আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: ভারত বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১৭.৮ শতাংশই ভারতের বাসিন্দা। বর্তমানে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ০.৮৭ শতাংশ। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে দেশের প্রজনন হার। জনসংখ্যাগত পরিস্থিতির এমন পরিবর্তন দেখে দুটির বেশি সন্তান (Two-Child Policy) থাকলে শাস্তি বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের আইনগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। ইতিমধ্যেই আইনগুলিকে পুনর্বিবেচনার জন্য বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে।
দুটির বেশি সন্তান থাকলেই নির্বাচন থেকে বাদ!
বুধবার বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চ জানিয়েছে, দুটির বেশি সন্তান থাকলে কাউকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেওয়ার মতো আইন বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, গত কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার আশঙ্কাকে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এই ধরনের আইন আদৌ কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
৩ থেকে কমে ১.৯, কী বলছে প্রজনন হারের পরিসংখ্যান?
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারতের মোট প্রজনন হার বা Total Fertility Rate (TFR)-এর পরিসংখ্যান। ২০০৩ সালে দেশে এই হার ছিল ৩। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯। সাধারণত ২.১-কে প্রজননের প্রতিস্থাপন হার (Replacement Level) হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, বর্তমান প্রজনন হার সেই স্তরেরও অনেকটা নীচে নেমে গিয়েছে। আদালতের বক্তব্য, প্রজনন হার এভাবে কমতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের জনসংখ্যার বিরাট পরিবর্তন আসতে পারে। এমন চলতে থাকলে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং কর্মদক্ষতা সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তৈরি হওয়া আইনগুলির নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি।
এই প্রসঙ্গে ২০০৩ সালের Javed vs State of Haryana মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ওই মামলায় দুটির বেশি সন্তান থাকলে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ ছিল, সেটি বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত। বর্তমান জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গিয়েছে। সেই কারণেই আগের রায়ে যে যুক্তির ভিত্তিতে দুই সন্তান নীতি বহাল রাখা হয়েছিল, তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে বেঞ্চ। বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে এই ধরনের আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। এই অনুচ্ছেদে স্বীকৃত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের মধ্যে প্রজনন স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের মতে, দুটির বেশি সন্তান থাকার কারণে কোনও নাগরিককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হল সেই ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকারে বাধা দেওয়া বা হস্তক্ষেপ করা। একজন ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম কি না, তার সঙ্গে তাঁর কতগুলি সন্তান রয়েছে এর যোগসূত্র কোথায়? প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এদিন শীর্ষ আদালত দুই সন্তান নীতি সংক্রান্ত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা খতিয়ে দেখতে বৃহত্তর বেঞ্চে বিষয়টি পাঠিয়েছে।
আরও পড়ুন: আগামীকালই অন্নপূর্ণা যোজনার যোগ্য-অযোগ্যদের ভাগ্য নির্ধারণ, বিজ্ঞপ্তি নবান্নের
উল্লেখ্য, আদালতে জমা দেওয়া রাজ্যগুলির আইন সংক্রান্ত তালিকা অনুযায়ী, সাতটি রাজ্য ইতিমধ্যেই দুই সন্তান সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে এবং ১৫টি রাজ্যে এমন কোনও নীতি নেই। অন্যদিকে অসম, গোয়া, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা ও উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে এখনও এই ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।










