তিন মাস শোধ করতে পারছেন না ঋণের কিস্তি! অন্নপূর্ণা টাকা না পেয়ে বিপাকে মহিলারা

Published:

Annapurna Yojana

অনন্যা সরকার, পূর্ব বর্ধমান: বিগত সরকার রাজ্যে মহিলাদের স্বনির্ভরতা ও ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে চালু করেছিল ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ (Lakshmir Bhandar) প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ২ কোটি ৬২ লক্ষ মহিলা সর্বশেষ ১,৫০০ টাকা ও ১,৭০০ টাকা (ST/SC) করে প্রতি মাসে পেতেন। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপি সরকার ঘোষণা করে ১,৫০০ নয়, প্রতি মাসে তারা ৩,০০০ টাকা করে মহিলাদের আর্থিক সাহায্য করবে। কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রাপকদের তালিকায় বিস্তর গরমিল থাকার কারণে নতুন করে শুরু হয় আবেদন প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়াতেই বাদ পড়েছে অনেকের নাম। এদিকে, অনেক মহিলা সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে ঋণ (Loan) নিয়েছিলেন, কেউ সে টাকা সন্তানের পড়াশোনায় ব্যয় করতেন, আবার কেউ সংসার ও ব্যবসার কাজেও লাগিয়েছিলেন। অন্নপূর্ণা যোজনায় (Annapurna Yojana) এখনও তাঁদের নাম না ওঠার কারণে গত মে মাস থেকে ভাতা না পেয়ে অনেক মহিলা ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যেসব সংস্থা থেকে লোন নিয়েছিলেন, তারা এখন বাড়ি বাড়ি এসে হানা দিচ্ছে। চরম বিপাকে পড়েছে কিছু পরিবার। 

অন্নপূর্ণা ভান্ডার না পেয়ে সমস্যায় পড়েছেন অনেকে

চলতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষের মতো মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পেয়েছেন বলে জানিয়েছে সরকার। আর ২৬ লক্ষ মহিলার নাম বাদ পড়েছে বলেও জানানো হয়। পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের নাসিগ্রাম-উত্তরপাড়ার বাসিন্দা মায়ারানী নাগ জানান, তিনি আবাস যোজনায় বাড়ি পেয়েছিলেন। তবে ভালোভাবে বাড়ি তৈরির জন্য প্রকল্পের অনুদানের পরেও কিছু টাকার দরকার হয়। তাই ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। মায়ারানীর দাবি, তার স্বামী দিনমজুরি করে রোজগার করেন। তার উপার্জনের সাথে লক্ষ্মীর ভান্ডারের ১,৫০০ টাকা যোগ করে কিস্তি শোধ করতেন। কিন্তু মে মাসে বিধানসভা ভোটের ফলাফল বেরোনোর পর লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়ে যায়, ফলে সে মাসে কোনো টাকা ঢোকেনি। এখনও অন্নপূর্ণা যোজনায় নাম ওঠেনি তার। তাই জুন ও জুলাই মাসেও কিছু পাননি। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মায়ারানী বলেন, তার স্বামী বর্তমানে অসুস্থ, ঋণের কিস্তি তিন মাস দিতে পারেননি। যে সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তাদের প্রতিনিধিরা বারবার বাড়ি এসে তাগাদা করছেন, ভালোমন্দ কথা শোনাতেও ছাড়ছেন না। ফলে খুবই সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।

ওই গ্রামেরই আরেক বাসিন্দা শম্পা কুণ্ডু জানান তার স্বামী ফেরিওয়ালা। তাঁর ব্যবসায় কিছু সাহায্য করার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। এদিকে, মে মাসে লক্ষ্মীর ভান্ডার পাননি, জুন মাসে টাকা ঢুকলেও, জুলাইয়ে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাননি। তাই কিস্তি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ভাতারের বলগোনার সেলোন্ডা গ্রামের আরেক মহিলা জানান, একমাত্র ছেলের উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনার জন্য ঋণ নিয়েছেন। স্বামী মারা গিয়েছেন। ঋণ শোধের জন্য নির্ভর করতেন লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকার ওপর। মে থেকে ভাতা আসা বন্ধ হয়েছে। কী ভাবে শোধ করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। একই সমস্যায় পড়েছেন ওই অঞ্চলের একাধিক মহিলা।

এদিকে এক ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার কর্মকর্তা বলছেন, প্রথমে কম অংকের টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। সে টাকা শোধ করতে পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু কোন ঋণগ্রহীতা কিভাবে কিস্তির টাকা জোগাড় করছেন, সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। টাকা না মেটালে প্রতিনিধিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাগাদা দেবার বিষয়টি স্বীকার করলেও, গ্রাহকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ মানতে চাননি তিনি।

তবে শুধু ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা নয়, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমেও অনেক মহিলা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রেও উঠেছে একই অভিযোগ। ভাতারের কিছু স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে নিয়ে তৈরি করা সংঘ সমবায়ের কো-অর্ডিনেটর সুস্মিতা রায় জানিয়েছেন, ঋণ নিয়ে দু-তিন মাস ধরে কিস্তির টাকা শোধ না করায় অনেকের বাড়িতেই ব্যাংকের চিঠি পৌঁছেছে। 

ওই এলাকার এক বিজেপি নেত্রী বলেন, তিনিও জুন মাসে অন্নপূর্ণা যোজনা টাকা পাননি কিন্তু জুলাইয়ে পেয়েছেন। তবে ভাতার টাকায় ঋণের কিস্তি শোধ করার পরিকল্পনাটি সঠিক নয় বলেই মনে করছেন তিনি। যদিও এবিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন ভাতারের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফার। তিনি জানান, এই সমস্যার কথা তিনি শীর্ষ নেতৃত্বকে জানাবেন। এদিকে, আউশগ্রামের বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী কলিতা মাঝি কোথায়, কে কোথা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, তাতে সরকারের কিছু করার নেই। তবে যারা যোগ্য তারা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ঠিকই পাবেন। মাত্র দু’মাস সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাই উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করে নেওয়ার জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন।