি জনসংখ্যার দেশ ইজরায়েলের এই সকল সামরিক সরঞ্জাম টেক্কা দিতে পারে পাকিস্তান, ইরানে, সৌদি আরবের মতো বহু দেশকে।
ইজরায়েলের প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষ। যা তাদের জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। আবার একথা আপনাদের আগেই বলেছি যে তাদের প্রায় সব নাগরিকই সেনা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। তাহলে সংখ্যাটা কী দাঁড়াল? প্রায় ১ কোটি।
এছাড়া, ইজরায়েলের রয়েছে নিজেদের তৈরি বিশ্বের অন্যতম উন্নত ট্যাঙ্ক Merkava ট্যাঙ্ক। আর তাদের মোট ট্যাঙ্কের পরিমাণ দেড় হাজারের বেশি। রয়েছে আধুনিক আর্টিলারি, ড্রোন ও সাইবার সাপোর্ট।
এছাড়া রয়েছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি আরমার্ড ভেহিকেল, ৭০০ আর্টিলারি এবং ৫০-এর বেশি MLRS রকেট সিস্টেম।
এবার আসি জলপথ সম্পর্কে। ইজরায়েলের রয়েছে প্রায় ৭০টি নৌযান, ৫-৬টি সাবমেরিন, ৪০-এর বেশি মিসাইল করভেট এবং পেট্রোল বোট।
আকাশপথের জন্য তাদের রয়েছে আমেরিকার তৈরি F-35I Adir, F-15, F-16-এর মতন উন্নত যুদ্ধবিমান। মোট সামরিক বিমানের সংখ্যা ৬০০, ফাইটার জেটের সংখ্যা ২৫০, এবং হেলিকপ্টারের সংখ্যা ১৫০।
এছাড়াও, ইজরায়েলের কাছে রয়েছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন – স্বল্পপাল্লার রকেট ধ্বংসকারী Iron Dome। মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য David’s Sling। ব্যালিস্টিক মিসাইল আটকানোর জন্য রয়েছে Arrow system। যার মাধ্যমে যে কোনও রকেত বা যুদ্ধ বিমান কিংবা ড্রোণ হামলা থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
এবার আসি তাদের সবথেকে বড় শক্তি সম্পর্কে অর্থাৎ পারমাণবিক শক্ত। ইজরায়েলের মতো এই ছোট্ট দেশের কাছে রয়েছে আনুমানিক ৯০টি অ্যাটমিক ওয়ারহেড। যেখানে ১৫০ কোটির দেশ ভারতের কাছে রয়েছে ১৮০টি এবং ২০ কোটির দেশ পাকিস্তানের কাছে রয়েছে ১৭০টি।
আর এই দেশের সামরিক বাজেট জানলে মাথা ঘুরে যাবে আপনার। পাকিস্তানের সামরিক খাতে বাজেট যেখানে মাত্র ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার। সেখানে ইজরায়েলের এই সংখ্যাটা ২০ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার। ভাবতে পারছেন?
তাই যদি কেউ ইজরায়েলের ওপর পরমাণু হামলা করে, তাহলে ইজরায়েল সেই দেশের সাথে আরও ১০টি দেশকে খতম করার ক্ষমতা। তাই এই তথ্যগুলো সহজেই পরিষ্কার করে দেয় ইজরায়েলকে হারান একপ্রকার অসম্ভব।
ইজরায়েলের এই উন্নতি নিয়ে আপনাদের কী মনে হয়? কীভাবে দেখবেন তাদের এই আগ্রাসনকে? ইজরায়েল কী ঠিক করছে? নাকি ভুল? জানাতে ভুলবেন না আপনাদের মতামত কমেন্ট করে।












