India Hood Decode: তৃণমূল vs বিজেপি! কার ইস্তেহারে সত্যি লাভ হবে বাংলার?

Published:

TMC vs BJP Manifesto

এবার ১,৫০০ নয়,

৩,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার,

বেকার ভাতাও বেড়ে হবে ৩০০০ টাকা,

৫ বছরে হবে ১ কোটি চাকরি,

এবার বাংলা পাবে AIIMS, বাংলা পাবে IIT –

না এই কথাগুলো আমরা বলছি না, এই কথাগুলো বলছে বঙ্গ বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহার।

অন্যদিকে তৃনমূলের দাবী, বাংলা হবে ভারতের বৃহত্তম অর্থনীতি,

বাড়বে পুরোহিত, মুয়াজ্জিনদের ভাতা,

পিছিয়ে পড়া শ্রেণীদের হবে উন্নয়ন,

কৃষকদের জন্য বাজেট বেড়ে হবে ৩০,০০০ কোটি টাকা।

ভোট আসলেই এমন প্রতিশ্রুতির বন্যা দেখা যায় সর্বত্র! তবে কতটা পূরণ হয় সেটার কৈফেয়ত চায় না কেউই। আর এবারের ভোটেও তার অন্যথা হল না।

আজ India Hood ডিকোডে আমরা আলোচনা করবো পশ্চিমবঙ্গের দুই শীর্ষ দল তৃণমূল এবং বিজেপি-র ইস্তেহারের (TMC vs BJP Manifesto)! যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নারী, যুবসমাজ, শিল্প নিয়ে কে কী ঘোষণা করেছে? আর সেগুলো শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন – কোন দল আপনার এবং বাংলার জন্য বেশি লাভজনক!

তাই ধৈর্য ধরে ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন, আর দেখার পর অবশ্যই শেয়ার করুন। আর এখনও যদি চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব না করে থাকেন তাহলে ঝটপট ক্লিক করে ফেলুন সাবস্ক্রাইব বাটনে। আর টিপে দিন বেল আইকনটি।

তৃনমূল বনাম বিজেপি-র ইস্তেহার! | TMC vs BJP Manifesto

এবার একদিকে তৃনমূল প্রকাশ করেছে প্রায় ৭৬ পাতার ইস্তেহারপত্র, যেখানে রয়েছে মূলত ২১টি বিষয়। আর অন্যদিকে বিজেপি প্রকাশ করেছে মাত্র ১৩ পাতার ইস্তেহারপত্র, যেখানে রয়েছে ১৫টি বিষয়। তবে আমরা আজ শুধুমাত্র সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এখানে আলোচনা করেছি – যেগুলো আগামী ৫ বছরে বাংলার প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। আর সাথে তুলে ধরেছি, তৃণমূলের সেই সকল প্রতিশ্রুতির কথা যা তারা গত ৫ বছরে পূরণ করতে পারেনি!

১। নারীর ক্ষমতায়ন –

তৃণমূল এবার – নারীদের ভাতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে প্রতিটি জেলায় একটি করে কর্মজীবী মহিলাদের হোস্টেল করার আশ্বাস দিয়েছে। অপরাজিতা বিল বাস্তবায়ন থেকে রাত্তিরের সাথী অ্যাপকে আরও মজবুত ও কার্যকর করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বলা হয়েছে কর্মসংস্থান থেকে পিঙ্ক বুথ এবং শাইনিং টিম বাড়ানোর কথা।

বিজেপির তরফ থেকে বলা হয়েছে – মহিলাদের ভাতা ১,৫০০ থেকে বাড়িতে ৩,০০০ টাকা করা হবে। শুধু তাই নয়, ব্যবসার জন্য ৭৫ লক্ষ নারীকে “লাখপতি দিদি”-র সুবিধা দেওয়া হবে। নিরাপত্তার জন্য মহাকুমা পিছু মহিলা থানা, থানা পিছু নারী সহায়তা ডেস্ক, ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ এবং মাতঙ্গিনী হাজরা ও রানি শিরোমণির নামে দুটি বিশেষ মহিলা ব্যাটালিয়ন গঠনের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়াও, আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের গর্ভবতী মহিলাদের ২১,০০০ টাকা সহায়তা ও ৬টি পুষ্টি কিট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি রাজ্যের সমস্ত সরকারি চাকরিতে ৩৩% সংরক্ষণ দেওয়া হবে। বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করার ব্যবস্থা করা হবে, এবং প্রতিটি জেলায় কর্মজীবী মহিলাদের হোস্টেল তৈরি করা হবে।

