India Hood Decode: ধুরন্ধর ২: বাস্তব ঘটনা নাকি সাজানো গল্প? প্রমাণসহ বিশ্লেষণ!

Published:

Dhurandhar 2

১৯শে মার্চ, সারা দেশ জুড়ে মুক্তি পায় বহু প্রতীক্ষিত ছবি ধুরন্ধরঃ দ্যা রিভেঞ্জ (Dhurandhar 2)। আর মুক্তি পেতেই, একদিকে যেমন কাঁপতে শুরু করে বক্স অফিস, তেমনই অন্যদিকে কাঁপতে শুরু করে পাকিস্তান এবং ভারত বিরোধীরা।

কিন্তু, এই সিনেমা যতই জনপ্রিয় হচ্ছে, ততই বুক ধড়ফড়ানি বাড়ছে বেশ কিছু ভারতীয়দের। কিন্তু কেন?

যে দেশে স্ট্যান্ড আপ কমেডিতে প্রধানমন্ত্রীর অপমান করা হয়, আর বলা হয় – মজাকে মজার মতো নেওয়া উচিত,  যে দেশে দেবী সরস্বতীর নগ্ন ছবি আঁকা হয়, আর বলা হয় – শিল্পকে শিল্পের মতোই নেওয়া উচিত!

আর সেই ভারতেই যখন ধুরন্ধর, কিংবা ধুরন্ধরঃ দ্যা রিভেঞ্জ-এর মতো ছবি তৈরি হয় – তখন বলা হয় – ছবির মাধ্যমে হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, ছবিতে পাকিস্তানকে খারাপ দেখানো হচ্ছে, এই ছবি দিয়ে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে! তখন বলতে শোনা যায় না – একটি ছবিকে বিনোদনের মতোই নেওয়া উচিত, একটি শিল্পকে শিল্পের মতোই দেখা উচিত। তাহলে এই দ্বিচারিতা কেন?

কী রয়েছে এই সিনেমার মধ্যে যে কারণে এত বিরোধিতা হচ্ছে? সিনেমায় এমন কোন ঘটনা দেখানো হয়েছে যার জন্য চিন্তায় পড়েছে বেশ কিছু ভারতীয়রা? কেনই বা এই সিনেমার ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে পাকিস্তান? ঠিক কোন ঘটনাগুলি বাস্তবের সাথে ১০০ শতাংশ মিলে যায়? এই সিনেমা কি সত্যি প্রোপাগাণ্ডা নাকি মাস্টারপিস?

আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো এই সিনেমার এমন কিছু তথ্য, এমন কিছু সত্য যা ভারতের রাজনীতির ভীত নাড়িয়ে দেবো। আপনার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে, কেন হাতে গোনা কিছু মানুষ এই ছবির বিরোধিতা করছেন! তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

একবার ভাবুন তো – যদি আপনাকে চিনি বলে নুন খাওয়ানো হয় – আপনি কি খাবেন? আপনি কিন্তু মুখে নিয়েই ফেলে দেবেন!

ঠিক তেমনই – ভারতের দর্শকরা আজ বোকা নয়। তাদেরকে যা দেখানো হবে তারা সেটাই দেখবে এমনটা নয়। আর দেখার পর ফাইভ স্টার রেটিং দেবে সেটাতো একদমই নয়!

কারণ বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু সিনেমা বেরিয়েছে, যেমন দ্যা তাজ স্টোরি, দ্যা বেঙ্গল ফাইলস, দ্যা কেরালা স্টোরি ২। এই সিনেমাগুলি বক্স অফিসে এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। কেউই ৩০ কোটির গণ্ডি টপকাতে পারেনি। কিন্তু সেখানেই মাত্র ৭ দিনে ১০০০ কোটি পার করেছে ধুরন্ধর ২। ভাবুন, যেখানে বর্তমানে মানুষ হল-এ সিনেমা দেখতে যায় না, গেলেও দুই-আড়াই ঘণ্টার ছবি খুব কষ্ট করে দেখে। সেখানে শেষ চার মাসে দুটি সাড়ে তিন ঘণ্টার ছবি লোক লাইন দিয়ে, টিকিট কেটে পুরোটা দেখছে – এমনি এমনি?

