অনন্যা সরকার, কর্নাটক: ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ISRO)-এর আরামদায়ক চাকরি ছেড়ে অর্গানিক কৃষির রাস্তায় হেঁটে আজ কর্ণাটকের দিবাকর চান্নাপ্পা (Success story of Divakar Channappa) বহু কৃষিজীবী মানুষের কাছে প্রেরণা হয়ে উঠেছেন। কর্নাটকের সুগ্গানাহাল্লির বাসিন্দা দিবাকর অর্গানিক পদ্ধতিতে (Organic Farming) খেজুরের চাষ করে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করে এখন একজন সফল অর্গানিক কৃষিজীবী। আসুন জেনে নিই তার সাফল্যের কাহিনী।
ইসরো-র চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কৃষিজীবী হওয়ার সিদ্ধান্ত
দিবাকর চান্নাপ্পা সোশ্যাল ওয়ার্কে স্নাতকোত্তর পাশ করে জয়েন করে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ইসরো। এছাড়া তিনি তুমকুর ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন। কৃষিজীবীর পরিবারের জন্ম হলেও কৃষি কাজ থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছিলেন দিবাকর। কিন্তু তবু তার মূল তাকে আকর্ষণ করত। একদিন তোর হাতে আসে জাপানি কৃষক ও লেখক মাসানোবু ফুকুওকার লেখা ‘ওয়ান স্ট্র রেভোলিউশন’ বইটি। এই বই তাকে অর্গানিক ফার্মিং-এর প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তিনি ঠিক করেন চাকরি ছেড়ে চাষাবাদ শুরু করবেন।
প্রথমে মেনে নেননি বাড়ির লোক। দিবাকর চান্নাপ্পার বাবা কৃষক ছিলেন এবং ফিঙ্গার মিলেট, ভুট্টা ও অরোর ডালের মতো শস্য চাষ করতেন। কিন্তু সেভাবে লাভের মুখ কোনদিনই দেখেননি তিনি। তাই ছেলের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে চাষ করার সিদ্ধান্তকে শুরুতে সমর্থন করতে পারেননি। কিন্তু দিবাকর তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
দিবাকর প্রথমে প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষবাস শুরু করলেও, পরে তিনি খেজুর চাষে আগ্রহী হন। ব্যাঙ্গালুরুর একটি কৃষি মেলায় তামিলনাড়ুর খেজুর চাষ সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি এবং দেখেন কর্নাটকের জলবায়ুও অনেকটা একই রকম। সেখান থেকেই নতুন কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে। ২০০৯ সালে প্রায় ৪.৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ২.৫ একর জমির ওপর ১৫০টি বারহি খেজুর গাছ লাগান তিনি। এই ফার্মটির নাম দেন “মারালি মান্নিগে,” বাংলায় যার অর্থ “মাটিতে ফেরা।”
দিবাকর সব সময় জৈব চাষে বিশ্বাসী তাই কোনও ধরনের রাসায়নিক সার তিনি ব্যবহার করেন না। পঞ্চগব্য এবং জীবামৃতের মতো প্রাকৃতিক সার নিজের হাতেই তৈরি করেন দিবাকর, যা মাটির গুণমান বজায় রাখতে এবং ভালো ফলনে সাহায্য করে।
কয়েক বছর টানা পরিশ্রমের পর ২০১৩ সালের তার গাছগুলিতে প্রথম ফলন ধরে। সবকটি গাছ মিলিয়ে উৎপাদিত খেজুরের ওজন ছিল প্রায় ৬৫০ কিলোগ্রাম, যা প্রতি কেজি ৩৭৫ টাকা দরে বাজারে বিক্রি হয়। প্রথম এই লাভ আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দেয় দিবাকরের। ধীরে ধীরে তার ফার্মটি আরো বড় হতে থাকে। ২০২৩ সালে তার ফার্মে ১০২ টি বারোহি খেজুরের গাছ ছিল, যেগুলি প্রায় ৪০ – ৫০ কেজি করে ফসল দেয়। সে বছর তার মোট উৎপাদিত খেজুরের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.২ টন।
আরও পড়ুনঃ ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে, বর্ষায় ঘুরে আসুন উত্তরবঙ্গের অজানা প্যারাডাইস ‘কাইয়াভির’ থেকে
তবে শুধু অর্গানিক পদ্ধতি নয় দিবাকর চান্নাপ্পার সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো সরাসরি বিক্রয় কৌশল। তিনি মাঝখানে মধ্যস্থতাকারীদেরকে সরিয়ে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে ফার্ম থেকে খেজুর পৌঁছে দেন। এতে লাভের পরিমাণ যেমন বেশি হয়, তার সাথে বিক্রেতা ও গ্রাহকের মধ্যেকার সম্পর্কও দৃঢ় হয়। বর্তমানে তার বার্ষিক লাভ প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। যারা মনে করেন কৃষি কাজে কোন ভবিষ্যৎ নেই, দিবাকর চান্নাপ্পা তাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সঠিক কৌশল, পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে কৃষিকাজ করেও সম্মান লাভ ও উচ্চ আয় সম্ভব।










