২০২১-এর নির্বাচনে ভাঙড়বাসী যে পথ দেখিয়েছিল, এবার সেই পথেই হাঁটতে চলছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা। আর সেই পথ হল – তৃনমূলকে (TMC) ক্ষমতা থেকে সরানো।
তাই এবার ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই চিন্তা যেন বেড়ে চলেছে তৃনমূলের।
কারণ একদিকে যেমন একের পর এক অ্যাকশন নিয়ে চলেছে নির্বাচন কমিশন, তেমনই অন্যদিকে কোম্পানির পর কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়ে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক!
আর এরই মধ্যে তৃনমূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, বাংলার তাবড় তাবড় মুসলিম নেতারা, যার প্রভাব এবার ভালো রকম দেখা যাবে তৃনমূলের ভোট ব্যাঙ্কে। আর এই কথা আমরা বলছি না, বলছে বাংলার বেশ কিছু রিপোর্ট ও বাংলার ইতিহাস।
এক কথায় – এবার বাংলায় বদলে যাচ্ছে মুসলিম ভোটের সমীকরণ।
কিন্তু, হঠাৎ কী এমন হল – যার কারণে মুসলিম ভোটাররা হয়ে পড়ছে তৃণমূল বিমুখ? কারা রয়েছেন এর নেপথ্যে?
আজ India Hood ডিকোড-এ আমরা তুলে ধরবো এমন কিছু ঘটনা, যা আমার-আপনার ধারণারও বাইরে! তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
তৃনমূলের ভোট ব্যাঙ্কের মেরুদণ্ড মুসলিমরাই!
চলুন মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে আপনাদের জানিয়ে দিই একটি চমকপ্রদ তথ্য। রিপোর্ট বলছে – ২০০৬ সালে বাংলায় তৃণমূল পেয়েছিল মাত্র ২২ শতাংশ মুসলিম ভোট। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয় ৩৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। আর ২০২১ সালে সেই সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছিল ৭৫ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলার ২৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশই কিন্তু তৃনমূলকে ভোট দেয়।
আবার ২০১৬ সালে তৃণমূল হিন্দু ভোট পেয়েছিল ৪৩ শতাংশ, কিন্তু ২০২১ সালে তা নেমে আসে ৩৯ শতাংশে। অন্যদিকে বিজেপিকে ২০১৬ সালে হিন্দুরা ভোট দিয়েছিল ১২ শতাংশ, কিন্তু ২০২১ সালে এই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে।
অর্থাৎ ভাবতে পারছেন বাংলায় তৃনমূলের সরকার গঠনে মুসলিম ভোটের ভূমিকা কতটা রয়েছে!
আর এতদিন তৃনমূলের পক্ষে এই মুসলিম ভোট ব্যাংক আনার কাজ করেছিলেন যে সমস্ত তাবড় তাবড় মুসলিম নেতারা, এবার তাদের মধ্যেই হঠাৎ করে দেখা গিয়েছে তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক! চলুন এবার দেখে নিই তারা কীভাবে হতে চলেছে এবারে ভোটে বড় ফ্যাক্টর!
হুমায়ুন ফ্যাক্টর!