না, কারণ এই সিনেমার মধ্যে যেমন রয়েছে থ্রিলার, তেমনই রয়েছে অ্যাকশন, আর তেমনই স্টোরি। আর এই স্টোরির মধ্যেই রয়েছে এমন কিছু ঘটনা যা অনবদ্য করে তুলেছে এই সিনেমাকে। যা হুবহু মিলে গিয়েছে বাস্তবের সাথে। আর এবার সেগুলোই তুলে ধরবো আপনাদের কাছে।

প্রথমেই বলা যাক – ছবির চরিত্র নিয়ে!

এই ছবির একাধিক চরিত্র বাস্তব এবং সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

এই সিনেমায় সবথেকে বেশি নাম কামিয়েছিলেন অক্ষয় খান্না, অর্থাৎ সিনেমার রহমান ডাকাত। সেই রহমান ডাকাত প্রকৃতপক্ষে ছিলেন পাকিস্তানের লিয়ারির একজন কুখ্যাত বালোচ গ্যাংস্টার। এমনকি ছবিতে দেখানো রহমানের ডান হাত উজের বালোচও কিন্তু বাস্তবে ছিলেন রহমানের অন্যতম সঙ্গী।

সিনেমার অন্যতম ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার এসপি আসলাম চৌধুরী, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সঞ্জয় দত্ত, সেই তিনিও কিন্তু বাস্তবে ছিলেন লিয়ারির একজন পুলিশ কর্তা।

এমনকি সিনেমায় দেখানো খানানি ব্রাদার্স ছিলেন পাকিস্তানের জাল নোট চক্রের মাস্টারমাইন্ড।

সিনেমায় অর্জুন রামপাল অভিনীত চরিত্র মেজর ইকবাল, যাকে দেখানো হয়েছে ISI-এর সদস্য এবং ভারতে জঙ্গি চক্রের মাথা, তেমন কিন্তু বাস্তবেও মিল পাওয়া যায় পাকিস্তানের ইলিয়াস কাশ্মীরির। যিনি আগে পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্সের অপারেটর থাকলেও পরে জিহাদি জঙ্গি নেতা হয়ে ওঠেন।

আর সিনেমায় আর মাধবন চরিত্র অজয় সান্যাল, তাঁকে কে না চেনেন? সেই চরিত্রটি আমাদের দেশের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট অজিত ডোভালের ওপর নির্ভর করে তৈরি। তাঁকে নিয়ে একটি ডিকোড ভিডিও ইতিমধ্যেই আমাদের চ্যানেলে রয়েছে, আই বাটনে ক্লিক করে আপনি সেটি দেখে নিতে পারেন।

তবে, এবার আপনাদের জানাবো এমন এক চরিত্রের কথা – যার জীবনে বাস্তবেই বড়সড় প্রভাব পড়েছে এই সিনেমার কারণে।

আর সেটি হল রাকেশ বেদী অভিনীত জামাল জামালির চরিত্র। ধুরন্ধর মুক্তি পাওয়ার পর দাবী ওঠে, এই চরিত্রটি পাক রাজনীতিবিদ নাবিল গাবোলের থেকে অনুপ্রাণিত। ধুরন্ধর-এর গল্প অনুসারে রাতারাতি পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গাবোল। কারণ, ধুরন্ধর ছবিতে জামিলের উত্থানটাও, পাক রাজনীতিতে নাবিলের মতো পাকিস্তান পিপলস পার্টি অর্থাৎ PPP-র হাত ধরে। এমনকি নাবিলও এক সময়ে বলেন, ‘ধুরন্ধর’-এ রাকেশ অভিনীত জামিল জামালি চরিত্রটি তাঁর আদলেই তৈরি। তা নিয়ে পাক সংবাদমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ছবির একটি গানে রিলও তৈরি করেছিলেন। প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, জামিল চরিত্রটি স্পষ্টতই তাঁর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টিকে সম্মানের প্রতীক হিসাবেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

