আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: মাত্র তিন বছর বয়সেই মাকে হারিয়েছিল ছোট্ট প্রিয়স্মিতা প্রামাণিক। মায়ের চলে যাওয়ার অর্থ তখন হয়তো বোঝার বয়সই হয়নি তার। স্বামীর সংসার ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয়স্মিতার মা। সেই ঘটনা মেনে নিতে পারেননি শিশুটির বাবা। স্ত্রী চলে যাওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথাতেই নিজেকে শেষ করে দেন পরিতোষ প্রামাণিক। রাতারাতি অনাথ হয়ে যায় তিন বছরের ছোট্ট শিশুটি। আজ সে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। মেয়েটির জীবনে বর্তমানে শুধুই অভাব। বাবাকে হারানোর পর ৬০ বছরের বৃদ্ধা ঠাকুমাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। ছোট্ট নাতনিকে বুকে আগলে কোনওরকমে সংসার চালান তিনি (Sad Story)।
পেটে খিদে নিয়েই ঘুমোতে যায় প্রিয়স্মিতা
একদিন ঘরে চাল থাকে না তো অন্যদিন ডাল থাকে না। মাছ, মাংস, ফল এসব যেন তাদের কাছে বিলাসিতা। এমনও দিন আসে, যখন খিদের জ্বালা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হয় ছোট্ট প্রিয়স্মিতাকে। কখনও পাড়ার কেউ দয়া করে খাবার দিলে তবেই জোটে দু’মুঠো অন্ন। আর বেশিরভাগ দিন আলুসেদ্ধ-ভাতেই কোনওরকমে পেট ভরে তাদের।
অভাবের এই গল্প শুধু খাবারের অভাবেই থেমে নেই। যে বাড়িটিতে প্রিয়স্মিতা আর তার ঠাকুমা থাকেন, সেটিও তাদের জীবনের লড়াইটাকে চোখের সামনে তুলে ধরে। জানা যায়, স্ত্রীর জোরাজুরিতেই নিজের জমির দলিল বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করতে শুরু করেছিলেন পরিতোষবাবু। কিন্তু বাড়িটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যু হয় তাঁর। ফলে আজও সেই বাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে কেবল চারটি দেওয়াল নিয়ে। নেই দরজা, নেই জানলা। বৃষ্টি নামলেই গোটা ঘর জলে ভেসে যায়। তার উপর বিদ্যুতের বিল দিতে না পারায় প্রায় এক বছর ধরে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। ঘরে জ্বলে না আলো, চলে না পাখা। সেই অন্ধকারেই রাতে লম্প জ্বেলে পড়াশোনা করে চতুর্থ শ্রেণির প্রিয়স্মিতা। বাবার নেওয়া ঋণের বোঝাও রয়ে গিয়েছে পরিবারের মাথায়। যে বাড়িটা একদিন স্বপ্নের ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল, সেটাই আজ যেন অভাব আর অসহায়তার নীরব সাক্ষী।
তবুও এত কিছুর মধ্যেও ঠাকুমা আর নাতনির একে অপরকে আঁকড়ে বেঁচে রয়েছে। বৃদ্ধা ঠাকুমা নিজের কষ্ট ভুলে ছোট্ট মেয়েটাকে আগলে রেখেছেন। আর প্রিয়স্মিতার কাছেও পৃথিবীতে সবচেয়ে আপন মানুষটি সেই ঠাকুমাই। সমাজকর্মী অতীন্দ্রের করা একটি ভিডিওর সূত্রে সামনে এসেছে এই ঠাকুমা-নাতনির জীবনসংগ্রামের ছবি। ছোট্ট প্রিয়স্মিতার কথাতেই ধরা পড়ে তাদের সম্পর্কের গভীরতা। এতটুকু বয়সে জীবনের এত কঠিন বাস্তবতা দেখেও তার একটাই কথা, ঠাকুমাকে সে ছেড়ে যাবে না।
আরও পড়ুন: স্কুলছুট পড়ুয়াদের ফেরানোর উদ্যোগ, জাতীয় পুরস্কার পেলেন রামপুরহাটের অরিন্দম
“আমার ঠাকুমা যেখানে থাকবে, আমিও সেখানে থাকব। ঠাকুমা কষ্ট করে রয়েছে, আমিও কষ্ট করব। কিন্তু ঠাকুমাকে ছেড়ে যাব না।” সেও শিখে গিয়েছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে। চার দেওয়ালের অসম্পূর্ণ বাড়ি, বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাত, কখনও না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া আর আলুসেদ্ধ-ভাতের ছোট্ট সংসার। সবকিছুর মধ্যেও প্রিয়স্মিতার পৃথিবীতে তার ঠাকুমাই সবচেয়ে বড় ভরসা।









