অনন্যা সরকার, কলকাতা: নদী কখনও বছরের পর বছর ধরে একই খাতে (Riverbed) বয়ে চলে, আবার কখনও দিক পাল্টে অন্য খাতে বয়। গোটা উত্তরবঙ্গ (North Bengal River) জুড়ে ছড়িয়ে আছে নদীর পরিবর্তনের একরকম অসংখ্য ভৌগোলিক নিদর্শন। কোচবিহারের দিনহাটা হোক, বা মালদহের কালিয়াচক – দেখা মিলবে এরকম একাধিক মৃত নদীর জীবাশ্মের। উপগ্রহ চিত্র, ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা এবং আধুনিক গবেষণা জানাচ্ছে, পাহাড় থেকে ভেসে আসা পলি জমে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নদীখাত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অনেক গবেষকই আশঙ্কা করছেন যে, পলি জমার ফলে নদী হঠাৎ তার গতিপথ বদলে পুরনো খাতে বইতে শুরু করতে পারে এবং ভাসিয়ে দিয়ে পারে শুকিয়ে যাওয়া এলাকা। এভাবে ‘মৃত’ নদী যদি আবার জেগে উঠলে উত্তরবঙ্গের অনেক অঞ্চলের নকশাই পাল্টে যেতে পারে।
জেগে উঠতে পারে ‘মৃত’ নদীখাত?
নদী গবেষকরা জানাচ্ছেন, নদীর শুকিয়ে গেছে বলে উত্তরবঙ্গের বহু নদীখাতে হয়েছে নির্মাণকাজ। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বসতি। এটাই ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। নদীর জলধারা প্রধানত ঢালু খাতের দিকে বয়। বর্তমানে নদী খাতে পলি জমা পড়লে নদীর জল আবার পুরনো খাতের দিকে বইতে শুরু করতে পারে। এর ফলে ভেসে যেতে পারে এলাকার পরে এলাকা। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মরা নদীর খাতে গড়ে ওঠা বাড়ি ঘর।
আরেক গবেষকের কথায়, পাহাড়ি নদীগুলি যে খাত দিয়ে নেমে আসে, তা সাধারণত সমতলভূমি নয়। নদীগুলি হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণে পলি বয়ে আনে ও একটি সক্রিয় ফোরল্যান্ড বেসিনের ওপর বয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে নদীতে পলির পরিমাণ, নদীর প্রবাহ, বাঁক পরিবর্তন, টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া ও মানুষের হস্তক্ষেপে প্রভাবে সারাক্ষণই নদীর গতিপথে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর ফলে মৃত নদীখাতগুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: সেপ্টেম্বরের শুরুতে শুক্রের গোচরে পাঁচ রাশির কপালে দুর্ভোগ, অর্থহানী ও সম্পর্ক নষ্টের যোগ
এর আগে জলঢাকা নদীতে এরকম মৃত খাত জেগে ওঠার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেছে। এ বছর জানুয়ারি মাসে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষক মন্টু দাস ও সহযোগী অধ্যাপক স্নেহাশিস সাহা পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯৩৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৯০ বছরের দীর্ঘসময়ে জলঢাকা নদীর ভূ-প্রকৃতি ও গতিপথের বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহ চিত্র, পুরোনো মানচিত্র, ভূমির উচ্চতা সংক্রান্ত তথ্যগুলি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিচু জলাভূমি ও নদীর তলদেশের পলিস্তরের বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিত্যক্ত নদীখাত, বিচ্ছিন্ন নদীবাঁক এবং অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের মতো বিভিন্ন ভূ-গাঠনিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা গেছে। সহজ কথায়, জলঢাকা নদীর বর্তমান গতিপথের আশেপাশের এলাকায় এমন অনেক নিদর্শন রয়েছে, যা নদীটির আগের গতিপথের সাক্ষ্য বহন করে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, নদীটির গতিপথ কখনও এঁকেবেঁকে গেছে, আবার কখনও বাঁকগুলো কেটে সোজা গতিতে চলেছে। পুরনো শাখাগুলো পরিত্যক্ত হয়েছে, আবার নদীটি মাঝেমধ্যে বর্তমান গতিপথ ছেড়ে পুরনো কোনো পথে ফিরে গেছে। অর্থাৎ, নদীটি যখনই তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে, তখন পুরনো খাতটি পুরোপুরি ‘মৃত’ হয়ে পড়েনি। জলঢাকা নদীর সেই অস্থিরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: শিয়ালদহ-রানাঘাট এসি লোকালের তিন অস্থায়ী স্টপেজের মেয়াদ বাড়াল রেল
এদিকে, তিস্তা নদীর মূল খাত পরিবর্তনের কথা তো সর্বজনবিদিত। গবেষকরা মনে করছেন, উত্তরবঙ্গের মহানন্দা, কালজানি ও বালাসন সহ বহু নদীর পরিত্যক্ত গতিপথ বা খাত নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রশাসনের কাছে এই ঝুঁকিপূর্ণ নদীগুলোর পুরোনো গতিপথের মানচিত্র থাকা জরুরি, পাশাপাশি আগামীদিনে জলপ্রবাহের অভিমুখ কোন দিকে হতে পারে সে সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার। এছাড়া, মৃত নদীখাতগুলোর মধ্যে কোনগুলিতে ইতিমধ্যে জনবসতি গড়ে উঠেছে, সেগুলি চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক আশ্বাস দিয়েছেন যে, এবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।










