অনন্যা সরকার, মণিপুর: প্রাকৃতিক বৈচিত্রে ভরা দেশ ভারতবর্ষ। এদেশে এমন অনেক প্রাকৃতিক বিস্ময় রয়েছে, যা দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। এরকমই একটি অনন্য স্থান হল মণিপুরের (Manipur) লোকটাক হ্রদ (Loktak Lake)। এটি দেশের সবচেয়ে রহস্যময় ও অপ্রতিম হ্রদগুলির মধ্যে অন্যতম। লোক থাকলে শুধুমাত্র তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, তার সাথে এর ভাসমান দ্বীপপুঞ্জ (Floating Islands) ও পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যানের (Floating National Park) জন্য জগৎ জুড়ে বিখ্যাত। লোকটাক লেকের ভাসমান দ্বীপগুলি জলস্তর ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে জায়গা পরিবর্তন করে, যা এই আশ্চর্য সুন্দর হ্রদকে অনন্য করে তোলে। কীভাবে ভাসে এই হ্রদের ওপর অগুনতি দ্বীপ? কোন প্রাকৃতিক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এই অদ্বিতীয় হ্রদে – আসুন জেনে নেওয়া যাক।
কেন দ্বীপপুঞ্জ ভাসে লোকটাকের জলে?
লোকটাক হ্রদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর ফুমদিগুলো (Phumdi)। কী এই ফুমদি? এগুলো আসলে কাদা, ঘাস, জলজ উদ্ভিদ এবং জৈব পদার্থ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক ভাসমান দ্বীপ। আশ্চর্যজনকভাবে এগুলো হ্রদের জলের ওপর ভাসে এবং আবহাওয়া ও জলের স্রোত অনুযায়ী ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। কিছু ফুমডি এতটাই বড় এবং মজবুত যে, স্থানীয় মানুষ সেগুলোর ওপর কুঁড়েঘর পর্যন্ত তৈরি করে সেখান থেকে মাছ ধরে।
লোকটাক হ্রদে অবস্থিত কেইবুল লামজাও জাতীয় উদ্যানকে (Keibul Lamjao National Park) বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান বলে গণ্য করা হয়। প্রায় ৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সুবিশাল উদ্যান সম্পূর্ণরূপে ফুমডিগুলোর ওপর অবস্থান করছে, যে কারণে এটিকে “ফ্লোটিং ন্যাশনাল পার্ক” বলা হয়। এই উদ্যানটি তার অনন্য প্রাকৃতিক রূপ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য সারা বিশ্বে বিখ্যাত।
এই জাতীয় উদ্যানটি মণিপুরের রাজ্য পশু সাঙ্গাই হরিণের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বাসস্থান। এই বিরল উপপ্রজাতির হরিণটিকে একসময় বিলুপ্ত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে এই পার্কেই হরিণটির সন্ধান মেলে। ফুমডির নরম মাঠির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এদের চলন অনেকটা নাচের মতো দেখতে লাগে বলে এদের “নাচন্ত হরিণ”-ও (Dancing Dear) বলা হয়। এই হরিণের সংরক্ষণের জন্য এই ন্যাশনাল পার্কটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ আর্ন্তজাতিক ‘মিশন শক্তিস্যাট’-এ ডাক পেল পূর্ব মেদিনীপুরের মেয়ে, তৈরি করবে স্যাটেলাইট
লোকটাক হ্রদ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্রই নয়, হাজার হাজার স্থানীয় পরিবারের জীবিকা নির্ধারণের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে বহু মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। হ্রদের জল সেচ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পানীয় জল হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। এই কারণে এই হ্রদকে মণিপুরের ‘লাইফলাইন’-ও বলা হয়। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনন্য ভাসমান দ্বীপ, সবুজের সম্ভার, নৌকাবিহার এবং বিরল বন্যপ্রাণীর কারণে লোকটাক হ্রদে প্রতি বছর ভিড় জমান হাজার হাজার পর্যটক। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় এই হ্রদের দৃশ্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে নয়নাভিরাম। প্রকৃতিপ্রেমী থেকে ফটোগ্রাফার ও বন্যপ্রাণ উৎসাহীদের জন্য এই লেক স্বর্গের মতো।










