১৫,০০০ টাকা দিয়ে শুরু ব্যবসা, উঠোনেই তৈরি হত পণ্য! আজ কয়েক হাজার কোটির কোম্পানি

Published:

Success Story

অনন্যা সরকার, কলকাতা: নিরমা ওয়াশিং পাউডারের সাফল্যের গল্প (Success Story of Nirma) শুধু একটি পণ্যের গল্প নয়, এ এক শোকগ্রস্ত বাবার অসাধারণ উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কাহিনী। গুজরাটের আহমেদাবাদে কেরসনভাই প্যাটেল মাত্র ১৫,০০০ হাজার টাকা দিয়ে নিজের বাড়ির উঠোনে ডিটারজেন্ট পাউডার বানিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার ব্র্যান্ড দেশের প্রতিটি মধ্যবিত্ত ঘরে জায়গা করে নেয়। ৭০-এর দশকে তৈরি এই সস্তা ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ডের বিখ্যাত জিঙ্গল এখনও সবার মুখে মুখে ফেরে। আসুন জেনে নিই নিরমা ব্র্যান্ড গড়ে ওঠার কাহিনীটি। 

বাড়ির উঠোনেই তৈরি হল বিখ্যাত ব্র্যান্ড

১৯৬৯ সালে গুজরাটের আহমেদাবাদে কেরসনভাই প্যাটেল নিজের বাড়ির উঠোন থেকে নিরমার সূচনা করেন। গুজরাটের এক কৃষক পরিবারে জন্ম কেরসনভাই প্যাটেলের। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। রসায়নে স্নাতক পাস করে সামান্য মাইনের ল্যাব টেকনিশিয়ানের চাকরি করতে শুরু করেন। পরে গুজরাট সরকারের জিওলজি অ্যান্ড মাইনিং বিভাগে চাকরি পান। চাকরির পাশাপাশি মাত্র ১৫,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে ডিটারজেন্ট বানানো শুরু করেন। এই ব্র্যান্ড শুরুর পেছনে ছিল তাঁর মেয়ে নিরুপমার স্মৃতি, অল্প বয়েসে দুর্ঘটনায় হারান মেয়েকে। তাই তার নামের সাথে মিলিয়ে ব্র্যান্ডের নাম রাখেন “নিরমা”। ব্যবসাটি ছোট পরিসরের শুরু করলেও, কম দাম, ভালো পরিষ্কার করার ক্ষমতা আর “মানি ব্যাক গ্যারান্টি”-র মতো বাজার কৌশল দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সাধারণ মানুষের বাড়িতে জায়গা করে নেয় নিরমা। 

নিরমার সাফল্যের মূল রহস্য ছিল তার সহজ কিন্তু শক্তিশালী মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। তখন বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির ডিটারজেন্ট পাউডার চড়া দামে বিক্রি হত, সেখানে নিরমা তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তায় পাওয়া যেত। সেসময় প্রায় ৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে নিরমার বিকল্প ছিল না। এর সঙ্গেই জুড়ে যায় স্মরণীয় “হেমা, রেখা, জয়া, সুষমা- সবার পছন্দ নিরমা” জিঙ্গল, যা ১৯৮০ থেকে ৯০-এর দশকে দেশের ঘরে ঘরে রেডিও ও টেলিভিশনে বাজতো। এই  বিজ্ঞাপনী গান সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ব্র্যান্ডটিকে সফলতা এনে দেয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিরমা একসময় ভারতের ডিটারজেন্ট বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশের মতো দখল করে নিয়েছিল। 

নামের মাহাত্ম্যও এই ব্র্যান্ডকে অনন্য করে তুলেছে। “নিরমা” নামটি শুধু একটি ব্যবসায়িক পরিচিতি নয়, এরসাথে এক বাবার আবেগ, শোক আর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কেরসনভাই প্যাটেল তাঁর মেয়ের নামকে ব্র্যান্ডে রূপ দিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। এই আবেগই ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা জনমানসে আরও বাড়ায়। তাই “নিরমা” নামটি আজও মানুষের কাছে শুধু কাপড় কাচার সাবানের নাম নয়, ভারতের সফল উদ্যোগ প্রতিভা ও আন্তরিক ব্র্যান্ডিংয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ডিটারজেন্ট পাউডারের প্যাকেটের সেই সাদা জামা পড়া “আইকনিক নিরমা গার্ল”-ও, কেরসনভাই প্যাটেলের কন্যার থেকেই অনুপ্রাণিত। 

আরও পড়ুনঃ মরুভূমির মহার্ঘ আজওয়া খেজুর চাষ বাংলার বুকে, দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তমলুকে সুব্রত

বর্তমানে ডিটারজেন্টের বাজারে নিরমার আর আগের মতো রমরমা নেই, কিন্তু ব্র্যান্ডটি এখনও সক্রিয় রয়েছে। সার্ফ এক্সেল, টাইড, সানলাইট, এরিয়ালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা আধুনিক প্যাকেজিং, উন্নত ফর্মুলা ও অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিংয়ের জোরে নিরমার থেকে বাজারের দখল কেড়ে নিয়েছে। তবু এখনও ভারতীয়দের স্মৃতির সাথে জুড়ে রয়েছে এই ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ড।