কিন্তু, ধুরন্ধরঃ দ্যা রিভেঞ্জ মুক্তি পেতেই বদলে যায় নাবিলের জীবন। কারণ এই ছবিতে জামিল একজন ভারতীয় এজেন্ট। আর তারপর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন করা হচ্ছে বিদ্রুপ, আবার অন্যদিকে তাকে নাকি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ। তাই, তিনি নাকি এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। অর্থাৎ, একটা কথা বলাই যায়, গল্প হলেও যেন কিছুটা সত্যি এই ধুরন্ধর!

এবার আসা যাক – বেশ কিছু গোপন অপারেশন নিয়ে!

ধুরন্ধর ছবিতে আমরা দেখেছি কীভাবে একজন ভারতীয় এজেন্ট গোপনে হত্যা করছে পাকিস্তানের জঙ্গী গোষ্ঠীর মাথাদের। তেমনই বাস্তবেও কিন্তু এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে পাকিস্তানের বড় জঙ্গি নেতারা মারা গিয়েছেন কিন্তু তাদের আততায়ীর খোঁজ পাওয়া যায়নি এখনও!

যেমন – ২০১৪ সালে প্রকাশিত, ডন পত্রিকার আর একটি সংবাদ নিয়ে। যেখানে বলা হয়েছে –তালিবান বোমা হামলায় নিহত প্রবীণ পুলিশ কর্মকর্তা চৌধুরী আসলাম। যেটা মিলে যায় ধুরন্ধর ২-এর সাথে।

এবার আসি, ২০১৬ সালের ডন-এর একটি সংবাদ, যেখানে লেখা রয়েছে – করাচির বিল্ডিং থেকে পড়ে মৃত্যু হল জাভেদ খানানির। কিন্তু, তার মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। ছবিতে এই বিষয়টিও দেখানো হয়েছে।

এবার দেখুন, ২০২০ সালে পাকিস্তানের ডন সংবাদ ওয়েবসাইটে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় – যেখানে লেখা আছে – পাকিস্তানের কাউন্টার-টেরোরিজম ডিপার্টমেন্ট জানাচ্ছে – পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড করার জন্য RAW, লিয়ারির গ্যাংস্টারদের ব্যবহার করছে।

এরপর আসি, ২০২২ সালে India Today-র একটি খবরে। যেখানে বলা হয়েছে – ১৯৯৯ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান হাইজ্যাককারী সন্ত্রাসী হঠাৎ নিহত হয়েছে পাকিস্তানে। যেটাও কিন্তু ছবিতে দেখানো হয়েছে।

আর এবার আসি, ২০২৪ সালের, NDTV-র একটি খবর। যেখানে বলা হচ্ছে – লস্কর প্রতিষ্ঠাতা এবং হাফিজ সাইদের ডেপুটি আব্দুল সালাম ভুট্টাভি হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছে। এটাও ছবিতে দেখানো হয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে, আতিক আহমেদ থেকে শুরু করে এমন একাধিক জঙ্গিদের রহস্য মৃত্যুর ঘটনা। অর্থাৎ, অজানা কারণে এই সমস্ত জঙ্গিদের মৃত্যু, অজানা বন্দুকবাজদের পরিচয় না পাওয়া এসবের ইঙ্গিত কিন্তু পরিষ্কার।

এবার জানবো – ডে লা রু এবং নোট বন্দীর কথায়!

