প্রীতি পোদ্দার, কলকাতা: রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলে ব্যাগের ভার নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই আলোচনা হয়েই চলেছে। বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কোনো কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। যার ফলে ব্যাগের ভারে কার্যত ঝুঁকে পড়ছেন পড়ুয়ারা। তাই এবার প্রশাসনিক ক্ষমতার রদবদল হতেই ব্যাগের ওজনে নিয়ন্ত্রণ (School Bag Weight Policy) আনল রাজ্য সরকার। স্কুলের ব্যাগের বোঝা কমাতে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর ‘স্কুল ব্যাগ নীতি’ (NEP 2020 School Bag Policy) অনুসরণ করার নির্দেশ দিল স্কুলশিক্ষা দফতর।
ব্যাগের ওজন নিয়ে কড়াকড়ি প্রশাসন
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত ভারী ব্যাগ বইলে শিশুদের পেশিতে টান ধরে, মেরুদণ্ডে সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি হাঁটাচলার ক্ষেত্রেও একাধিক ব্যাঘাত ঘটে। আর তাই সেই শারীরিক কষ্ট দূর করতেই নয়া নির্দেশিকায় ব্যাগের ওজনের একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করে দিল রাজ্য সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে স্কুল শিক্ষা দফতর জানিয়েছে, কোনোভাবেই ছাত্রছাত্রীদের ব্যাগের ওজন তাদের নিজেদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। রাজ্যের সমস্ত জেলা শিক্ষা আধিকারিক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শকদের এই নিয়ম কড়াকড়িভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্কুল ব্যাগ ওজনের নির্দেশিকা
নির্দেশিকায় স্কুল ব্যাগের ওজন নিয়ে স্কুল শিক্ষা দফতর ঘোষণা করেছে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য কোনও স্কুল ব্যাগ থাকবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যাগের ওজন হবে ১.৬ থেকে ২.২ কেজির মধ্যে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে তা ১.৭ থেকে ২.৫ কেজি। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণির ক্ষেত্রে ব্যাগের ওজন হবে ২-৩ কেজি। অষ্টম শ্রেণির জন্য ২.৫ থেকে ৪ কেজি এবং নবম-দশম শ্রেণির ব্যাগের ওজন ২.৫ থেকে ৪.৫ কেজির মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ব্যাগের ওজন কোনোভাবেই ৫ কেজির বেশি হতে পারবে না বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে। এর জন্য নিয়মিত স্কুলের ব্যাগ ওজন করা হবে তাই প্রত্যেকটি স্কুলে ওজন মেশিন থাকা বাধ্যতামূলক।
খাতা এবং হোম ওয়ার্ক নিয়ে সতর্ক
স্কুলে ছাত্র ছাত্রীদের পাঠ্যবই এবং খাতার ব্যবহারেও বড়সড় বদল আনা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য কেবল একটিমাত্র ক্লাসওয়ার্ক খাতা থাকবে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে থাকবে দু’টি খাতা, যার মধ্যে একটি স্কুলেই রেখে যাওয়া যাবে। উঁচু ক্লাসের ক্ষেত্রে মোটা বাঁধানো খাতার বদলে পাতলা খাতা ব্যবহার করতে হবে। এছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি শিশুদের কোনও হোম ওয়ার্ক দেওয়া যাবে না। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য সপ্তাহে দু’ঘণ্টা এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা হোমওয়ার্ক করানো যাবে। নবম থেকে দ্বাদশের ক্ষেত্রে সেটি প্রতিদিন ২ ঘণ্টা।
রুটিনের ক্ষেত্রে বড় বদল
বিদ্যালয়ের রুটিনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনেছে শিক্ষা দফতর। প্রাথমিকে দিনে মাত্র দু’টি বিষয় পড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই বিষয়ের পরপর দু’টি ক্লাস বা ‘ব্লক পিরিয়ড’ রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে পড়ুয়াদের অতিরিক্ত বই বইতে না হয়। এছাড়া বেঞ্চে পাশাপাশি বসা সহপাঠীদের মধ্যে বই শেয়ার করার অভ্যাসকেও উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে জলের বোতল এবং টিফিন বক্সের ওজনেও রাশ টানতে চাইছে প্রশাসন। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্কুলগুলিতে পরিস্রুত পানীয় জল এবং উন্নত মানের মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বাড়ি থেকে বোতল বা টিফিন বক্স বয়ে আনার কোনও প্রয়োজন না থাকে।
আরও পড়ুন: বাংলাজুড়ে বিনামূল্যে ক্লিনিক, আয়ুষ্মান মন্দির চালুর পথে রাজ্য সরকার
বিশেষ ভাবে সক্ষম পড়ুয়াদের জন্য স্কুলেই লকারের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও স্কুলের ব্যাগের ভার নিয়ন্ত্রণের জন্য বছরে ১০ দিন ‘নো ব্যাগ ডে’ হিসাবে পালন করতে হবে। ওই সব দিনে পড়ুয়ারা ইন্টার্নশিপ করবে। স্থানীয় কুমোর, ছুতোর, মালি বা কোনও শিল্পীর কাছ থেকে কাজ শিখে নেবে তারা। গোটা প্রক্রিয়ায় সচেতনতা বাড়াতে পেরেন্টস-টিচার মিটিংয়ে নিয়মিত আলোচনার নির্দেশ দিয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতর।










