India Hood Decode: সত্যি কি জিতবে বিজেপি? অঙ্ক বলছে অন্য কথা

Published:

BJP

আর মাত্র ১৪ দিন, তারপরেই নির্ধারণ হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য! কিন্তু নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই গাড় হচ্ছে একটি প্রশ্ন – কে জিতবে বাংলা – তৃণমূল নাকি বিজেপি (BJP)?

ফের কি বাংলার গদিতে বসবে টানা ১৫ বছর রাজত্ব করে আসা তৃণমূল নাকি হবে পরিবর্তন?

একদিকে তৃণমূল বলছে – যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা। আর অন্যদিকে বিজেপি বলছে – পাল্টানো দরকার চাই বিজেপি সরকার!

একদিকে বলছে – ২৬-এর ভোটে খেল দেখাবে SIR, আবার অন্যদিকে বলছে – দিদির ভাতার কাছে সবই হবে ছাড়খার!

তবে ভোট এবার তৃণমূল, সিপিএম, বিজেপি আর কংগ্রেসের মধ্যে হলেও, অনেকের মতে – ভোট হচ্ছে কিন্তু তৃণমূল বনাম নির্বাচন কমিশনের মধ্যে। কারণ এবার ভোটে সবথেকে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে নির্বাচন কমিশন।

তবে নির্বাচন কমিশন যাই করুক না কেন, বাংলার ভোট কিন্তু নির্ভর করে বেশ কিছু ফ্যাক্টরের ওপর, আর সেই ফ্যাক্টরই নিশ্চিত করবে এবার কে জিতবে ভোটে? কার দখলে যাবে বাংলা? ২৯৪-এর মধ্যে কে পাবে ম্যাজিক ফিগার অর্থাৎ ১৪৮টি আসন? এই ফ্যাক্টরগুলোই বদলে দেবে সম্পূর্ণ ভোটের সমীকরণ!

আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো বাংলার বেশ কিছু ফ্যাক্টর, যা বদলে দেবে বাংলার ভবিষ্যৎ। তাই ধৈর্য ধরে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন, আর দেখার পর অবশ্যই শেয়ার করুন।

মহিলা ফ্যাক্টর!

সময়টা ২০২১-এর ২রা মে! বিধানসভা নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে তৃতীয়বারের মতো জয়ী হয় তৃণমূল। তবে এর থেকেও বড় চমক ছিল ভোটবাক্সে মহিলাদের ভোট। কারণ সেবার মহিলাদের এক তরফা ভোট গিয়েছিল মমতার পক্ষে, আর নেপথ্যে ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রুপশ্রীর মতো একাধিক জনদরদী প্রকল্প।

তবে তৃণমূল আমলে নারীদের ওপর অত্যাচার, ধর্ষণ যতই বাড়ুক, যতই মুখ্যমন্ত্রী বলুক রাতের বেলা বাইরে বেরোনোর কি দরকার – তাও রাজ্যের মেয়েরা খুশি এই ভাতার টাকায়। আর সেই ফল দেখা যায় ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে!

তবে, এবার মহিলাদের ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিজেপিও দিয়েছে একাধিক প্রতিশ্রুতি। রয়েছে সরাসরি ৩০০০ টাকা আর্থিক সাহায্য, লাখপতি দিদির মাধ্যমে নারীদের স্বনির্ভর করা, গর্ভবতী নারীদের ২১,০০০ টাকা সাহায্য।

তবে, মহিলারা কি আদৌ ভরসা করবে বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে – তা দেখা যাবে এবারের ভোটবাক্সে।

যুবক ফ্যাক্টর!

আমাদের রাজ্যে শুধুমাত্র তৃণমূল জমানায় বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ৩০ শতাংশ। মমতা সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছে ৬৬৮৮টি কোম্পানি। এর মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রয়েছে ১১০টি কোম্পানি। যে কারণে বাংলার ৪৭.৬ শতাংশ MA পাস ছেলে-মেয়ে বেকার। ৩.৩ শতাংশ ডিপ্লোমা করা ছেলে-মেয়েরা চাকরি পাচ্ছে না। শুধু তাই নয় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ ছেলে-মেয়েরা অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে চাকরির সন্ধানে। শুধুমাত্র রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে প্রায় ৩.৫ লক্ষ শিক্ষক পদ আজ শূন্য। ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে রাজ্যে শিক্ষিত বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। যা দেশের গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ।

তাই এই বেকারদের ভোট এবার হবে অন্যতম ভোট ফ্যাক্টর। আর এই ভোট কব্জা করার জন্যই একদিকে যেমন মাসিক ১৫০০ টাকা দিয়ে যুবসাথী প্রকল্প চালু করেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা! তেমনই অন্যদিকে মাসিক ৩০০০ টাকা আর ১ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।

এবার এটাই দেখার বাংলার বেকার যুবকরা কাকে ভরসা করে – ১৫০০ টাকা নাকি ১ কোটি কর্মসংস্থান!

দুর্নীতি ফ্যাক্টর!