এছাড়া অঙ্গনওয়াড়ি, আশা ও প্রাণী মিত্রা কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে। অবিবাহিত ছাত্রীদের স্নাতকে ভর্তির সময় ৫০,০০০ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। সাথে ৪০ বছরের নীচে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে HPV টিকা এবং ৪০ ঊর্ধ্ব মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষা চালুর কথা বলা হয়েছে। সঙ্গে নারীদের ওপর হওয়া অপরাধের ক্ষেত্রে পুরনো মামলা পুনরায় খোলা, দ্রুত বিচার, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

২। যুব সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধিঃ

তৃনমূলের তরফ থেকে এবার ভোটের আগে যুবসাথী প্রকল্প শুরু করে যুব সমাজকে নিজেদের দিকে টানার যে কাজ শুরু হয়েছিল, ইস্তেহারে সেটাকে আরও মজবুত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন ধরুন – বলা হয়েছে ১০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। সরকারি শূন্যপদ সুশৃঙ্খলভাবে পূরণ করার চেষ্টা করা হবে।

কিন্তু ২০২১-এর ইস্তেহারে তৃণমূল তিনটি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—‘যুবশক্তি’ প্রকল্পে প্রতি ৩ বছরে ১০,০০০ শিক্ষার্থীর ইন্টার্নশিপ, ২০২২-এর মধ্যে ১.১ লক্ষ সরকারি ও পুলিশ পদ পূরণ, এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ১০০ জনের জন্য ফ্রি IAS-IPS প্রস্তুতি।

তবে ৫ বছর কেটে গেলেও এই তিনটির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিজেপির দাবী – আগামী পাঁচ বছরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১ কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে এবং চাকরি খুঁজছেন এমন যুবক-যুবতীদের মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। ২০১৫ সাল থেকে নিয়োগে অনিয়ম ও পরীক্ষা বাতিলের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চাকরিতে ৫ বছর বয়সের ছাড় দেওয়া হবে। বিলুপ্ত স্থায়ী পদগুলি পুনরায় চালু করে স্বচ্ছভাবে দ্রুত নিয়োগ করা হবে। স্টার্টআপে উৎসাহ দিতে ৫ লক্ষ যুবককে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা—এর মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান ও ৫ লক্ষ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি একটি বিশ্বমানের ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়, এবং AVGC (অ্যানিমেশন, VFX, গেমিং, কমিকস) খাতে ১ লক্ষের বেশি যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা ছাত্রছাত্রীদের এককালীন ১৫,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তাও দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

৩। প্রশাসনিক সক্রিয়তা –

তৃনমূলের দাবী – সপ্তম পে কমিশন গঠন করা হবে, বকেয়া DA মেটানো হবে, রাজ্যে সাতটি নতুন জেলা গঠন করা হবে, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ করার লড়াই চলবে, পশ্চিমবঙ্গের ২৫টি প্রধান শহরকে মডেল শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

অন্যদিকে বিজেপির দাবী – ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম পে কমিশন গঠন করা হবে এবং বকেয়া DA মেটানো হবে। শুধু তাই নয় তৃণমূলের দুর্নীতির “শ্বেতপত্র” প্রকাশ করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। সবার জন্য এক নিয়ম অর্থাৎ UCC বাস্তবায়ন করা হবে। গবাদিপশু পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারে আসার ৮ মাসের মধ্যে সব দফতরের শুন্যপদ পূরণ করা হবে। কেন্দ্রের বিভিন্ন সুবিধা রাজ্যে বাস্তবায়িত করা হবে। ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইন বলবৎ করা হবে। কলকাতার সামগ্রিক উন্নয়ন করা হবে।

তবে, আপনাদের জানিয়ে দিই, আমাদের রাজ্যে ষষ্ঠ পে কমিশন গঠিত হয় ২০১৫ সালে, আর সেটা কার্যকর হয় ২০২০ সালে। এটা বলার একটাই কারণ যাতে আপনারা বুঝতে পারেন তৃনমূলের সপ্তম পে কমিশনের প্রতিশ্রুতি মেটাতে কতটা সময় লাগতে পারে। আর বিজেপি-র কথা অনুযায়ী তারা সরকারে আসার ৪৫ দিনের মধ্যেই তা চালু করবে।

