সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি কত তারিখে পড়ছে (Makar Sankranti 2026)? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আপামর বাঙালিদের মনে। কারণ, হিন্দু ধর্মে মকর সংক্রান্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র একটি তিথি। গোটা দেশ জুড়েই এই দিনটি পালন করা হয়। দেশের এক এক জায়গায় এই উৎসব বিভিন্ন নামে পালিত হয়। যেমন বাংলায় মকর সংক্রান্তির এই বিশেষ দিনটি পৌষ পার্বণ হিসেবেই পালিত হয়। তবে আগামী বছরের মকর সংক্রান্তির দিনক্ষণ, তিথি নক্ষত্র, শুভ সময়, নিয়মকানুন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানতে হলে অবশ্যই প্রতিবেদনটি পড়ুন।
২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি কত তারিখে? | Makar Sankranti 2026 Date And Time |
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী জানা গেল, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি পড়ছে ১৪ জানুয়ারি, বুধবার। আর সূর্য এদিন মকর রাশিতে প্রবেশ করবে দুপুর ২টো ৪৯ মিনিটে। এর মধ্যে পুণ্যকাল রয়েছে দুপুর ২টো ৪৯ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৪২ মিনিট পর্যন্ত। আর মহা পুণ্যকাল হিসেবে বিবেচিত হবে দুপুর ২টো ৪৯ মিনিট থেকে বিকাল ৩টে ৪২ মিনিট পর্যন্ত।
মকর সংক্রান্তি ২০২৬ সংক্ষেপে
| বিষয় | তথ্য |
| উৎসবের নাম | মকর সংক্রান্তি |
| ইংরাজি তারিখ | ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ |
| বাংলা তারিখ | ২৯ পৌষ, ১৪৩২ |
| তিথি শুরু | দুপুর ২:৪৯ |
| পুণ্যকাল | দুপুর ২:৪৯- ৫:৪২ |
| মহা পুণ্যকাল | ২:৪৯-৩:৪২ |
| বিশেষ আকর্ষণ | পিঠেপুলি খাওয়া |
মকর সংক্রান্তির মাহাত্ম্য
বলে রাখি, মকর সংক্রান্তির জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই দিন সূর্য ধনু রাশি ছেড়ে মকর রাশিতে প্রবেশ করে, আর মকর শনি দেবের রাশি। শাস্ত্র মতে, সূর্য এবং শনি পিতা-পুত্র। তবে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো না। আর শনির ঘরে সূর্যের গমন জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। তবে এই দিনটি কোনও শুভ অনুষ্ঠানের জন্য ভালো না। যেমন, গৃহপ্রবেশ, বিবাহ, নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য একদমই শুভ নয় এই দিন।
মকর সংক্রান্তির ইতিহাস
জানিয়ে রাখি, মকর সংক্রান্তির ইতিহাস অনেক প্রাচীনকাল থেকেই শুরু। কারণ, হিন্দু পুরাণ এবং প্রাচীন কৃষিকাজের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মহাভারত আর পুরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলিতে মকর সংক্রান্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিছু কিছু গল্পে বলা হয় যে, এই উৎসবে সূর্য দেবতার এবং তাঁর পুত্র শনিদেবের সঙ্গে দেখা করার কথা। আবার অন্যান্য গল্পে দেবী সংক্রান্তি এবং কীভাবে তিনি সংকরা শঙ্করাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। আর বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে এই দিন পিঠেপুলি খাওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে।
এদিকে মকর সংক্রান্তি থেকে শুরু হয় ফসল কাটার মূল মরসুম এবং এইদিন থেকেই সূর্যের দক্ষিণায়ন শেষে শেষ হয়ে উত্তরায়ন শুরু হয়। মকর সংক্রান্তি থেকেই দিন বড় হতে শুরু করে এবং রাত আবারও ছোট হয়। আর সূর্য দিনের বেলা উত্তর গোলার্ধের দিকে একটু হেলে পড়ে। মহাভারতেও এই মকর সংক্রান্তি সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
মকর সংক্রান্তির দিন কী কী করা উচিত?
