সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: সোনার বাজারে গত ১৭ বছরের মধ্যে সবথেকে বড় ধস (Gold Price)। যে হলুদ ধাতু গত বছর বিনিয়োগকারীদের আনুমানিক ৬৫ শতাংশ মুনাফা দিয়েছিল, ২০২৬-এর মার্চ মাস আসতেই সেই ছবি সম্পূর্ণরূপে বদলে গিয়েছে। হ্যাঁ, বিশ্ববাজারে সোনার দামে এরকম নজরবিহীন পতন ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের পর আর দেখা যায়নি বলেই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মাত্র একমাসে সোনার দাম প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ তলানিতে ঠেকেছে। আর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন, এই পতন কি আরও চলবে, নাকি এখনই সোনা কিনে রাখার সবথেকে উপযুক্ত সময়? জানুন বিস্তারিত।
তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সোনার দাম
প্রসঙ্গত, গত বছরের শেষের দিকে এবং ২০২৬ এর শুরুতে সোনার দাম একেবারে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে প্রতি আউন্স ৫০০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরেই শুরু হয় আসল খেলা। বিশেষজ্ঞরা এই পতনের পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ দেখাচ্ছেন। প্রথমত, সোনার দাম আকাশছোঁয়া হতেই বড় বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের জমানো সোনা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে থাকে। আর সোনা বেচে দেওয়ার এই হিড়িক বাজারে সরবরাহের তুলনায় আরও চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে এবার ডলারকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে অন্য দেশের মুদ্রার নিরিখে সোনা কেনা আরও ব্যায়বহুল হয়ে পড়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের খরচ সামাল দেওয়ার জন্য রাশিয়া গত দুই মাসে রেকর্ড ১৪ টন সোনা বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। আর একই পথ তুরস্কও ধরেছে। দেশীয় মুদ্রার মান বজায় রাখার জন্য এই দুই দেশ টন টন সোনা বিক্রি করার কারণে বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা অনেকটাই কমেছে।
প্রসঙ্গত, যখন সুদের হার কমে, তখন সোনার দাম বাড়ে। আর বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিল যে, ২০২৬ এর শুরুতেই মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ হয়তো সুদের হার কিছুটা কমাবে। কিন্তু ইরান এবং ইজরায়েলের যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি আবারো বেড়েছে। যার ফলে সুদের হার কমার সম্ভাবনা এখন নেই বললেই চলে, যা সোনার মতো সম্পদের আকর্ষণ আরও কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করতে আগ্রহী। আর সেই খবর প্রকাশ্যে আসার মধ্যেই গত মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে সোনার দাম ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। মার্কিন সোনার ফিউচার প্রতি আউন্সে ১.৫% বেড়ে ৪৫৯৮ ডলারে পৌঁছে যায়। কিন্তু হ্যাঁ, সুদের হার কমানো নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে এই উত্থান স্থায়ী হবে কিনা তা নিয়ে এখনো পর্যন্ত থেকে যাচ্ছে সংশয়।
আরও পড়ুন: উপকূলে আটকে মৎস্যজীবীদের হাজার হাজার ট্রলার, অর্থনীতিতে বড়সড় ধসের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এদিকে জেপি মরগ্যান এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বিশ্ব বিখ্যাত আর্থিক সংস্থাগুলি বলছেন যে, এই পতনকে বিশ্ববাজারে একটি স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবেই দেখতে হবে। তাদের মতে, ২০২৬ এর শেষ বা ২০২৭ এর শুরুতে সোনার দাম আবারও আউন্স প্রতি ৫০০০ থেকে ৫৪০০ ডলার পর্যন্ত ছাড়াতে পারে। আর যারা খুব দ্রুত বা কয়েকদিনের মধ্যেই লাভের আশা করছেন, তাদের জন্য বর্তমান বাজার কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ তা বলা যায়। কারণ, তেলের দাম আর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাজারে এরকম অস্থিরতা বজায় থাকবে।












