অনন্যা সরকার, কলকাতা: সভ্যতার সূচনা হয়েছিল মেসোপটেমিয়ায় (Oldest civilization) – দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশের ঐতিহাসিকরা এই তত্ত্বের ওপরই জোর দিয়ে আসছেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দ নাগাদ বর্তমানের ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর উপত্যকায় গড়ে ওঠে এই সভ্যতা। তবে এখন নিক কলিন্স নামে এক সামুদ্রিক ঐতিহাসিক (Maritime Historian) এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব সন্ধান ও যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন যে সভ্যতার সূচনা মেসোপটেমিয়ায় নয়, এর উৎপত্তি হয়েছিল ভারতেই (Indian Civilization)। তার এই দাবি এখন ঐতিহাসিক জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ইতিহাসবিদের দাবি ভারতেই গড়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম মানব সভ্যতা
সামুদ্রিক ইতিহাসবিদ নিক কলিন্স সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মেসোপটেমিয়া কখনোই সভ্যতার আঁতুড়ঘর ছিল না। ভারতই ছিল। তিনি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সেই ঐতিহাসিক ধারণাটির দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। নিক কলিন্স একটি বিস্তৃত সাবস্ট্যাক কলামে তাঁর এই দাবিটিকে বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন। সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতায় শত শত বসতি ছিল, যেখানে একই আকার ও ওজনের ইট, স্নানাগার, গ্রিড-প্যাটার্নের রাস্তা, একটি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ঢাকা দেওয়া নিকাশি ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিদ্যমান ছিল।
Mesopotamia was never the cradle of civilisation. India was.
I spent forty years in international shipping, not academia. When I began researching the history of maritime trade, I had no orthodoxy to defend. I followed the evidence, and it kept arriving in the same place: the… pic.twitter.com/qAhG3CTuXK
— Nick Collins (@nickcollins1953) July 21, 2026
আরও পড়ুন: প্রবীণরা পাবে বছরে ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসা সুবিধা, চালু হল আয়ুষ্মান বয়ো বন্দনা কার্ড
কলিন্সের তত্ত্বের একটি মূল অংশ হল গুজরাটের লোথাল অঞ্চল। তাঁর দাবি, সেখানকার বিশাল ইটের তৈরি জলাধারটি আসলে একটি উন্নত ডকইয়ার্ড (Dockyard) বা বন্দর ছিল, যেখানে কয়েক ডজন বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করতে পারত। যদিও কিছু প্রাথমিক ব্যাখ্যায় এটিকে একটি স্নানাগার বা জলের ট্যাঙ্ক বলে উল্লেখ করা হয়। কলিন্স মনে করেন, এই ধারণাটি একটি গভীরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট মানসিকতার প্রকাশ। প্রাচীন ভারতে এমন একটি উন্নত সামুদ্রিক ব্যবস্থা থাকতে পারে, তা পশ্চিমী দেশের ইতিহাসবিদদের গতানুগতিক ধারণার সাথে খাপ খায়নি। তিনি বলেছেন, ৪০০০ বছর ধরে ইউরোপে এর মতো কিছুই ছিল না।
১৯৫৪ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এস. আর. রাও (S. R. Rao) গুজরাটের লোথালে বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দরটি আবিষ্কার করেন। এটি শহরটিকে সিন্ধু ও সৌরাষ্ট্র উপদ্বীপের হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলির মধ্যে বাণিজ্য পথের ওপর অবস্থিত প্রাচীন সবরমতী নদীর সাথে সংযুক্ত করেছিল। প্রাচীনকালে এই পথ দিয়ে মেসোপটেমিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার সাথে মুক্তো ও অলংকারের ব্যবসা চলতো।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মানব সভ্যতার সূচনা হয় মেসোপটেমিয়ায়, এরপর একে একে আসে মিশর, গ্রিস এবং রোম। ভারতের আবির্ভাব হয় অনেক পরে। প্রায়শই ভারতকে এমন একটি স্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে অন্যান্য দেশ থেকে মানুষ, ভাষা এবং ধারণা এসে পৌঁছেছিল, নিজে থেকে কিছু গড়ে ওঠেনি। নিক কলিন্স মনে করেন, ঐতিহাসিক প্রমাণ এর বিপরীত দিকেই ইঙ্গিত করে।
আরও পড়ুন: বকেয়া DA-এর পুরোটা দেবে না সরকার, ১৫% মকুব করার আর্জি সুপ্রিম কোর্টে
কলিন্স যুক্তি দিয়েছেন, মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হয়ে উঠেছিল, কারণ ইউরোপের প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম সেখানে খননকার্য চালিয়েছিলেন। এছাড়া, বাইবেল এবং ধ্রুপদী গ্রন্থগুলোও এই অঞ্চলের প্রতি পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অটোমান কর্তৃপক্ষও ইউরোপীয়দের খননকার্য চালানোর অনুমতি দেয়। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ভারত একই রকম মনোযোগ কখনই পায়নি। উনিশ শতকে হরপ্পা আবিষ্কৃত হয়, কিন্তু এর যথাযথ অনুসন্ধান করতেই কয়েক দশক সময় লেগে যায়। মহেঞ্জো-দারো আবিষ্কৃত হয় ১৯২২ সালে। নিক কলিন্স বলেন, ততদিনে মেসোপটেমিয়াই প্রথম সভ্যতা, এই দাবিটি একটি ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয়ে যায়। ইতিহাসবিদ লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ভারতেই বিদ্যমান ছিল।










