আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: উৎসবের আনন্দের মাঝেই চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল ১৯টি প্রাণ। আহত হয়েছিলেন অন্তত ২৫ জন। সেই ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি এখনও টাটকা। আগামী দিনে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো এবং ছটপুজোকে কেন্দ্র করে ফের বহু মানুষের সমাগম তৈরি হবে। তাই চোরবাগানের (Chorbagan) ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে আগেভাগেই সতর্ক রাজ্য সরকার (Government of West Bengal)। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় কোনওরকম খামতি রাখতে চাইছে না প্রশাসন। সেই লক্ষ্যেই নবান্নে (Nabanna) একাধিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
চোরবাগান কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রুখতে কড়া পদক্ষেপ
প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা, সরু প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তা এবং অপর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীর মতো একাধিক বিষয় দুর্ঘটনার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সপ্তমীর সন্ধ্যায় বৃষ্টির জেরে দর্শনার্থীদের একাংশ মণ্ডপের ভিতরে আশ্রয় নিতে গেলে ভিড়ের চাপ আরও বেড়ে যায়। তার উপর মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে বলে মাইকে ঘোষণা ঘিরে আতঙ্ক ছড়ায়। ফলে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঘটনার পরেই মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের সমস্ত জেলার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। থিমের পুজো এবং যেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হয়, সেই মণ্ডপগুলিতে পুলিশকে সরেজমিনে পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নিরাপত্তার ঘাটতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
উৎসবের ভিড় সামলাতে কী কী নির্দেশিকা?
পূর্ববর্তী ঘটনার কথা মাথায় রেখে আসন্ন উৎসবগুলিতে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের যাতায়াত এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক বিষয়ে জোর দিয়েছে প্রশাসন। পুজো কমিটিগুলিকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। যেমন–
- পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা: প্রতিটি পুজো মণ্ডপে যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- প্রশস্ত প্রবেশ ও প্রস্থান পথ: মণ্ডপে ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তা চওড়া রাখতে হবে, যাতে দর্শনার্থীদের চলাচলে বাধা না তৈরি হয়।
- ভিড় নিয়ন্ত্রণ: কোনওভাবেই মণ্ডপের ভিতরে অতিরিক্ত ভিড় জমতে দেওয়া যাবে না।
- স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ: দর্শনার্থীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক রাখতে হবে।
- পুলিশ মোতায়েন: কোন মণ্ডপে কতটা ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা বিবেচনা করে পুলিশ মোতায়েন করতে হবে।
- প্রাথমিক চিকিৎসা: মণ্ডপে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- পরিচ্ছন্নতা: পুজো মণ্ডপ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু ভিড় নিয়ন্ত্রণ নয়, যে কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলাতেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন। মণ্ডপে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা যথাযথ রাখতে হবে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে যাতে দমকল পৌঁছতে পারে, সেই বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ছটপুজোকে কেন্দ্র করে ঘাটগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঘাটে পর্যাপ্ত আলোর পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। নৌকাগুলিতে রাখতে হবে লাইফ জ্যাকেট। মহিলাদের পোশাক পরিবর্তনের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থাও করতে হবে। সব মিলিয়ে মণ্ডপ থেকে ঘাট, প্রতিটি জায়গাতেই নিরাপত্তার দিকটি খতিয়ে দেখতে চাইছে প্রশাসন।
আরও পড়ুন: দিল্লির সমাবেশ ঘিরে ব্যবসায় ধস! বন্ধ আড়াই লক্ষ দোকান, লোকসান ১২ হাজার কোটি
উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষ যাতে নিশ্চিন্তে পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সেটাই রাজ্য সরকারের লক্ষ্য। আনন্দের পরিবেশ যেন কোনওভাবেই দুর্ঘটনা বা আতঙ্কের কারণে বিষাদে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে চাইছে প্রশাসন। চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে তাই আগাম প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই উদ্দেশ্যেই আসন্ন কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো ও ছটপুজোকে কেন্দ্র করে এই একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করেছে নবান্ন।