৪। সামাজিক ন্যায় ও নিরাপত্তা –

তৃনমূলের দাবী – গিগ কর্মীদের বোর্ড গঠন করা হবে, পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের ৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে, দৈনন্দিন সমাজে ক্যুইয়ার এবং রূপান্তরকামী মানুষদের সহায়তা করা হবে, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া হবে। রয়েছে পথকুকুর ও বিড়ালদের জন্য মানবিক সমাধান নেওয়ার আশ্বাস।

যদিও এই মর্মে বিজেপি কোনও আশ্বাস দেয়নি।

৫। জাতীয় নিরাপত্তাঃ

বিজেপির দাবী – জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ব্যবহার করা হবে। সরকারে আসার ৪৫ দিনের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হবে।

যদিও তৃণমূল এই মর্মে কোনও আশ্বাস দেয়নি। বিজেপির অভিযোগ – তৃণমূল এতদিন জমি দেয়নি কাঁটাতার লাগানোর জন্য।

৬। অর্থনীতি –

তৃনমূলের দাবী – আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলা হবে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, আর ৫ বছরের মধ্যে হবে ৪০ লক্ষ কোটির অর্থনীতি।

কিন্তু, ইতিহাস বলছে – ২০২১ সালে তৃণমূল কথা দিয়েছিল বাংলাকে, ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি করার, ১২.৫ লক্ষ কোটি টাকার GSDP করার, এবং বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২.৫ লক্ষ টাকার বেশি হওয়ার।

তবে, ২০২৬ সালের রিপোর্ট বলছে – অর্থনীতির নিরিখে বাংলা ২০২১ সালেও ৬-এ ছিল, এখনও ৬-এই আছে। আর রাজ্যের GSDP ১৮.৫ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ যা কথা দিয়েছিল তার তুলনায় বেড়েছে অনেকটাই। তবে বার্ষিক মাথা পিছু আয় সেই হারে বাড়েনি, বেড়ে হয়েছে মাত্র ১.৮০ লক্ষ টাকা।

বিজেপির দাবী – অর্থনীতি নিয়ে তৃণমূলের মতো এত বড় বড় প্রতিশ্রুতি হয়তো বিজেপি দেয়নি, তবে তারা বলেছে ব্লু ইকোনমির কথা, MSME খাতে পর্যাপ্ত সুবিধার কথা, মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারা ব্যাক্তিদের ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করার কথা।

৭। তপশিলি জাতি, জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির কল্যাণঃ

তৃনমূলের দাবী – তপশিলি জাতি, জনজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণীদের জীবিকা ও সামাজিক উন্নয়ন করা হবে। কিষান ও মাহাতো সম্প্রদায়ের ST স্বীকৃতির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১০,০০০ পড়ুয়ার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ট্রেনিং ও হোস্টেল সম্প্রসারণ করা হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য উন্নয়ন পর্ষদ, ১০০% স্কলারশিপ এবং ব্লক ও পৌরসভা স্তরে সহায়তা সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি OBC শ্রেণিকরণ নিয়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিশেষ টাস্ক ফোর্সের আশ্বাস রয়েছে।

কিন্তু, এর আগে ২০২১-এর ইস্তেহারে ১০০টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, অলচিকি ভাষার জন্য ৫০০টি নতুন স্কুল ও ১,৫০০ পার্শ্ব শিক্ষক, সাদ্রী ও অন্যান্য ভাষার জন্য নতুন স্কুল, এবং ২০০টি রাজবংশী স্কুলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও—এর একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

তাহলে এবার নতুন প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

তবে এই খাতে বিজেপি আলাদা করে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবে কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে বিজেপির তরফ থেকে।

৮। চা শিল্পঃ

বিজেপির দাবীঃ পুরনো ও জরাজীর্ণ চা বাগান পুনরায় চালু করা হবে। উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল চা তৈরি করা হবে। জৈব ও পরিবেশবান্ধব চাষে জোর দেওয়া হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রম কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় আধুনিক চা গবেষণা ও ল্যাবরেটরি গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তবে এই নিয়ে তৃণমূল আলাদা করে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিন্তু চা শ্রমিকদের নূন্যতম আয় প্রতিদিন ৫০ টাকা করে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে তাদের ইস্তেহারে।