ধুরন্ধর ছবিতে একটা দৃশ্যে দেখানো হয় – আমাদের দেশ যে সংস্থার থেকে টাকা তৈরির কাগজ এবং প্লেট নেয় – সেগুলো সেই সংস্থার মাধ্যমে এবং ভারতীয় মন্ত্রীদের সহায়তায় পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে এবং তারপর সেই টাকা জাল করে কাতার, নেপাল হয়ে উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। আর ধুরন্ধরঃ দ্যা রিভেঞ্জে দেখানো হয়েছে এই জাল নোট বন্ধ করে কীভাবে পাকিস্তানের আতঙ্কবাদীদের মাথায় বাজ ফেলে দিয়েছে মোদী!

চলুন আমাদের দেশের গল্পটা জেনে নেওয়া যাক। সালটা ২০০৪। আমাদের দেশে তখন সবে সবে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস সরকার, আর অর্থমন্ত্রী ছিলেন পি. চিদাম্বরম। সেই সময়ে ভারতীয় কারেন্সির সিকিউরিটি থ্রেড, নোটের কাগজ, এবং অন্যান্য কিছু সরঞ্জামের বরাত দেওয়া হয় ডে লা রু নামক একটি ব্রিটিশ সংস্থাকে।

এরপর ২০১০ সালে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারে, ডে লা রু একই ধরনের কারেন্সি পেপার এবং সরঞ্জাম পাকিস্তানকেও সরবরাহ করছে। যার ফলে দেশের মধ্যে প্রচুর জালনোট ঢুকলেও তা এতটাই উন্নতমানের ছিল যে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। ওই সময়ে আবার ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি তদন্তের নির্দেশ দেন এবং কোম্পানির সাপ্লাই স্থগিত করে, কোম্পানিটিকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়। সেই সময়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন চিদাম্বরম।

এরপর ২০১২ সালে ফের দেশের অর্থমন্ত্রী হন চিদাম্বরম। ভারতের অর্থ দপ্তরের সেক্রেটারি হন অরবিন্দ মায়ারাম। আর সেই সময়েই ফের ভারতের নোটের কাগজ সরবরাহের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয় ডে লা রু-র ওপর। তুলে নেওয়া হয় ব্ল্যাকলিস্ট তকমা। কিন্তু, পরে জানা যায়, এই পুরো বিষয় সম্পর্কে অরবিন্দ, না জানিয়েছিল ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে, না জানিয়েছিল ভারতের অর্থ মন্ত্রককে। কিন্তু, কোনও মন্ত্রীর সমর্থন ছাড়া এই এত সংবেদনশীল একটি অর্ডার দেওয়া কি কারোর পক্ষে সম্ভব?

এছাড়াও, ২০০৪ সালে ডে লা রু যখন ভারতের সাথে চুক্তি করেছিল, তারা জানিয়েছিল – তাদের কাছে এক্সক্লুসিভ সিকিউরিটি থ্রেডের পেটেন্ট রয়েছে, যেটা তারা ভারতকে দেবে। কিন্তু পরবর্তীতে সিবিআই জানতে পারে – তাদের কাছে এরম কোনও পেটেন্ট নেই।

এমনকি সিবিআই জানতে পারে, ডে লা রু-র কর্মকর্তা অনিল রাঘবীর এই চুক্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য ২০১১ সালে ৮.২ কোটি টাকা অফসোর অ্যাকাউন্ট থেকে লাভ করেছে।

যদিও এই নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। চলুন এবার কিছু তথ্য দেওয়া যাক –

২০১৩ সালে NIA-এর রিপোর্ট অনুযায়ী – ২০১০ সালে ভারতে পাচার হওয়া জাল নোটের পরিমাণ ছিল ১,৫০০ থেকে ১,৭০০ কোটি টাকার মধ্যে, যা ২০১২ সালে বেড়ে ২,৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায় – অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এবং ২০১৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১,২০০ কোটি টাকার জাল নোট ভারতীয় অর্থনীতিকে প্রবেশ করে।

