সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জামাইষষ্ঠী। তবে এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে জামাইষষ্ঠী কত তারিখে পড়ছে (Jamai Sasthi 2026)? ষষ্ঠী কখন শুরু হচ্ছে আর কখন ছারাচ্ছে? পাশাপাশি কীভাবে জামাইকে আপ্যায়ন করবেন আর মাহত্ম্য কী রয়েছে? সবটাই জানাবো আজকের প্রতিবেদনে। বিশেষ করে কলকাতাতে জামাইষষ্ঠী শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে জামাইয়ের বন্ধনকে আরও সুসজ্জিত করে তোলার একটি উৎসব। আর এই দিন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্যের মধ্য দিয়েই পালন করা হয়। বিশদে জানুন।
২০২৬-এ জামাইষষ্ঠী কত তারিখে? | Jamai Sasthi 2026 Date And Time |
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে জামাই ষষ্ঠী পড়ছে ২০ জুন, শনিবার। ষষ্ঠী তিথি শুরু হচ্ছে ১৯ জুন ২০২৬, বিকাল ৪:৫৯ মিনিটে এবং ষষ্ঠী তিথি শেষ হচ্ছে ২০ জুন ২০২৬, বিকাল ৩:৪৬ মিনিটে। এদিকে বাংলা ক্যালেন্ডারে হিসেবে আমরা জানতে পারছি, এই দিনটি পড়ছে ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩ সন।
জামাইষষ্ঠীর তাৎপর্য
হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দিনটি উদযাপন করা হয়। এদিন বিবাহিত মেয়ের বাবা-মা তাঁদের জামাইকে নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ করেন এবং সুস্বাদু খাবার, উপহার এবং বস্ত্র দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন। এমনকি হিন্দু ধর্মালম্বীদের মধ্যে জামাইষষ্ঠী একটি সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক উৎসব। এই উপলক্ষে দেবী ষষ্ঠীকেও ভক্তিভরে পূজা করা হয়। পাশাপাশি উৎসবটি বিশেষ করে বাংলা, ওড়িশা, বিহার এবং উত্তর ভারতের বেশ কিছু অংশে ধর্মীয় এবং পারিবারিক ভাবে পালিত হয়। শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শিশুদের দেবী ষষ্ঠীর উদ্দেশ্যই উৎসর্গ করা হয়।
জামাইষষ্ঠী পালনের নিয়ম
ওড়িশা এবং বাংলার ক্ষেত্রে জামাইষষ্ঠী অত্যন্ত আনন্দ এবং আরম্ভরের সঙ্গে পালন করা হয়। এই উৎসব দেবী ষষ্ঠীর পূজার মাধ্যমে শুরু হয়। সেখানে শাশুড়ি তাঁর পরিবারের সুখ এবং মঙ্গলের জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। আর কর্পূর দিয়ে পূজার সময় আরতি করেন। এমনকি জামাইয়ের কপালে পবিত্র তিলক পরিয়ে দেন আর তাঁকে বরণ করেন। পাশাপাশি সুরক্ষা এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে জামাইয়ের কবজিতে একটি পবিত্র হলুদ সুতো বেধে দেওয়া হয়। উৎসবের প্রস্তুতি তো একদিন আগেই শুরু হয়। কারণ, শাশুড়িরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এদিন মেয়ে এবং জামাইয়ের জন্য বিভিন্ন রকম উপহার, শাড়ি বা সোনার গয়না কেনেন। এমনকি বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন: ৫০০০ বছরের পুরনো প্রথা, জানুন হিমাচলের এই রহস্যময় ‘রাউলানে’ উৎসব সম্পর্কে
জামাইষষ্ঠীর পূজার বিধি
জামাইষষ্ঠীর দিন শাশুড়িদেরকে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি মেনে পূজা করতে হয়। এতে মেয়ে এবং জামাইয়ের কল্যাণ হয়।
- খুব ভোরবেলা উঠে শাশুড়িদেরকে স্নান করে ষষ্ঠী পূজা করা উচিত।
- পূজার পর মেয়ে এবং জামাই বাড়ি ফিরতেই তাঁদেরকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
- ষষ্ঠী দেবীর পূজা করার জন্য একটি থালায় জল, দূর্বা, পান পাতা, সুপারি, মিষ্টি, দই, ফুল, ফল ইত্যাদি রাখতে হয়।
- তারপর ষষ্ঠী দেবীর পূজার জল জামাইয়ের উপর ছিটিয়ে দিতে হয়।
- এরপর তাঁকে আরতী করতে হয় এবং তারপর জামাইয়ের কপালে দইয়ের তিলক পড়ানো হয় আর ষষ্ঠী দেবীর সেই হলুদ সুতো বেঁধে দেওয়া হয়, এবং সুরক্ষা এবং দীর্ঘ জীবনের জন্য প্রার্থনা করা হয়।
- এই দিন জামাইকে বিশেষভাবে যত্ন নিতে হয় এবং মেয়ে ও জামাইয়ের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করার পাশাপাশি ঈশ্বরের কাছে গোটা পরিবারের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করতে হয়।
- নতুন পোশাক আদানপ্রদান করতে হয় এবং বিশেষ খাবারের আয়োজন করতে হয়।
- জামাইকে বিশেষ করে এদিন মিষ্টি, আম বা লিচুর মতো ফল খাওয়াতে হয়।
- তবে আগেকার যুগে খাওয়ানোর সময় জামাইকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করার প্রথা চালু ছিল। যদিও এটি এখন দেখা যায় না।
জামাইষষ্ঠীর আচার অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্য
বাঙালি পরিবারগুলোতে জামাইষষ্ঠী সবথেকে উৎসাহ এবং আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। আর দেবী ষষ্ঠীর পূজার মাধ্যমে যেমন উৎসব শুরু করতে হয়, তেমনই শাশুড়িরা তাঁর পরিবারের মঙ্গলের জন্য দেবি ষষ্ঠীর কাছে এদিন আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। আর জামাইকে স্বাগত জানিয়ে তাঁকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে তিলকও পরিয়ে দেন শাশুড়িরা। পাশাপাশি জামাইয়েরও শাশুড়িকে প্রণাম করা উচিত।
আরও পড়ুন: এবছর কবে নীলষষ্ঠী? মহিলারা কেন এদিন ব্রত করেন? জানুন আসল কাহিনী ও মাহাত্ম্য
জামাইষষ্ঠীর এলাহি খাবার
জামাইষষ্ঠীর দিন শাশুড়ি তাঁর জামাইকে রাজকীয় আপ্যায়ন করেই সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করেন। বিশেষ করে এদিন দুপুরে খাবারে শাশুড়ি তাঁর জামাইকে ভাত, ডাল, পাঁচ ধরনের ভাজা, সবজি, কষা মাংস, ইলিশ ভাপা, আরও অনেক সুস্বাদু খাবার খাইয়ে থাকেন। এছাড়া রসালো ফল, মিষ্টি, দই ইত্যাদির প্রচলন তো রয়েছেই। এই দিনটি একদিকে যেমন জামাই আদরের দিন, তেমনি খাওয়া-দাওয়ার দিক থেকে ভোজন রসিকদের জন্য সেরা দিন।