সাধারণত মকর সংক্রান্তির দিন পূর্ণ স্নান, সূর্যকে অর্ঘ্য, তিল বা গুড়ের মিষ্টান্ন খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো এসব করতে হয়। তবে অবশ্যই নিম্নলিখিত কাজগুলি করার চেষ্টা করুন। তাহলে ভালো ফলাফল পাবেন—
- পবিত্র স্নান এবং পুজো: এই দিন গঙ্গাস্নান বা অন্য কোনও পবিত্র জলাশয় থেকে স্নান করুন। সূর্যদেবকে জল অর্পণ করুন এবং ‘ওম সূর্যায় নমঃ’ মন্ত্রটি জপ করুন।
- বিশেষ খাবার: মকর সংক্রান্তির দিন তিল বা গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি খাওয়ার চেষ্টা করুন এবং অন্যদের দান করুন।
- উৎসব: মকর সংক্রান্তির দিন ঘুড়ি উড়ান, লোকনৃত্যে অংশগ্রহণ করুন বা মেলা দেখতে যাওয়া উচিত।
- দান ধ্যান: এই দিন তিল, গুড়, ডাল, কম্বল বা উষ্ণ পোশাক এবং নগদ অর্থ দান করার চেষ্টা করুন। তাহলে ভগবানের কৃপা বর্ষিত হয়।
- আচার অনুষ্ঠান: সূর্যদেবকে খুশি করার জন্য অবশ্যই মকর সংক্রান্তির দিন তামার মুদ্রা, গুড়, চাল নদীতে ভাসিয়ে দিন।.
কেন এগুলি মেনে চলা উচিত?
আসলে মকর সংক্রান্তির দিন এইগুলি মেনে চলার পিছনে বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ আর উত্তরায়নকালে সূচনাকে নির্দেশ করে যা নতুন সূচনা, সমৃদ্ধি আর আধ্যাত্মিক শুদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই কারণে পবিত্র নদীতে স্নান, তিল বা গুড় দান এবং সূর্যকে পূজা করাকে শুভ বলে মনে করা হয়। দ্বিতীয়ত, এই দিনটিকে শীতের শেষ দিন হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়। আর এই নিয়মগুলি মেনে চললে ইতিবাচক শক্তি ধরা দেয়, আর জীবনে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি ফিরে আসে বলেই বিশ্বাস করা হয়।
মকর সংক্রান্তির আচার এবং খাবারদাবার
বলে রাখি, মকর সংক্রান্তি উদযাপন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মেনেই হয়। আর এই দিন সব সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়। প্রথমে ঘর পরিষ্কার করে নিতে হয়। তারপর সূর্য বা অন্যান্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতে হয়। আর এই বিশেষ দিনে তিল বা গুড় দিয়ে বিশেষ খাবারও তৈরি করা হয়। পাশাপাশি অনেকে পবিত্র নদীতে পবিত্র স্নান করেন। কারণ, বিশ্বাস করা হয়, এদিন সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। এমনকি তিল এবং গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের মধ্যেও ভাগ করে নিতে হয়।
আরও পড়ুন: ২০২৬ এ কত তারিখে পড়ছে মাঘী পূর্ণিমা? রইল সময়সূচী, তিথি নক্ষত্র ও পূজার নিয়ম
প্রসঙ্গত, মকর সংক্রান্তি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন নামে পালিত হয়। যেমন বাংলায় পৌষ পার্বণ বা পিঠেপুলির আয়োজন। আবার বিহার বা উত্তরপ্রদেশে মকর সংক্রান্তি পালিত হয় খিচড়ি পরব হিসেবে। এছাড়া তামিলনাড়ুতে মকর সংক্রান্তি পোঙ্গল, অসমে বিহু, পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় লোহরি ইত্যাদি নামে পরিচিত।