আর নোটবন্দী হয় ২০১৬ সালে। যার পর বর্তমানে জাল নোটের সংখ্যা কত জানেন? ২০২৫ সালে আরবিআই-এর রিপোর্ট বলছে ধরা পড়েছে মোট ৭ কোটি টাকার জাল নোট। আর তথ্য বলে, সারা দেশে যা জাল নোট ছড়ানো থাকে তার ১০ থেকে ৩০ শতাংশ নোট ধরা পড়ে। সুতরাং সেই দিক দিয়ে গেলেও সর্বোচ্চ ২০২৫ সালে ভারতের বাজারে ছিল ৭০ কোটি টাকার জাল নোট।

অর্থাৎ, যেখানে নোটবন্দী হওয়ার আগে ভারতে জাল নোট ধরা পড়ার পরিমাণ ছিল হাজার হাজার কোটি, সেখানে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে সেই সংখ্যা ১০০ কোটিও টপকায় না!

অর্থাৎ, আপনারাই বলুন তো নোটবন্দীর ফলে পাকিস্তান থেকে ভারতে জাল নোট সরবরাহ বন্ধ হয়েছে কিনা! আর যদি ছবিতে এটা একটা কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয় সেটায় ভুল কীসের?

এবার বলবো – কান্দাহার হাইজ্যাক এবং পার্লামেন্ট হামলার কথা!

অনেকের অভিযোগ – এই ছবিতে নাকি শুধুই কংগ্রেস বিরোধী ঘটনা দেখানো হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

এই ছবিতে আপনি যদি দেখেন – প্রথমেই, ১৯৯৯ সালের কান্দাহার হাইজ্যাকের ঘটনা দেখানো হয়েছে, দেখানো হয়েছে সরকার কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারপর এও দেখানো হয়েছে, কীভাবে তখন এই সমস্ত কার্যকলাপ আটকানোর জন্য অজয় সান্যালের মতামত নেওয়া হয়নি। যার ফলস্বরূপ, ২০০১ সালে পার্লামেন্ট আক্রমণ হয় এবং সেই ঘটনাও তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। আর সেই সময়কালটা কিন্তু ছিল বিজেপি-র এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী।

অর্থাৎ, যে কোনও একটা সরকার কিংবা বিশিষ্ট কোনও একটা সরকারের সময়কাল দেখানো হয়নি এই ছবিতে।

আবার এটাও ঠিক, কান্দাহার হাইজ্যাকের এক মাথাকে কোনও অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারী ২০২২ সালে গুলি করে মেরে দেয় করাচিতে। কে সেই অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকবাজ আজও তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এমনকি হামজা আলী অর্থাৎ সিনেমার নায়ককে পাকিস্তানে মিশনে পাঠানোই হয়েছিল ২০০৪ সালে। মানে ভাবুন সেই সময়টাও কংগ্রেস জামানায়। অর্থাৎ, ব্যাপারটা সরকার কিংবা কোনও প্রোপাগাণ্ডার নয়।

ওই যে কথায় আছে না, যারা ভালো দেখতে পায় না, তারা কিছুতেই ভালো দেখতে পায় না। এখানেও ব্যাপারটা সেরমই।

ছবিটি কি আদৌ প্রোপাগাণ্ডা?

ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলায় সিআরপিএফ জওয়ানদের মৃত্যুর প্রাথমিক দায়ভার “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপরই বর্তায়—যিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে পরিচালিত হন।”এই সাক্ষাৎকার বাইরে আসতেই সবাই কেন্দ্রীয় সরকারের তিরস্কার করা শুরু করে দেয়। সবাই এটাকে সত্যি বলে মেনে নেয়।

এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত বই ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’-তে তিনি অভিযোগ করেন – ২০২০ সালে গালভান ভ্যালিতে চীনা সেনাবাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের আগে, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ ছিলেন। এবং এই লেখাকেও দেশের বিরোধীরা সত্যি বলে মেনে নেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ করা শুরু করে দেয়। এমনকি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী লোকসভায় এই অপ্রকাশিত বইয়ের অভিযোগ সামনে এনে সরকারকে আক্রমণ করে।

