স্বামীর মৃত্যু, কোলে চার মাসের সন্তান! ৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করে ৭৫ লাখের ব্যবসা কণিকার

Published:

Success Story

সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: সফলতাকে কোনও বাধাই আটকাতে পারে না। কিছু কিছু মানুষ এমনও থাকেন, যারা সংকটের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই লেখেন। আর এমনই এক অদম্য জেদ এবং লড়াইয়ের নাম অসমের নলবাড়ির বাসিন্দা কণিকা তালুকদার (Kanika Talukdar)। ২০০৮ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারানোর পর তাঁর কোলজুড়ে ছিল মাত্র চার মাসের একটি কন্যা সন্তান। আর মাত্র দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা এই নারী নিজের লড়াই আর পরিশ্রমের জেরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন (Success Story)।

বিপর্যয় কাটিয়ে পথচলা শুরু

আসলে স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরেই সংসারের টুকিটাকি কাজ করে তাঁকে দিন কাটাতে হচ্ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে তিনি একটি স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যোগদান করে সেখানে জীবিকাসখী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তারপর সেখান থেকেই তিনি ব্যবসা এবং টিম ওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।

এরপর স্বনির্ভর গোষ্ঠী সদস্যদের সঙ্গে নলবাড়ির কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে পরিদর্শনের সময় তাঁর জীবন নতুন মোড় নেয়। সেখানে কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. মানসী চক্রবর্তীর কাছ থেকে সার বা ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। এরপর ট্রেনিং শেষে এক মুহূর্ত নষ্ট না করে নিজের বাপের বাড়ির পেছনের সামান্য জমিতে মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে সার তৈরির জায়গা করে ফেলেন কণিকা। দামি সরঞ্জামের টাকা না থাকার কারণে বাড়ির আশেপাশের জৈব আবর্জনা দিয়েই শুরু হয় তাঁর এই মিশন।

তবে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করলেও তা বিক্রি করা প্রথম দিকে একেবারেই সহজ ছিল না। নলবাড়ির স্থানীয় চাষীদের রাসায়নিক সারের জায়াগায় জৈব সার ব্যবহারের উপকারিতা সম্পর্কে সেরকম কোনও ধারনাই ছিল না। সেই কারণে তাঁর সার কেউ কিনতে কেউ আগ্রহী ছিল না। তবে তিনি এতে দমে যাননি। ২০১৮ সাল থেকে তিনি নিজেই সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে কাজে নেমে পড়েন। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন আর জৈব সারের উপকারিতা বোঝান। এমনকি বিভিন্ন স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করে মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর উপর কৃষকদের ভরসা বাড়ে, আর সারের বিক্রি বাড়তে শুরু করে।

আরও পড়ুন: শহর থেকে পাঠানো হবে গ্রামের স্কুলে? শিক্ষকদের বদলি নিয়ে ভাবছে রাজ্য সরকার

ষাঁড় বিক্রি করেই রেকর্ড আয়

২০১৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ব্র্যান্ড জয়াতু অর্গানিক প্রোডাক্টস লঞ্চ করে ফেলেন। কিন্তু ব্যবসার আসল মোড় ঘুরে যায় ২০১৯ সালে। জেলা শিল্প কেন্দ্রের সহযোগিতায় তাঁর তৈরি সার অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি পোর্টালেও জায়গা করে নেয়। এমনকি GeM পোর্টালে যুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারের বিভাগ থেকেই তিনি বড় বড় স্থায়ী বার্ষিক অর্ডার পেতে শুরু করেন। এছাড়া অসমের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি মোট ২৭.৫০ লক্ষ টাকার বিজনেস গ্র্যান্ড অনুদান লাভ করেছিলেন। আর সেই বিপুল অর্থ দিয়ে তাঁর উৎপাদন ইউনিট আরও বড় করেন। এমনকি তাঁর বার্ষিক আয় এখন ৭০ থেকে ৭৫ লক্ষ টাকা, যা মাত্র ৫০০ টাকা দিয়েই শুরু।