গত ১৫ বছরে বাংলা সবথেকে বেশি নজরে এসেছে দুর্নীতির জন্য। কয়লা চুরি, বালি চুরি, রেশন চুরি, গরু চুরি, চাকরি চুরি – এরম বহু দুর্নীতি বার বার এসেছে সংবাদের শিরোনামে। তবে এসব দুর্নীতি খুব একটা প্রভাব ফেলে না বাংলার ভোটে। আর তা দেখা গিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে।

তৃনমূলের এই দুর্নীতির বহর নিয়ে আমাদের একটি স্পেশাল ডিকোড ভিডিও রয়েছে। আই বাটনে ক্লিক করে আপনি সেটি দেখতে পারেন।

তবে এতদিন এইসব দুর্নীতি বাংলার ভোটে প্রভাব ফেলতে না পারলেও, এবার হয়তো সেই প্রভাব দেখা যেতে পারে। কারণ এবার SSC মামলায় বাদ পড়েছে প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষকের চাকরি অর্থাৎ প্রায় ২৬,০০০ পরিবার। ঝুলে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষকদের ভাগ্য।

কমিশন ফ্যাক্টর!

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৮৩ শতাংশ ভোটার।
কিন্তু ২০২১ সালে সেই সংখ্যাটা কমে হয় ৮২ শতাংশ।

কারণ, রিপোর্ট বলছে – ২০২০ সাল থেকে ভারতের মধ্যে ভোটের সময় হিংসার ঘটনা বেড়েই চলেছে বাংলায়, আর সারা দেশের মধ্যে এই ক্ষেত্রে বাংলার অবদান ৩৫ শতাংশ। আর ভোটের সময় মৃত্যুর ঘটনায় বাংলার অবদান ৫১ শতাংশ।

তাই এবারে শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ভোট করাতে মাঠে নেমে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। মোতায়েন করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনী। পরিমাণটা ২৪০০ কোম্পানি, যা আগের বারের তুলনায় দ্বিগুণ। সরানো হয়েছে উচ্চপদস্থ অফিসারদের, আনা হয়েছে জম্মু-কাশ্মীর থেকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, কমানো হয়েছে ভোটের দফা, কমানো হয়েছে ভোট গণনা কেন্দ্র, ব্যবহার করা হচ্ছে AI, 360 ডিগ্রি এবং ড্রোন ক্যামেরা।

শুধু তাই নয়, কলকাতার মতন বড় এলাকায় ভোটের হার বাড়ানোর জন্য এবার কলকাতা উত্তর এবং দক্ষিণের ১১টি কেন্দ্রের ছয়টি বহুতল আবাসিক কমপ্লেক্সে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে ৫৭টি আবাসিক বহুতল ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করার। পাশাপাশি সারা রাজ্যেও যাতে ভোটদানের পরিমাণ আরও বাড়ে সেই কারণে বাড়ানো হয়েছে ৪৬৬০টি সহায়ক ভোট কেন্দ্র। অর্থাৎ, এবার ভোটে ভোটদান বাড়াতে একটা বড়সড় রোল পালন করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন, যা বদলে দেবে বাংলার ভোটের সমীকরণ।

এছাড়াও, শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ভোট করাতে আরও একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে কমিশন। যদি আপনারা নির্বাচন কমিশনের মাস্টারস্ট্রোকগুলি সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আই বাটনে ক্লিক করে দেখতে পারেন নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ডিকোড।

ফেস ফ্যাক্টর!

একটা কথা মানতেই হবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে যেমন মোদীর বিকল্প নেই, তেমনই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপধ্যায়ের কোনও বিকল্প নেই। আর এর কারণ হল – প্রথম থেকেই কখনও তিনি বাংলার লড়াকু মুখ আবার কখনও তিনি মানুষের জন্য জনদরদী মুখ্যমন্ত্রী। নিজের দলের লোকেরা দুর্নীতি করলেও, তার গায়ে লাগে না কোনও দাগ। আর সেই কারণেই বিভিন্ন সভায় তাঁকে বলতে শোনা যায় – “ভুলে যান কে আপনার প্রার্থী, আমি সব জায়গার প্রার্থী।“

উল্টোদিকে আপনি যে কোনও বিজেপি সমর্থককে জিজ্ঞাসা করে দেখুন – কাকে দেখতে চান বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে – সবাই দেবেন ভিন্ন উত্তর। যদিও ফেসের দিক থেকে বর্তমানে বিজেপির তরফ থেকে ভালো রকম টেক্কা দিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী। তবুও, বিজেপির তরফ থেকে প্রধান মুখ হিসাবে দেখানো হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে!

তবে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ বাংলার ভোটে কী আদৌ কাজে লাগবে – তা সময় বলবে!

মুসলিম ফ্যাক্টর!