বিশ্বাস করুন – কোনও অসুবিধা নেই। দেশের সরকারের কাজ নিয়ে সেই সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার সবার আছে।

কিন্তু, ধুরন্ধরঃ দ্যা রিভেঞ্জ মুক্তি পাওয়ার পর জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল এসপি ভেদ ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’চলচ্চিত্রটির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সিনেমাটি কিছু অস্বস্তিকর সত্যকে তুলে ধরেছে এবং ছবিটি বিভেদ সৃষ্টিকারী কোনো এজেন্ডা প্রচার করছে না।“ কিন্তু, তাহলে এই নিয়ে কেন কেউ লিখছেন না, কিংবা কিছু বলছেন না।

কিন্তু কেন হচ্ছে এই ছবির বিরোধীতা?

জিওপলিটিক্স বিশেষজ্ঞ পভনীত সিং জানিয়েছেন – ১৯৭০-এর দশক থেকে বলিউডে এমন কিছু চিত্রনাট্যকারীর প্রভাব বাড়ে, যাদের ভাবনায় বামপন্থী মতাদর্শের ছাপ ছিল। তাদের অনেক ছবিতে ভারতকে দুর্নীতিগ্রস্ত, সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ হিসেবে দেখানো হত। সেই গল্পে নায়ক প্রায়ই আইন ভেঙে বা সিস্টেমের বাইরে গিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করত—মানে, সিস্টেমকে ব্যর্থ হিসেবেই তুলে ধরা হত।

এরপর ১৯৯০-এর দশকে সিনেমার ধরণ আরও বদলায়। তখন অনেক ছবিতে দারিদ্র্য, জাতিগত বিভাজন এসব বিষয়কে বেশি করে দেখানো শুরু হয়। পাশাপাশি, কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, আর সরকারকে কঠোর বা নির্দয় হিসেবে দেখানো হত। অন্যদিকে, বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে কখনও কখনও সহানুভূতির চোখে দেখানো হত। তার মতে, এই ধরনের গল্পের মাধ্যমে ভারতের ভাবমূর্তিকে দুর্বল বা “ব্যর্থ গণতন্ত্র” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হত।

পভনীত সিং আরও দাবি করেন, কিছু বিদেশি সংস্থাও নাকি এই ধরনের কনটেন্টে অর্থ লগ্নি করত, যাতে নির্দিষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এমনকি কিছু ছবিতে জঙ্গি বা উগ্রপন্থীদের নিয়েও বিভ্রান্তিকর সহানুভূতি তৈরি করা হত—যাতে সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে।

তার মতে, “ধুরন্ধর” এই প্রচলিত ধারার বিপরীতে গিয়ে অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। আর সেই কারণেই এই ছবিকে ঘিরে এত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সবশেষে এটাই বলবো – চার ঘণ্টা হল-এ কোনও সিনেমা শেষ কবে কেউ বসে দেখেছেন হাই না তুলে সেটা বোধহয় কেউ মনে করতে পারে না। এর কারণ বাস্তবের সাথে ফিকশনের অটুট মেলবন্ধনে তৈরি একটি দুর্দান্ত গল্প, সেরা চরিত্র বাছাই, অনবদ্য গবেষণা, সুন্দর মিউজিক – যার ফলে এই ছবি হয়ে উঠেছে একটি মাস্টারপিস।

আপনি কি এখনও পর্যন্ত ধুরন্ধর অথবা ধুরন্ধর ২ দেখেছেন? আপনার কী মনে হয়? এই ছবি কি মাস্টারপিস নাকি প্রোপাগান্ডা – নিজের জানাতে ভুলবেন না কমেন্ট করে।

google button