ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি! স্কলারশিপ পেয়ে অসাধ্য সাধন শ্রমিকের মেয়ের

Published:

Success Story of Seema Kumari

অনন্যা সরকার, ঝাড়খণ্ড: অদম্য সাহস ও ইচ্ছাশক্তির জোরে একমন কিছু অর্জন করা যায়, যার কল্পনা হয়তো স্বপ্নেও কেউ করতে পারেননি। ঝাড়খণ্ডের ওরমাঞ্জি এলাকার দাহু নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা সীমা কুমারীর সাফল্যের যাত্রাটি (Success Story of Seema Kumari) এরই এক উজ্বল প্রমাণ। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Harvard University) থেকে পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ (Full Scholarship) লাভ করেছেন সীমা। কীভাবে প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে পৌঁছে গেলেন হার্ভার্ড, আসুন তাঁর এই সাফল্যের কাহিনীটি বিশদে জেনে নেওয়া যাক। 

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য জেদ 

ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা সীমার বেড়ে ওঠা দারিদ্র্যের সাথে হাত ধরাধরি করে। তাঁর সুবিধাবঞ্চিত বাবা-মা কোনও ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। সংসারের ভরণপোষণের জন্য তাঁর বাবা স্থানীয় একটি সুতার কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সীমা পরিবারের ১৯ জন সদস্যের সঙ্গে একটি অতি সাধারণ বাড়িতে থাকতেন। তবে তিনি কখনোই এগুলিকে নিজের অগ্রগতির পথে বাধা হিসেবে মনে করেননি। তাঁর বাবা স্থানীয় একটি সুতো কারখানার শ্রমিক বাবার পক্ষে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য ছিল না। ফুটবল ছিল সীমার প্রথম ভালবাসা। ২০১২ সালে ‘ইউওয়া’ (YUWA) নামক এনজিও-র ফুটবল দলের সদস্য হন তিনি। উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরবর্তীতে ফুটবল কোচ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সীমা। 

সমস্ত সামাজিক বাধা ও প্রথা ভেঙে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সীমা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন। হাফপ্যান্ট বা শর্টস পরে ফুলবল খেলার জন্য গ্রামে নানা উপহাসের শিকার হওয়া সত্ত্বেও, সীমা বহু বছর ধরে ফুটবল খেলা চালিয়ে যান এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নিজের লড়াই অব্যাহত রাখেন।

আরও পড়ুন: IIT থেকে UPSC, কোচিং ছাড়াই প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফল হয়ে আজ IAS শ্রেয়া

 সীমা মিডলবারি কলেজ, ট্রিনিটি কলেজ-হার্টফোর্ড এবং ভারতের অশোক ইউনিভার্সিটির মতো আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। পড়াশোনার খরচ জোগাতে ফুটবল কোচ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি, ২০১৮ সালে তিনি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট লুইসের হাই স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসূচি, ‘ইয়াং লিডারস ইনস্টিটিউট’-এ অংশগ্রহণ করারও সুযোগ পেয়েছিলেন। 

২০২১ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হার অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও সীমা সেখানে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। সাথে পেয়েছেন তাঁর সমগ্র ডিগ্রি কোর্সের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ। তিনি তাঁর পরিবারের প্রথম নারী, তো যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। ভারতের গ্রামীণ এলাকা থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ পাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন মেয়ের মধ্যে সীমা অন্যতম। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ভারতের গ্রামীণ এলাকায় যেখানে ৪৫ শতাংশ ছেলে হাই স্কুলে পড়াশোনা করতে পারেন, সেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৯ শতাংশ।

আরও পড়ুন: IIT থেকে UPSC, কোচিং ছাড়াই প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফল হয়ে আজ IAS শ্রেয়া

বর্তমানে অর্থনীতির ছাত্রী সীমার ঘরবাড়ি হয়ে উঠেছে আইভি লিগ ক্যাম্পাস। তিনি সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন এবং হার্ভার্ড ধর্ম সহ একাধিক শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরই মতো অনেক ফার্স্ট-জেনারেশন স্টুডেন্ট এখন তাঁর বন্ধু। সীমা জানান, তিনি তাঁর গ্রাম তথা সারা বিশ্বে লিঙ্গ সমতা দেখতে চান। গ্রামে ফিরে মহিলাদের জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিং দেওয়ারও ইচ্ছা রয়েছে সীমার।