যে গরু দুধ দেয়, তার লাথিও খেতে রাজী- একথা আপনারা বহুবার শুনেছেন। আর এর নেপথ্যে রয়েছে – পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের অন্যতম ফ্যাক্টর মুসলিম ভোট। আর এই ভোট পাওয়ার জন্য কখনও ইমাম ভাতা বাড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী আবার কখনও মাদ্রাসার জন্য অনুমোদন করেছেন ৫০০০ কোটি টাকার বাজেট।

কারণ বাংলার ভোটার সংখ্যার মধ্যে ৩৪ শতাংশই মুসলিম, আর ৬৩ শতাংশ হিন্দু। আর এই মুসলিম ভোটের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পায় তৃণমূল, আর বাকী পড়ে থাকা ২৫ শতাংশ ভোট পায় কংগ্রেস, সিপিএম, এবং আইএসএফ। আর মুসলিম ভোটের অতি নগণ্য পরিমাণ আসে বিজেপির ঝুলিতে!

আর তাই এবার তৃনমূলের প্রার্থী তালিকাতেও রয়েছে মোট ৪৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী,
আর বামফ্রন্টের রয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ জন।
আর কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় এই সংখ্যাটা ৭৮ জন।

কিন্তু, বিজেপির এই সংখ্যাটা কত জানেন? শূন্য।

হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন, বিজেপির প্রার্থী তালিকায় এবার নেই একটাও সংখ্যালঘু প্রার্থী।

আর এই প্রভাব কিন্তু এবার সরাসরি পড়বে ভোটে। আর বাংলায় সংখ্যালঘু বিধানসভা আসনের সংখ্যা কিন্তু প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি।

আর এবার এই মুসলিম ফ্যাক্টরকেই গুঁড়িয়ে দিতে হাজির SIR।

SIR ফ্যাক্টর!

২০২৬-এর ভোটে সবথেকে বড় ফ্যাক্টর হতে চলেছে SIR। কারণ এই SIR এমন একটি পদ্ধতি যা গোটা ভোটের সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে একাই।

SIR-এর ফলে বাংলায় এখনও পর্যন্ত বাদ পড়েছে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম।
এর মধ্যে হিন্দু ভোটার ৬৩.৪ শতাংশ,
মুসলিম ভোটার ৩৪.৩ শতাংশ।

যদিও ৯১ লক্ষের মধ্যে, ৬৩ লক্ষ নাম – হয় অতিরিক্তি, নাহলে মৃত, নাহলে স্থানান্তরিত। আর বলা হচ্ছে, এর অধিকাংশ ভুয়ো ভোটই যেত তৃনমূলের কাছে।

আর বাকী ২৮ লক্ষের কাছে নেই বৈধ নথি। এর মধ্যে ৬৩.৪ শতাংশ অনুপাতে ধরলে প্রায় ১৭ লক্ষ ৭৫ হাজার হিন্দুদের নাম বাদ গিয়েছে এবং ৩৪.৩ শতাংশ অনুপাতে ধরলে প্রায় ৯ লক্ষ ৬০ হাজার মুসলিমের নাম বাদ গিয়েছে।

এই বাদ পড়া হিন্দুদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থী, মতুয়া, নমশূদ্র সম্প্রদায়ের ভোটার। যাদের অধিকাংশই এবার হতে পারতো বিজেপির ভোট! আবার বাদ পড়া মুসলিমদের অধিকাংশই যেত তৃনমূলের ভোটবাক্সে।

অর্থাৎ বলা যায় – SIR-এর ফলে একদিকে যেমন তৃনমূলের ক্ষতি হবে, তেমন ক্ষতি হবে বিজেপির!

যে সকল এলাকায় মুসলিমের পরিমাণ কিছুটা বেশি, তবুও মাত্র ১৫,০০০ ভোটের জন্য ২০২১-এ হেরেছিল বিজেপি, সেই সকল এলাকাগুলি এবার চলে আসতে পারে বিজেপির দখলে।

আবার অন্যদিকে যে সকল এলাকাগুলিতে হিন্দুর পরিমাণ বেশি, তবুও মাত্র ১৫,০০০ ভোটের জন্য ২০২১-এ হেরেছিল তৃণমূল, আবার তার মধ্যেও কিছু এলাকা এবার চলে যেতে পারে তৃনমূলের দখলে।

তবে SIR রিপোর্ট বলছে – এবার সবথেকে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, মালদা, হাওড়া, হুগলী, নদিয়া – যেখানে সবথেকে বেশি আসন ছিল তৃনমূলের দখলে।

তাই এই সব ভুয়ো ভোটার বাদ পড়ার ফলে – এক ধাক্কায় ৩০ থেকে ৪০টির বেশি আসন হারতে পারে তৃণমূল।

তবে অঙ্ক যাই বলুক – ভোট মেশিনের সামনে মানুষের আবেগ কী করবে সেটার ওপরই নির্ভর করবে ভোটের ফল। আর সেই ভোটের ফল জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৪ঠা মে পর্যন্ত। সঙ্গে থাকুন India Hood-এর।

তবে আপনার কী মনে হয় – এই সমস্ত বিষয়ের ফায়দা লুটবে কোন দল? কোন দল করবে বাজিমাত? আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না কমেন্ট বক্সে।