তৃনমূলের মুসলিম ভোট কীভাবে কমতে পারে, আর সেক্ষেত্রে হুমায়ুন কবীর কীভাবে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে – সেটা জানার আগে জানতে হবে, আমাদের রাজ্যের কোন কোন জেলায় মুসলিম ভোটার সংখ্যা বেশি।
এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। সেখানের প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোটার মুসলিম। SIR-এর আগে সেখানের ভোটার সংখ্যা ছিল মোট ৫৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ২৪৮ জন, যার মধ্যে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এখানে কিন্তু মুসলিম ভোটই মূল ফ্যাক্টর ছিল, আছে আর থাকবে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে এখানে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে। আর বিজেপি ২৪ শতাংশ।
তবে, এবার মুর্শিদাবাদে তৃনমূলের জন্য Tough Competitor হয়ে উঠেছে হুমায়ুন কবীর। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, হুমায়ুন কবীর তৃণমূল ছাড়েন। আর খুলে ফেলেন নতুন দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। আর জানিয়ে দেন, রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসনে প্রার্থী দেবে তাঁর দল। আর বাবরি মসজিদ ইস্যু নিয়ে সেখানে ইতিমধ্যেই নিজের প্রভাব আরও বাড়িয়েছেন তিনি।
আর সেই শক্তি নিয়ে, যদি এই দল মুর্শিদাবাদে শক্তভাবে লড়াই করে—তাহলে মুসলিম ভোটের একটা অংশ কিন্তু তৃণমূল থেকে সরে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদে ১০ শতাংশ ভোটও কেড়ে নিতে পারে তৃণমূলের থেকে, তাহলে কিন্তু তৃণমূলের ক্ষতি হতে পারে প্রায় ২ লক্ষ ভোট। এটা কিন্তু কোনও ছোট সংখ্যা নয়। কারণ ২০২১ সালে মুর্শিদাবাদের – বারোয়ান, নবগ্রাম, কান্দি, খরগ্রাম, বেলডাঙ্গা, ভরতপুর, এবং মুর্শিদাবাদ বিধানসভা ক্ষেত্রে তৃনমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৫০০ থেকে ৩০,০০০-এর মধ্যে। মুর্শিদাবাদের ২২টি সিটের মধ্যে যে ১৮টি সিটে ২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল, তাঁর মধ্যে ৯টি সিটে তৃনমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
আর যে ১১ লক্ষের নাম বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে যদি তার মধ্যেও কম বেশি ১-২ লক্ষ নাম বাদ পড়ে যায়, আর সেই ভোট যদি হয় মুসলিম ভোট। তাহলে কিন্তু, অনেকটাই ক্ষতির মুখে পড়বে রাজ্যের শাসক দল!
আরাবুল ফ্যাক্টর!
গত ১৬ই মার্চ হঠাৎ করেই দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের শক্তিশালী নেতা আরাবুল ইসলাম ছেড়ে দেন তৃণমূল কংগ্রেস। পাশাপাশি ভাঙড়ের আর এক তৃণমূল নেতা কাইজ়ার আহমেদও নাকি দলে কোণঠাসা। ভোটের আগে তিনিও নতুন পথে হাঁটতে পারেন।
কিন্তু ভাঙড় কী মুর্শিদাবাদের মতন এতটা গুরুত্বপূর্ণ? আপনাদের জানিয়ে দিই – পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি এই ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্র। কারণ এই এলাকা শুধু রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য নয়, ভোটের সমীকরণের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের জনসংখ্যার বড় অংশই মুসলিম। এখানের ভোটার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষের কাছাকাছি। আর এই অঞ্চলের মুসলিম ভোটার সংখ্যাও প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ এখানে যে দল মুসলিম ভোটের বড় অংশ পাবে – সেই দলই সাধারণত নির্বাচনে এগিয়ে থাকবে।
কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভাঙড়ে জিতেছিলেন ISF নেতা নওশাদ সিদ্দিকি। তিনি পেয়েছিলেন ১,০৯,২৩৭ ভোট। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী রেজাউল করিম পেয়েছিলেন ৮৩,০৮৬ ভোট। এবার তৃণমূল সেখানে দাঁড় করিয়েছে সওকাত মোল্লাকে।
কিন্তু আপনারা হয়তো ভাবছেন যদি তৃণমূল জিতেই না থাকে, আর এবারে আরাবুল ইসলাম প্রার্থী না হন – তাহলে আরাবুলের ভূমিকাটা কী?
২০২১ সালে, ভাঙড়ে তৃণমূল প্রার্থী হিসবে রেজাউল করিমকে নির্বাচন করা লেও, এলাকার সংগঠন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ছিল আরাবুল ইসলামের। এক সময় ভাঙড় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে টিকিট দেওয়া হয়নি বলে আরাবুলের সমর্থকদের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা যায়; এমনকি স্থানীয় তৃণমূল কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদও হয়েছিল, বেঁধে যায় গোষ্ঠীদ্বন্দও। যা ভাঙড়ের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। আর সেই ফায়দাই লুটেছিল আইএসএফ।
আর এবার, আরাবুল দল ছেড়েছে। আর যোগ দিয়েছেন আইএসএফ-এ। অর্থাৎ, আগের বার তিনি থাকাতেও যে ভোটযুদ্ধ জিততে পারেনি তৃণমূল, এবার সেখানেও ভোটের শেয়ারিং আরোই কমবে। শুধু তাই নয় এর প্রভাবে ভাঙড়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা, যেমন ক্যানিং, বসিরহাট, মগরাহাট-এ এবার তৃনমূলের ভোটে ভাগ বসাতে পারে আইএসএফ। অর্থাৎ, ভাঙড়ের মতো কেন্দ্র তৃণমূলের পক্ষে জেতা প্রায় অসম্ভব এটাও বলা যেতে পারে।
মনিরুল ফ্যাক্টর!
২০২৬ সালের ১৭ই মার্চ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে তৃণমূল কংগ্রেস। দেখা যায় প্রার্থী তালিকায় নেই প্রায় ৭৪ জন পুরানো বিধায়ক, যার মধ্যে একজন হলেন ফারাক্কার বিধায়ক মনিরুল ইসলাম। আর তিনি ১৮ই মার্চ, প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরের দিনই, টিকিট না পেয়ে সরাসরি বিদ্রোহের সুর তোলেন।
তিনি বলেন – “আমাকে বলির পাঁঠা করা হল!” শুধু তাই নয়, তিনি এও বলেন – “প্রয়োজনে তৃণমূল ছেড়েও ভোটে দাঁড়াবো। কিন্তু এবারের ভোটে আমি লড়বো।” তবে কোনও দলের হয়ে, নাকি নির্দল প্রার্থী হিসেবে, তা এখনও খোলসা করেননি তিনি।
এবার আপনাদের জানিয়ে দিই, ফারাক্কায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ১২ হাজার ৫২৩ জন, যার মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ মুসলিম ভোটার। তবে, এর মধ্যে SIR-এ বাদ গিয়েছে প্রায় ১২ হাজার নাম।
আর ২০২১ সালে এই কেন্দ্র থেকে ১ লক্ষের বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিল মনিরুল। পেয়েছিলেন ৫৫ শতাংশ ভোট। আর বিজেপি পেয়েছিল প্রায় ২৩ শতাংশ ভোট।
অর্থাৎ, তিনি যদি ভোটে দাঁড়ান, আর যদি কিছু সংখ্যক ভোট কেটে নেন তৃনমূলের থেকে, তাহলে কিন্তু খেলা অনেকটাই ঘুরে যেতে পারে।
আরও ১৩ বিধানসভায় পড়বে প্রভাব!
তবে, শুধু মনিরুল বা আরাবুল নয়, এবারে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরও ১৩ জায়গার সিটিং মুসলিম MLA-কে সরিয়ে নতুন প্রার্থী দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। যাদের মধ্যে রয়েছে – ইসলামপুরের বিধায়ক আব্দুল করিম চৌধুরী, হরিশচন্দ্রপুরের তজমুল হোসেন, সুজাপুরের আব্দুল গনি, লালগোলা থেকে মহম্মদ আলী, বেলডাঙ্গা থেকে হাসানুজ্জামান শেখ, জলঙ্গি থেকে আব্দুর রাজ্জাক, বাদুড়িয়া থেকে আব্দুর রহিম দিলু, আমডাঙ্গা থেকে রফিকুর রহমান, দেগঙ্গা থেকে রহিমা বিবি, হাড়োয়া থেকে রবিউল ইসলাম, বসিরহাট উত্তর থেকে রফিকুল ইসলাম, মগরাহাট পশ্চিম থেকে গিয়াসউদ্দিন লস্কর, পাঁশকুড়া পশ্চিম থেকে ফিরোজা বিবি।
যদিও এরা কেউই এখনও নিজের দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি, তবে ভোট এখনও ২০-২৫ দিন বাকী আছে, তার আগে এই সমস্ত নেতাদের প্রভাবে যদি আরও কিছু মুসলিম ভোট এদিক ওদিক হয়ে যায় তাহলে কিন্তু তার ফল ওঠাবে বিরোধীরা!
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মানুষে দেখেছে একেবারে নতুন উঠে আসা এক মুসলিম নেতা নওশাদ সিদ্দীকে জয়ী হতে, আবার ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে, অধীর গড় মুর্শিদাবাদে আর এক নতুন মুসলিম নেতা ইউসুফ পাঠানকে জয়ী হতে দেখেছিল মানুষ।
এমনকি বাংলার অধিকাংশ মুলসিম এলাকায়, তৃনমূলের মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই এই মুসলিম নেতারা যে এবারের ভোটে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে, সেটা অনেকটাই পরিষ্কার।
এবার আপনার কী মনে হয়? সত্যি কি তৃনমূলের ভোট ব্যাঙ্কে প্রভাবে ফেলবে এই মুসলিম নেতারা? জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত কমেন্ট করে।