৯। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কল্যাণঃ

২০২১ সালের ইস্তেহারে তৃনমূলের এই বিষয়ে আলাদা কোনও অংশ ছিল না, তবে ২০২৬-এ তা যোগ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে – ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা করে সম্প্রদায়ের কল্যাণ করা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মসংস্থানমুখী কোর্স চালু করা, এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার ২৭টি ITI-তে সফট-স্কিল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে যুবকদের শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ বাড়ানো। পাশাপাশি তৈরি করা বিশেষ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

তবে এই খাতে বিজেপি আলাদা করে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

১০। মৎস্যচাষ ও ব্লু ইকোনমিঃ

গত ১ বছরে বারংবার বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে – তারা ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস নিষিদ্ধ করে দেবে। এবার তার জবাব পাওয়া গিয়েছে বিজেপির ইস্তেহারে। বিজেপির দাবী – জলাশয়গুলিকে অবৈধ দখল ও সিন্ডিকেটমুক্ত করা হবে। সব মৎস্যজীবীকে ‘প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা’-য় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং বাংলাকে মৎস্য রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি নোনা জলে মাছ চাষের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রসার করা হবে। উপকূলীয় জেলাগুলিতে মেরিন বায়োটেক রিসার্চ পার্ক, যুবকদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এবং উপকূলের মহিলাদের শামুক-ঝিনুক শিল্পে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তবে, তৃণমূল কিন্তু এই বিষয়ে আলাদা করে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

১১। আবাস ও এলাকার উন্নয়নঃ

তৃনমূলের দাবী – আগামী ৫ বছরে প্রতিটি পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি সুনিশ্চিত করা হবে, সামগ্রিক এলাকার উন্নয়ন করা হবে, এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হবে।

তবে, বিজেপি এই বিষয়ে আলাদা করে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

১২। কৃষি ও কৃষিকাজঃ

কৃষকদের জন্য তৃনমূলের প্রতিশ্রুতির তালিকাটা অনেকটাই লম্বা। যেমন – ৩০,০০০ কোটি টাকার কৃষি বাজেট, ক্ষেতমজুরদের বছরে ৪,০০০ টাকা সহায়তা, সেচের খরচ মুকুব, ধানের MSP ১৩১ টাকা বৃদ্ধি, ৫০টি হিমঘর, ২০২৭ পর্যন্ত গ্রিন টি-তে কর ছাড় এবং ডায়মন্ড হারবারে ইলিশ হাব।

কিন্তু, ২০২১-এর ইস্তেহারে বলা হয়েছিল – আগামী পাঁচ বছরে ফলনে ব্যবহৃত চাষজমিকে ৯৮%-এ নিয়ে যাওয়া হবে, এবং ফলনের দিক থেকে বাংলাকে ১ নম্বর করা হবে। কিন্তু, বাংলা এখনও তৃতীয় স্থানেই রয়েছে। অন্যদিকে মেগা/মিনি ফুড পার্ক গড়ার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি।

অন্যদিকে বিজেপির দাবী – কিষান সম্মান নিধির আওতায় বছরে ৯,০০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে, MSP বাড়ানো হবে, সারের কালোবাজারি বন্ধ করা হবে, জমি অধিগ্রহণে ৪ গুণ মূল্য ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্লকে আধুনিক হিমঘর এবং ব্যান্ডেল চিজ, গঙ্গারামপুরের ক্ষীর দই ও নবদ্বীপের লাল দইয়ের GI স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

১৪। শিল্প ও MSME শিল্পঃ

তৃনমূলের দাবী – শিল্পখাতে বাংলাকে লজিস্টিক হাব ও বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ৫ বছরে রপ্তানি দ্বিগুণ করা হবে, ২০৩০-এর মধ্যে ৩ লক্ষ কোম্পানি ও ১১,০০০ কারখানা, ৭ লক্ষ কর্মসংস্থান এবং নতুন জেমস-জুয়েলারি পার্ক গড়া হবে।

MSME খাতে ৫ বছরে ৬০ লক্ষ ইউনিট, ১৫০টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, এক্সপোর্ট হাব, পাটশিল্প পুনরুজ্জীবন ও “মেড ইন বেঙ্গল” ব্র্যান্ড তৈরির লক্ষ্য পূরণ করা হবে। বিশ্ববাংলাকে একটি প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসাবে গড়ে তোলা হবে।

কিন্তু, ২০২১ সালের ইস্তেহারে বলা হয়েছিল – ২০১৭-১৮ সালে বাংলায় বড় শিল্প ইউনিটের সংখ্যা যেখানে ৯,৫৩৪টি, তা আগামী ৫ বছরে ১২,০০০ ইউনিট করা হবে। কিন্তু, রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালে এই সংখ্যা হয়েছে মাত্র ১০,৫০০টি।

