৯২ বছরের মাকে অমর রাখতে ৬.৫ লাখ বৃক্ষ রোপণ, অসাধ্য সাধন অভিনেতা সায়াজী শিন্ডের

Published:

Sayaji Shinde

সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: গভীর ভালোবাসা থেকে অনেক সময় হারানোর ভয় জন্মায়। তবে সেই ভয়কে যদি মহৎ কোন উদ্দেশ্যে পরিণত করা যায় তাহলে কেমন হয়? আসলে এরকমই এক নজির সৃষ্টি করলেন জনপ্রিয় অভিনেতা সায়াজী শিন্ডে (Sayaji Shinde)। ‘শূল’, ‘সরকার রাজ’ এর মতো ব্লকবাস্টার ছবিতে অভিনয় করে নাম কামিয়েছেন তিনি। কিন্তু রুপোলি পর্দার জৌলুসের বাইরে গিয়ে জীবনের সবথেকে বড় পরিচয় তাঁর—তিনি একজন বৃক্ষপ্রেমী। নিজের ৯২ বছর বয়সী মাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখার জন্য মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার গ্রামকে নতুন জীবন দিয়েছেন তিনি। একাই লাগিয়ে ফেলেছেন ৬.৫ লক্ষের বেশি গাছ।

সেচ দপ্তরের ওয়াচম্যান থেকেই অভিনেতা এবং বৃক্ষপ্রেমী

আসলে মহারাষ্ট্রে সাতারা জেলার এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। খুব কাছ থেকেই দারিদ্র্যতা এবং জীবন সংগ্রাম দেখেছেন। ১৯৭৮ সালে একটি বাঁধ প্রকল্পের জন্য তাঁদের পৈতৃক জমি অধিগ্রহণ করে নিয়েছিল সরকার। ক্ষতিপূরণ হিসেবে সেচ দফতরের পাহারাদারের চাকরি দেওয়া হয় সায়াজীকে। আর যে বিকল্প জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা পেতে তাঁদের দীর্ঘ ৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ২০২২ সালে সেই জমি হাতে পান তাঁরা। তিনি বলেন, “সরকার সেই সময় সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে আমাদের জমি কেড়ে নিয়ে তার বদলে জমি দেওয়া হয় ২০২২ সালে। তবে এই বঞ্চনা আমাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।”

এদিকে ২০১৬ সালে মহারাষ্ট্র দেখা যায় এক ভয়াবহ খরা পরিস্থিতি। তিনি বলেন, পুনেতে একবার একজন ধনী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি নিজের শত কোটি টাকার সম্পত্তির বড়াই করেছিলেন।” তবে তাঁর মনে হয়েছিল, যে সম্পত্তি মানুষের তীব্র জলের কষ্ট এবং হাহাকার দূর করতে পারে না, সেই প্রাচুর্যের কোনও মূল্য নেই। এর কিছুদিন পরেই খরা কবলিত এক গ্রামে ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম অভিনেতা। সেখানে তিনি দেখেন যে, তীব্র রোদের মধ্যেও এক বিশাল খোলা মাঠে গ্রামবাসীরা সভার আয়োজন করেছেন। তবে রোদ থেকে বাঁচার জন্য আশেপাশে একটাও গাছ নেই। তখনই তাঁর মাথায় খেলে যায় আসল বুদ্ধি। তিনি ভাবেন, এই সমস্ত ধুঁকতে থাকো গ্রামগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আগে গাছ লাগানো দরকার।

এই ভেবে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হায়দ্রাবাদ থেকে আনুমানিক ১ লক্ষ টাকা খরচ করে দুই ট্রাক গাছের চারা নিয়ে আসেন তিনি। আর একইসঙ্গে তিনি প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য দেবরাই এর ধারণা পুনরজ্জীবিত করার কাজে নেমে পড়েন, এবং জন্ম দেন সহ্যাদ্রি দেবরাই আন্দোলনের। তবে এই বিশাল সবুজ আন্দোলনের পেছনে লুকিয়ে ছিল তাঁর মায়ের প্রতি অবিচ্ছেদ্য টান। ২০১৬ সালে সায়াজীর মায়ের বয়স ৯২ বছর। মাকে হারানোর ভয় তাঁর প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়াত।

আরও পড়ুন: গরম থেকে স্বস্তি! শনি থেকেই দক্ষিণবঙ্গে শুরু ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডব, আগামীকালের আবহাওয়া

তিনি বলেছেন, “আমি জানতাম মাকে আমি আজীবন আমার কাছে রাখতে পারব না। উনার বয়স তখন ৯২। আর এই পৃথিবীতে আমি উনাকেই সবথেকে বেশি ভালোবাসতাম। একদিন মায়ের পাশে বসে উনার হাত ধরে আমার অসহায়তার কথা জানালাম। বললাম, মৃত্যুকে আটকানোর ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমি তোমাকে অন্যভাবেই অমর রাখবো। আমি তোমাকে বীজের ওজনে ওজন করব। আর সেই বীজগুলি গোটা মহারাষ্ট্রের বুকে ছড়িয়ে দেব। একদিন যখন সেই বীজ থেকে চারাগাছ হবে আর ফুল ফুটবে, তখন সেই ফুলের সুবাসে তোমার অস্তিত্ব অনুভব করব। সেই কারণে আজ মহারাষ্ট্রের প্রায় ৪৮টি আলাদা আলাদা অনুর্বর অঞ্চলে ঘন অরণ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। আর নিজের হাতেই পুঁতেছেন সাড়ে ৬ লক্ষের বেশি গাছ।