সিপিএমের বুকস্টল নিয়ে বিরাট ধাক্কা দিল হাইকোর্ট

Published:

Book Stall CPIM

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দুর্গাপুজোর (Durga Puja) মরসুমে বইয়ের স্টল (Book Stall) বসানোকে কেন্দ্র করে রাজ্যের (West Bengal) বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত। সিপিএমের (Communist Party of India Marxist) অভিযোগ, একাধিক জায়গায় তাদের বুকস্টল ভাঙচুর করা হয়েছে, কোথাও আবার আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুর, হাওড়ার শিবপুর এবং কলকাতার ঢাকুরিয়া-সহ বিভিন্ন জায়গায় বইয়ের স্টল ঘিরে অশান্তির অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বামপন্থী দলগুলির প্রতিবাদ এবং পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। তবে এবার বামেদের বিরুদ্ধেই রায় দিল হাইকোর্ট (Calcutta High Court)।

এই ঘটনায় কী জানাল হাইকোর্ট?

বনগাঁয় সিপিএমের বুকস্টল নিয়ে শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, চল্লিশ বছর ধরে কোনও আইন কার্যকর করা হয়নি বলে এবছরও আইন প্রয়োগ করা যাবে না, সেটা হয় না। সিপিএমের আইনজীবী জানান, বহু বছর ধরে ওই এলাকায় পুজোর সময় স্টল বসানো হলেও কখনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাঁরা পূর্ত দফতর ও হাইওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন বলেও জানান। এর পর প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, অনুমতি না থাকলে পুলিশ কী করবে? আদালতের বক্তব্য, রাস্তার ধারে অনুমতি ছাড়া কোনও স্টল রাখা যাবে না। প্রধান বিচারপতি বলেন, “রাস্তার ধারে সব স্টল তুলে দিন। অনুমতি না থাকলে কারও স্টলের প্রয়োজন নেই। আইনের চোখে সকলেই সমান।” আদালত আরও জানায়, অন্য স্টলগুলির অনুমতি রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচ্য। সিপিএমের বুকস্টল বসানোর অনুমতিতে একক বেঞ্চের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২১ জানুয়ারি।

এর আগে বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ বনগাঁয় সিপিএমকে দলের কার্যালয়ের ১০০ মিটারের মধ্যে বুকস্টল বসানোর অনুমতি দিয়েছিল। স্টল তৈরি ও চালানোর সময় যাতে কোনও অশান্তি না হয়, তার জন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। শুনানিতে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, অন্যদের অস্থায়ী স্টল বসানোর সুযোগ দেওয়া হলে সিপিএমকে বই বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হবে কেন? তিনি বলেন, “যেখানে সকলের জিনিস বিক্রির সুযোগ রয়েছে, সেখানে মামলাকারীকে বই বিক্রি করতে বাধা দেওয়া যায় না।” বইয়ের স্টল বসানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের দ্বৈত নীতি থাকা উচিত নয় বলেও পর্যবেক্ষণ করেন বিচারপতি। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কণ্ঠস্বর দাবিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের আদর্শ নয়, এই বক্তব্যও উঠে আসে শুনানিতে। তবে রাজ্য সরকার ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায় এবং শুক্রবার একক বেঞ্চের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।

এদিকে, বুকস্টল ঘিরে অশান্তির অভিযোগ শুধু বনগাঁয় সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুর-পানপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের বুকস্টল ভাঙচুর করে আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে সিপিএম। কুলপি ও কলকাতার এন্টালিতেও বুকস্টল ঘিরে উত্তেজনা এবং বাধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। বীজপুরের স্থানীয় সিপিএম নেতা সুমন চক্রবর্তীর দাবি, তাঁদের ১৫-১৬ বছরের বুকস্টলটি গভীর রাতে ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে, হাওড়ার শিবপুর ও কলকাতার ঢাকুরিয়াতেও বুকস্টল ভাঙচুর এবং বাম কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন: পুজোর ছুটিতে কি আটকে যাবে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা? অক্টোবরের কিস্তি নিয়ে বড় আপডেট

বুকস্টল বিতর্কে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের মন্তব্য। তিনি বলেন, দুর্গা উৎসব উপলক্ষে বোর্ড বা স্টল করা নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই, কিন্তু কার্ল মার্কস ও লেনিনের মতাদর্শ প্রচার নিয়ে তাঁর আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে, বামপন্থীদের বক্তব্য, পুজোর সময় বই বিক্রি ও সাহিত্যচর্চা তাঁদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। ফলে একদিকে বুকস্টল ভাঙচুরের অভিযোগ, অন্যদিকে অনুমতি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ, সব মিলিয়ে পুজোর বুকস্টল ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে।

google button