আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: গোটা পৃথিবীর কাছে ভারত হলো মসলার রাজা। মসলার গন্ধে ছেয়ে থাকে এই দেশের প্রতিটি রান্নাঘর। হলুদ, আদা, ধনে, জিরে থেকে শুরু করে কাঁচালঙ্কা কিংবা রসুন, রান্নার স্বাদ ও গন্ধ বাড়াতে এগুলির গুরুত্ব এক কথায় অনস্বীকার্য। চিন্তার বিষয় হল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসলার দামও আকাশ ছুঁয়েছে। তবে চাইলেই ঘরোয়া পদ্ধতিতে বাড়িতেই ফলানো (Spices Farming) যায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় এই মসলার গাছ। এতে কেনার খরচও বাঁচে আর ভেজাল মুক্ত মসলাও পাওয়া যায়। বেশ কয়েক ধরনের মসলা গাছ বা গাছের অংশ থেকেই নতুন গাছ ফলানো সম্ভব। বারান্দা, ছাদ কিংবা ছোট বাগানেও স্বচ্ছন্দে এই গাছগুলি লাগানো যায়। মাটি, রোদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জল দেওয়ার বিষয়টি খেয়াল রাখলেই বাড়ির বাগান থেকেই মিলতে পারে রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় মসলা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই মসলা বিক্রি করে আপনি প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা আয় করতে পারবেন।
হলুদ
হলুদ বাড়িতে ফলানো সব থেকে সহজ। এর জন্য বীজের বদলে কাঁচা হলুদের গাঁট ব্যবহার করা যায়। একটি উপযুক্ত আকারের টবে মাটি তৈরি করে তার মধ্যে হলুদের গাঁট বসিয়ে দিতে হবে। টবটি এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলো পৌঁছয়। মাটি একেবারে শুকিয়ে গেলে চলবে না, আবার অতিরিক্ত জলও দেওয়া যাবে না। নিয়মিত পরিচর্যা করলে ধীরে ধীরে হলুদের গাছ বেড়ে উঠবে।
আদা
রান্নাঘরের আদার একটি সুস্থ টুকরো থেকেও নতুন গাছ তৈরি করা সম্ভব। আদার টুকরোটি মাটির মধ্যে বসিয়ে হালকা জল দিতে হবে। উষ্ণ আবহাওয়া আদা গাছের বৃদ্ধির জন্য উপযোগী। তবে এটি কিন্তু দ্রুত ফলন পাওয়ার মতো মসলা নয়। মাটির নিচে আদা তৈরি হতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তাই গাছ লাগানোর পর নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি ধৈর্য ধরে অপেক্ষাও করতে হবে।
জিরে
জিরে চাষ করতে চাইলে খুব ছোট পাত্রের বদলে প্রায় ১০ ইঞ্চি আকারের টব নেওয়াই ভালো। কোকোপিট, বালি এবং জৈব কম্পোস্ট মেশানো মাটি গাছের জন্য ভীষণ উপযুক্ত। সেই মিশ্রণে জিরের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে অল্প জল দিতে হবে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জায়গায় টব রাখলে গাছ বেড়ে উঠবে।
ধনে
বাড়ির ছোট জায়গায় ধনে ফলানো তুলনামূলক সহজ। এর জন্য খুব গভীর টবের চেয়ে চওড়া পাত্র ব্যবহার করা সুবিধাজনক। সেখানে ধনের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে মাটি সামান্য ভেজা রাখতে হবে। পর্যাপ্ত আলো পাওয়া যায় এমন জায়গায় পাত্রটি রাখলে কিছুদিনের মধ্যেই ছোট সবুজ চারা দেখা যাবে। পরে সেই তাজা ধনেপাতা রান্না, চাটনি কিংবা অন্যান্য খাবারে ব্যবহার করা যাবে।
মৌরি
বাড়ির টবেও মৌরির গাছ চাষ করা যায়। মাটির সঙ্গে কোকোপিট, বালি এবং জৈব সার মিশিয়ে পাত্র প্রস্তুত করতে হবে। এরপর মৌরির বীজ মাটিতে দিয়ে অল্প জল দিতে হবে। গাছটির জন্য আলোযুক্ত জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি। মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখলে ধীরে ধীরে গাছ বেড়ে উঠতে পারে।
কাঁচালঙ্কা
কাঁচালঙ্কার ক্ষেত্রে বীজ বাপন করার পাশাপাশি নার্সারি থেকে ছোট গাছ কিনেও টবে বসানো যায়। গাছ বসানোর পর এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে ভালো পরিমাণে রোদ আসে। নিয়মিত জল দেওয়া, মাটির অবস্থা দেখা এবং প্রয়োজনমতো পরিচর্যা করলে গাছে ধীরে ধীরে ফলন দেখা যাবে। ফলে রান্নার সময় প্রয়োজনীয় কাঁচালঙ্কা হাতের কাছেই পাওয়া যাবে।
তেজপাতা
তেজপাতার গাছ অন্য কয়েকটি মসলা গাছের তুলনায় বেশি জায়গা নেয়। তাই এটি লাগানোর জন্য অপেক্ষাকৃত বড় টব বেছে নেওয়া ভালো। পর্যাপ্ত মাটি দিয়ে গাছ বসানোর পর এমন জায়গায় রাখা উচিত যেখানে ভালোভাবে সূর্যের আলো পৌঁছয়। সময় নিয়ে গাছটি বড় হলে তার পাতা রান্নায় ব্যবহার করা যায়। তবে ছোট টবে লাগিয়ে দীর্ঘদিন রাখার বদলে গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে জায়গার বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার।
রসুন
রসুনের কোয়া থেকেই বাড়িতে সবুজ রসুনের পাতা তৈরি করা যায়। একটি চওড়া ট্রে বা কন্টেনারে মাটি নিয়ে সেখানে রসুনের কোয়াগুলি বসিয়ে দিতে হবে। অল্প জল এবং উপযুক্ত আলো পেলে সেখান থেকে সবুজ পাতা বেরোতে শুরু করবে। এই কচি পাতাগুলি রান্না, চাটনি কিংবা বিভিন্ন পদে ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে যাঁদের বড় বাগান নেই, তাঁদের জন্য ট্রে বা চওড়া পাত্রে এই পদ্ধতিটি বেশ সুবিধাজনক।
আরও পড়ুন: প্রাক্তন খেলোয়াড়দের মাসে ১০,০০০ টাকা দেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কারা যোগ্য নন?
মসলা গাছের পরিচর্যার সময় কী কী মনে রাখবেন?
বাড়িতে মসলা ফলানোর ক্ষেত্রে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, তার নিয়মিত পরিচর্যাও প্রয়োজন। টবের নিচে জল বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত জল জমে থাকলে গাছের ক্ষতি হতে পারে। কোন গাছের কতটা জল এবং আলো প্রয়োজন, সেটিও আলাদা করে খেয়াল রাখতে হবে। ভালো মানের মাটি ও প্রয়োজনমতো জৈব সার ব্যবহার করলে গাছের বৃদ্ধিও ভালোভাবে হবে। অল্প জায়গা হলেও পরিকল্পনা করে টব সাজালে বারান্দা, ছাদ কিংবা বাড়ির ছোট্ট অংশেই তৈরি করা সম্ভব মসলার নিজস্ব বাগান।










