বিনা হিটারেও উষ্ণ ঘর, জলবিহীন টয়লেট! লাদাখে সোনম ওয়াংচুকের অভিনব অট্টালিকা

Published:

Sonam Wangchuk House

অনন্যা সরকার, লাদাখ: ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার ফুংসুখ ওয়াংডু চরিত্রটি যাঁকে ভিত্তি করে বানানো, সেই প্রখ্যাত গবেষক, শিক্ষাসংস্কারক ও ইঞ্জিনিয়ার সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk) ২০ দিন ধরে অনশন চালাচ্ছেন। এখন সারা দেশের নজর এখন তার দিকেই। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস কান্ডে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের (Dharmendra Pradhan) পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশনে বসেছেন তিনি। এরই মাঝে, লাদাখে তাঁর অভিনব বাড়িটি এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউটিউবার অমিতা ছোগিয়া নেগির একটি পুরনো ভিডিওর মাধ্যমে এই বাড়ির ছবি সামনে আসতে শুরু করেছে। সোনম ওয়াংচুক প্রায় তিন বছর আগে প্রথম লাদাখে তাঁর বাড়ির একটি ঝলক দেখিয়েছিলেন। কী রয়েছে তাঁর বাড়িতে? কেন অনন্য এটি? চলুন জেনে নিই। 

সোনমের বাড়িতে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির অদ্ভুত মিশেল

সোনম ওয়াংচুকের মাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি দোতলা বাড়িটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। বাড়িটি কোনো হিটার ছাড়াই হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রাতেও উষ্ণ থাকতে পারে। এর পাশপাশি সোনমের এই অত্যন্ত জল-সাশ্রয়ী বাড়িটিতে রয়েছে একটি নন-ফ্লাশ টয়লেট, যেখানে জলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় কাঠের গুঁড়ো। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্যগুলো সাস্টেইনেবল বা টেকসই জীবনযাপনের এক নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে এবং এটিকে বিশ্বের এক অভূতপূর্ব বাড়িতে পরিণত করেছে।

লাদাখের তুষারাবৃত পাহাড়ের মাঝে মাটি দিয়ে নির্মিত সোনম ওয়াংচুকের এই বাড়িটিতে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি ও লাদাখি স্থাপত্যশৈলীর প্রতিফলন দেখা যায়। এর বাইরের ডিজাইনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল পুরো সামনের অংশ জুড়ে গ্রিড প্যাটার্নে বিস্তৃত কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো বড় বড় কাঁচের জানালাগুলো। এই কাঁচের বাইরের অংশটি একটি সম্পূর্ণ কালো ভেতরের দেয়ালকে ঢেকে রেখেছে, যা শোষণ করে সূর্যরশ্মি। তীব্র শীতে বাড়িটি গরম রাখার জন্য কোনো হিটার ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে বাড়িয়ে মধ্যে রয়েছে একটি কালো দেয়াল, যার পেছনে জলের বোতল রাখা হয়। এই বোতলগুলো সারাদিন সূর্যের আলো ও তাপ শোষণ করে এবং ঘরের রাতে তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখে।

বাড়িটির বসার ঘরে ঐতিহ্যবাহী মাটির দেয়াল এবং একটি সুন্দর কাঠের ছাদ দেখতে পাওয়া যায়। এই মাটির দেয়ালগুলো স্বাভাবিকভাবেই ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা কাঠের ছাদটি এটিকে  উষ্ণ ও ঐতিহ্যবাহী অনুভূতি তৈরি করে। এই খোলামেলা ও হওয়া খেলানো জায়গাটি একটি আধুনিক সোফা সেট, এক সুন্দর পুরোনোদিনের পিয়ানো এবং খাওয়ার জন্য একটি নিচু পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী ডাইনিং টেবিল দিয়ে সাজানো রয়েছে। বড় জানালাগুলো থেকে আসা প্রচুর সূর্যের আলো জায়গাটিকে আরও মনোরম করে তোলে। 

সোনম ওয়াংচুকের বাড়ির শোবার ঘরে সরলতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক মিশেল দেখা যায়। মাটির দেয়ালগুলো ঘরটিকে একটি শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী আবহ দেওয়ার পাশাপাশি ওপরে খোদাই করা সবুজ ফ্রেমের সুন্দর কাচের আয়নাটি ঘরের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। ঘরের মাঝখানে রয়েছে উজ্জ্বল ও পরিষ্কার নীল চাদরে ঢাকা কাঠের বিছানা। কাঠের দরজা, খোলা জানালা এবং একটি ঐতিহ্যবাহী কাঠের সিন্দুক শোবার ঘরটিকে অনন্য রূপ দিয়েছে।

বাড়ির বাথরুমটি কম অভিনব নয়। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশবান্ধবতার এক সুন্দর মিশ্রণ এটি। বাথরুমে ঢুকতেই সামনে কাঠের কাউন্টারটপের ওপর একটি স্টাইলিশ সাদা সিরামিকের ওয়াশবেসিন দেখা যায়। এর ওপরে একটি হৃদয়াকৃতির আয়না এবং দেয়ালজুড়ে ডিজাইনার টাইলস লাগানো রয়েছে। একদিকে আধুনিক ইলেকট্রিক গিজার গরম জলের জোগান দেয়, আবার অন্যদিকে বাঁশের পর্দাযুক্ত ঐতিহ্যবাহী জানালা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, জলের অপচয় রোধ করতে সোনমের বাড়িতে বিশেষ ‘ ইউরিন-সেপারেটেড টয়লেট’ রয়েছে। এই ফ্লাশ টয়লেটগুলিতে জলের পরিবর্তে কাঠের গুঁড়ো বা মাটি ব্যবহার করা হয়, ফলে দুর্গন্ধ কমে ও এই বর্জ্য সংগ্রহ করে পরে কৃষিক্ষেত্রে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আরও পড়ুনঃ যেমন লুক তেমন ফিচার্স! মাত্র ৮১৯৯ টাকায় বিরাট ফোন লঞ্চ করল itel

সবশেষে সোনম ওয়াংচুকের বাড়ির রান্নাঘরটিও সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে নিয়েছে। আধুনিক মডুলার কিচেন সেটআপের মাঝখানে একটি বড় গ্রানাইটের আইল্যান্ড কাউন্টার রয়েছে, যার মধ্যেই একটি সিঙ্ক ও কল বসানো রয়েছে। কাউন্টারের একপাশে রাখা উঁচু কাঠের চেয়ারগুলো রান্না করা, সবাই একসাথে বসে গল্প করা এবং খাওয়ার আরামদায়ক একটি জায়গা করে দিয়েছে। হালকা রঙের কাঠের ক্যাবিনেট এবং একটি পরিচ্ছন্ন, খোলামেলা ডিজাইন এই রান্নাঘরটিকে শুধু কার্যকরীই নয়, বরং পরিবারের সদস্যদের এক করার একটি চমৎকার স্থান করে তুলেছে।