আর MSME খাতে ২০১৫-১৬ সালে বাংলায় ৮৮.৬৭ লক্ষ MSME ইউনিট ছিল। ২০২১ সালে তা প্রতি বছর ১০ লক্ষ করে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, ২০২৫ সালে বাংলার MSME ইউনিটের সমখ্যা বেড়েছে মাত্র ১.৩৩ লক্ষ। অর্থাৎ, বছরে ১০ লক্ষ কেন, ৫ বছরেও ১০ লক্ষ MSME ইউনিট বাড়াতে পারেনি সরকার। সেখানে এবার বছরে ১২ লক্ষ করে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে!

বিজেপির দাবী – বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে। সিন্ডিকেট রাজ শেষ করে দেওয়া হবে। সিঙ্গুরে বিজনেস পার্ক করা হবে। ৪টি নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অশোকনগর তেলখনি উন্নয়ন, চা-পাট শিল্প আধুনিকীকরণ, লজিস্টিক হাব, স্টিল প্ল্যান্ট ও উপকূলীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।

১৫। স্বাস্থ্যঃ

তৃনমূলের দাবী – প্রতিটি ব্লকে ন্যায্য মূল্যের ওষুধ দোকান, হাসপাতাল বৃদ্ধি, কিডনি ব্যাংক এবং বাংলাকে পূর্ব ভারতের মেডিকেল ভ্যালু ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

তবে, ২০২১-এ স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ, ২৩টি মেডিকেল কলেজ ও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডাক্তার-নার্সের আসন দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও—বরাদ্দ বাড়লেও অবকাঠামো ও আসন সেইভাবে বাড়েনি।

অন্যদিকে বিজেপি এলে ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর মাধ্যমে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হবে সাড়া ভারত জুড়ে। সাথে উত্তরবঙ্গে AIIMS, AYUSH ইনস্টিটিউট, ক্যান্সার হাসপাতাল এবং সুন্দরবন ও জঙ্গলমহলে আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে।

১৬। শিক্ষাঃ

গত কয়েক বছরে শিক্ষাখাত নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, ২০২৬-এর ইস্তেহারে তৃণমূল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে – উচ্চ মাধ্যমিকে AI ল্যাব, প্রতিটি ব্লকে মডেল স্কুল, শিক্ষায় ব্যয় GDP-র ৪.৫% করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্কিল ট্রেনিং চালু হবে।

তবে রিপোর্ট বলছে বাংলায় শিক্ষার অবস্থা তৃনমূলের আমলে অনেকটাই খারাপ হয়েছে। আর তার উদাহরণ – শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি ও চাকরি বাতিল। ২০২৩ থেকে ২০২৪, মাত্র এক বছরে সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৪%। রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে প্রায় ৩.লক্ষ শিক্ষক পদ  আজ শূন্য এবং কয়েক হাজার স্কুলে রয়েছে মাত্র ১ থেকে ২ জন শিক্ষক। গত ১০ বছরে বন্ধ হয়েছে প্রায় ৭,০১৮টি সরকারি প্রাথমিক স্কুল। শুধু তাই নয় ২০২১-এর একাধিক প্রতিশ্রুতি, যেমন – মডেল আবাসিক স্কুল, শিক্ষক সংখ্যা দ্বিগুণ, ২৭৮ ITI-তে স্মার্ট ক্লাস ও ডিজিটাল শিক্ষাও বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্যদিকে বিজেপির দাবী – প্রতি ৫০ জন ছাত্র পিছু ১ জন করে শিক্ষক সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। আধুনিক ল্যাব-লাইব্রেরি-খেলার মাঠ সহ স্কুল উন্নয়ন, মিড-ডে মিল ও ইউনিফর্মের মানোন্নয়ন এবং ‘স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’ দেওয়া হবে। পাশাপাশি STEM শিক্ষা ও ‘অটল টিঙ্কারিং ল্যাব’, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করা এবং উত্তরবঙ্গে IIT-IIM-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস গড়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

আপনি যদি এখনও পর্যন্ত এই ভিডিওটি দেখছেন, তার মানে আপনি একজন দায়িত্ববান এবং শিক্ষিত নাগরিক। আর এতক্ষণ ধরে দুই দলের ইস্তেহার শোনার পর কোন দলকে আপনি বাংলার গদিতে দেখতে চান? কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত।