অনন্যা সরকার, নয়া দিল্লি: ১৪তম পাসপোর্ট (Passport) সেবা দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রক (Ministry of External Affairs) জানিয়েছে যে, বিশেষ নিবিড় সংযোজন বা এসআইআর (SIR)-এর শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছিল যে আধার কার্ড (Aadhaar Card) শুধুমাত্র জাতীয়তা এবং পরিচয় প্রমাণ করে, কিন্তু নাগরিকত্ব (Citizenship) নয়। একইভাবে পাসপোর্ট শুধুমাত্র ভ্রমণ প্রমাণ করতে পারে, কিন্তু নাগরিকত্ব নয়। জাতীয়তা এবং নাগরিকত্ব দুটি ভিন্ন জিনিস। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, জাতীয়তা বলতে কোনো দেশের সাথে ব্যক্তির সংযোগকে বোঝায় এবং একটি পাসপোর্ট দিয়ে তা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু নাগরিকত্ব বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তি একটি দেশের নাগরিক আর সেই দেশের নাগরিক হিসেবে সেই ব্যক্তির কিছু আইনগত অধিকার থাকে এবং দেশের প্রতি তার কিছু দায়িত্বও থাকে। তিনি দেশের সরকারি কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।
কোন নথি নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র?
যারা রেজিস্ট্রেশন বা ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, তাঁদের নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়া হয়। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া ভারতীয়দের এই শংসাপত্র থাকে না। কোনো বিরোধ না ঘটলে, ভারতে বসবাসকারী ব্যক্তিরা ভারতীয় হিসেবেই গণ্য হল। ভারতে কোনো নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়া হয় না। তবে সংবিধানে এই বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে।
জানিয়ে রাখি, ভারতীয় সংবিধানের অধীনে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে, জন্ম, বংশ, রেজিস্ট্রেশন, ন্যাচারালাইজেশন এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত নতুন কোনো অঞ্চলের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করা যায়। ভারতে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই একজন ভারতীয় নাগরিক। ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু বিদেশে বসবাস করেন এমন ব্যক্তিও ইচ্ছা করলে ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন। জন্মের নথি ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ বহন করে।
তাই, ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিরা জন্ম শংসাপত্রের (Birth Certificate) মাধ্যমে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেন। এই সার্টিফিকেট গ্রাম পঞ্চায়েত, পৌরসভা বা পৌর কর্পোরেশন থেকে দেওয়া হয়। ভারতীয়দের সরকারের তরফে কোনো নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না, কিন্তু যেসমস্ত বিদেশী ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, তাদের কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেয়।
জানিয়ে রাখি, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৩ নং ধারা অনুযায়ী জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১লা জুলাইয়ের মধ্যে ভারতে জন্মগ্রহণকারীরা ভারতের নাগরিক। তবে, বার্থ সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব, অবৈধ অভিবাসন, জন্ম তারিখ ও সময় এবং অভিভাবকত্বের অবস্থা যাচাই করা হতে পারে। ৪ নং ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি বিদেশে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু তার পিতামাতার মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিক হন, তাহলেও তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের পরে বিদেশে জন্মানো শিশুদের অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারতীয় দূতাবাসে রেজিস্ট্রশন করতে হবে। বিদেশিরাও নাগরিকত্ব আইনের ৫ নং ধারার অধীনে নির্ধারিত শর্তগুলি পালন করে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এবং ৬ নং ধারার অধীনে ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে এদেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন।
এই কারণেই পাসপোর্ট বাতিল হওয়ার অর্থ ভারতীয় নাগরিকত্ব হারানো নয়। মিথ্যা তথ্য দেওয়া, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, আইনি পদক্ষেপ বা শাস্তি কিংবা পাসপোর্ট আইনের শর্তাবলী লঙ্ঘনের জন্য পাসপোর্ট বাতিল করা হতে পারে, কিন্তু এর ফলে নাগরিকত্ব চলে যায় না। বরং, ভারতের নাগরিকত্ব বাতিল হওয়ার নিয়মাগুলি আলাদা, যা ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে উল্লেখ করা আছে।
এদিকে, ভোটার আইডি কার্ড শুধুমাত্র এটাই প্রমাণ করে যে ওই ব্যক্তির নাম ভারতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে। আর আধার কার্ড শুধুমাত্র ভারতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের নথিভুক্ত করে। তারজন্য তাদের যে ভারতীয় নাগরিক হতেই হবে, তা আবশ্যক নয়। প্যান কার্ড করদাতাকে চেনায়, আর রেশন কার্ড একটি সরকারি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ মাত্র। বার্থ সার্টিফিকেট ভারতে জন্মের প্রমাণ, কিন্তু এটি সব ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স শুধুমাত্র একজন চালক হওয়ার প্রমাণ। ব্যাংক পাসবুক প্রমাণ করে আপনি একজন ব্যাংক গ্রাহক। আর বিদ্যুৎ বিল, জলের বিল বা গ্যাসের বিল নির্দিষ্ট পরিষেবাগুলির গ্রাহক হওয়ার প্রমাণ।










