চোরবাগান-কাণ্ডের পর অগ্নিসুরক্ষায় কড়াকড়ি, কলকাতার ৩ পুজো কমিটিকে নোটিস দমকলের

Published:

fire-department-notice

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: চোরবাগান (Chorbagan) সর্বজনীনের দুর্গাপুজোর (Durga Puja) মণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর কলকাতার বড় পুজোগুলির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজ্য। ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মণ্ডপে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে দক্ষিণ কলকাতার (Kolkata) তিন পরিচিত পুজো কমিটি যথা, ত্রিধারা সম্মিলনী (Tridhara Sammilani), বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন (Ballygunge Cultural Association) ও চেতলা অগ্রণীকে (Chetla Agrani) নোটিস পাঠিয়েছে দমকল বিভাগ। পরিদর্শনে একাধিক ঘাটতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলিকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে আলো, বায়ু চলাচল এবং প্রবেশ ও প্রস্থানপথের নিরাপত্তা ইত্যাদি সব দিকেই নজর দিচ্ছেন আধিকারিকেরা।

১. ত্রিধারা সম্মিলনী: মণ্ডপসজ্জায় অতিদাহ্য সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

এটা ত্রিধারা সম্মিলনীর ৮০তম বর্ষ। প্রায় ১৩ হাজার কলম দিয়ে তৈরি দুর্গামূর্তি এবং ‘সুরাসুর’ থিমের মণ্ডপ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। তবে মণ্ডপের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করতে গিয়ে দমকল আধিকারিকদের নজরে আসে একাধিক ত্রুটি। নোটিসে মণ্ডপসজ্জায় বিপুল পরিমাণ অতিদাহ্য সামগ্রী ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে পুজো কমিটি। ত্রিধারার কর্মকর্তা দেবাশিস কুমারের দাবি, মণ্ডপ উদ্বোধনের আগেই দমকলের অনাপত্তিপত্র বা NOC নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, অতিদাহ্য সামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপের কথা জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্টও জমা দেওয়া হয়েছে।

২. বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন: মণ্ডপের ভিতরে পর্যাপ্ত আলোর অভাব

দক্ষিণ কলকাতার পরিচিত সাবেকি পুজো বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের মণ্ডপেও অগ্নিসুরক্ষার ঘাটতি চিহ্নিত করেছে দমকল। সেখানে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দর্শনার্থীদের চলাচল ও নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। তাই মণ্ডপের ভিতরে প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, প্রবেশ ও প্রস্থানপথে কোনও ব্যবসায়িক কাজকর্মের কারণে যাতে দর্শনার্থীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে পুজো কমিটির এক কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দাবি, নিরাপত্তার নিয়ম মেনেই দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং আলোর ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি প্রবেশপথে বাধা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

৩. চেতলা অগ্রণী: আলো, ফ্যান ও এসির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

চেতলা অগ্রণীর মণ্ডপেও পর্যাপ্ত আলোর অভাবের পাশাপাশি দর্শনার্থীর সংখ্যার তুলনায় ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ঘাটতি ধরা পড়েছে। দমকলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিপুল ভিড়ের মধ্যে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই আলো, ফ্যান ও এসির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পুজোকে ঘিরে আরও একটি নিরাপত্তার বিষয় উঠে এসেছে অন্যান্য প্রকাশিত তথ্যে। মণ্ডপের লাগোয়া এলাকায় বেআইনি অস্থায়ী কাঠামো এবং LPG সিলিন্ডার রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ওই কাঠামো ও বিপজ্জনক স্টল সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশের কথাও জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে শনিবার চেতলা অগ্রণীতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

আরও পড়ুন: কাঁথিতে পুজো দিয়ে বামেদের কটাক্ষ, ‘আরশোলা-ছারপোকা’ নিয়েও সতর্কবার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর বড় পুজোমণ্ডপগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার খুঁটিনাটি যাচাইয়ের উপর জোর দিচ্ছে প্রশাসন। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচল এবং প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বাধামুক্ত রাখা সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি দূর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র কিছু মানুষের গাফিলতির জন্য এই আনন্দ উৎসবের দিনে আর কোনও মৃত্যু চাইছে না রাজ্য সরকার। এখন সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিগুলি কত দ্রুত সেই নির্দেশ কার্যকর করে, সেটাই দেখার বিষয়।

google button