সহেলি মিত্র, কলকাতা: ভারতীয় রেলের (Indian Railways) ইতিহাস দীর্ঘ। এক জীবনে এ সম্পর্কে জানা খুবই মুশকিল বিষয়। এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রেলের রূপ বদলেছে যেমন, তেমনই বদলেছে কাজের প্যাটার্ন। এখন ভারতীয় রেল নেটওয়ার্ককে বিশ্বের বহু নামী দেশের রেল ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে আপনি কি জানেন ভারতের প্রথম ট্রেন (India’s First Train) কবে এবং কোথা থেকে কোন রুটে চলাচল করে? আজকের এই আর্টিকেলে সেই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হবে।
দেশে প্রথম ট্রেন চলেছিল কোথায়?
ভারতীয় রেল বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ক। ভারতীয় রেলের একটি ট্রেনে একটি ইঞ্জিন এবং ২২ থেকে ২৪টি কোচ থাকে, যা ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিতে চলে। তবে, ১৮৫৩ সালে যখন রেল পরিষেবা শুরু হয়েছিল, তখন মাত্র ১৪টি কোচের একটি ট্রেন চালানোর জন্য তিনটি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো। মাত্র ৪০০ জন ভাগ্যবান যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন আজ থেকে ১৭৩ বছর আগে। শুনে আকাশ থেকে পড়লেন তো? কিন্তু এটাই সত্যি।
গত ১৬ এপ্রিল ছিল ভারতীয় রেলের জন্মদিন। ১৭৩ বছর আগে এই দিনে প্রথম ট্রেন চলেছিল। জন্মদিন এই অর্থে যে, ১৮৫৩ সালের এই দিনে ভারতে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চলেছিল। এই ট্রেনটি তৎকালীন বোম্বে (এখন মুম্বাই)-এর বোরি বন্দর এবং থানের মধ্যে চলেছিল। সেই সময়, মাত্র ১৪টি কোচের এই ট্রেনটিকে টানার জন্য তিনটি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো। এতে ৪০০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছিলেন প্রথমবার।
রেলওয়ের নথি অনুসারে, ভারতের প্রথম ট্রেনটি ১৮৫৩ সালের ১৬ই এপ্রিল, বিকেল ৩:৩৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে। এটি তৎকালীন বোম্বের বোরি বন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়েছিল। দেশের প্রথম ট্রেনটি পরিচালনা করেছিল গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলা রেলওয়ে, যা ছিল ভারতের প্রথম রেল সংস্থা। এর গন্তব্য ছিল ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত থানে। সেই সময়ে ভারতে চালু হওয়া প্রথম ট্রেনের তাৎপর্য কতটা ছিল তা বোঝা যায় একটি ঘটনায়। জানলে অবাক হবেন, ট্রেনটি ছাড়ার সময় এটিকে ২১ তোপধ্বনি দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছিল। বোরিবন্দর ও থানের মধ্যে চলাচলকারী প্রথম ট্রেনটিতে মাত্র ১৪টি কোচ ছিল। তবে, এটি সাহিব, সিন্ধু এবং সুলতান এই তিনটি ইঞ্জিন দ্বারা চালিত হতো। দেশের প্রথম ট্রেনটি ৩৪ কিলোমিটারের এই যাত্রা ৭০ মিনিটে সম্পন্ন করেছিল। বিকেল ৩:৩৫ মিনিটে বোরিবন্দর থেকে ছেড়ে ট্রেনটি বিকেল ৪:৪৫ মিনিটে থানে পৌঁছায়। যদিও প্রশ্ন ওঠে, কেন এর শুরুটা বোম্বে থেকে হয়েছিল? সাধারণত মনে করা হয় যে, প্রথম ট্রেনটি ব্রিটিশ রাজের রাজধানী ক্যালকাটা (বর্তমান কলকাতা) থেকে যাত্রা শুরু করার কথা ছিল।
কলকাতায় প্রথম ট্রেনটি চলেনি কেন?
কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন সেখান থেকে চালু হয়নি এর পেছনে ছিল একাধিক দুর্ঘটনা ও প্রশাসনিক জটিলতা। কলকাতায় প্রথম ট্রেন চালু হয় ১৮৫৪ সালের ১৫ আগস্ট, হাওড়া থেকে হুগলী রুটে। দেরির প্রধান কারণ ছিল ব্রিটেন থেকে ইঞ্জিন বহনকারী জাহাজের পথ হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে যাওয়া, স্যান্ডহেডস এলাকায় জাহাজডুবি, এবং চন্দননগরে ফরাসি শাসনের কারণে অনুমতির জটিলতা।
তবে পরিকল্পনার দিক থেকে কলকাতা এগিয়েই ছিল। ১৮৪০-এর দশকেই দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং রোল্যান্ড ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন কলকাতা থেকে রানিগঞ্জের কয়লাখনি পর্যন্ত রেলপথের পরিকল্পনা করেন। সব মিলিয়ে, অবকাঠামোগত ও লজিস্টিক সমস্যার কারণেই কলকাতা প্রথম ট্রেন চালানোর সুযোগ হারায়, আর বোম্বে ইতিহাসে সেই কৃতিত্ব অর্জন করে।
আরও পড়ুনঃ চলবে ৪ মাস, কলকাতা-ঋষিকেশ স্পেশাল ট্রেন দিল রেল, জানুন রুট ও ভাড়া
ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ফ্যান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, সেই ট্রেনের কোচগুলি কাঠের তৈরি ছিল। আজকের ট্রেনের কোচের সাথে তুলনা করলে, সেগুলিকে দেশলাই বাক্সের মতো দেখাত। তবুও, সেই সময়টা ছিল অন্যরকম। উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ৩৪ কিলোমিটার যাত্রাপথে এই ট্রেনটি দুটি স্টেশনে থামত। বোরি বন্দর স্টেশন ছেড়ে ৮ কিলোমিটার যাওয়ার পর ট্রেনটি বাইকুল্লায় থামত। এখানে এর ইঞ্জিনে জল ভরা হত। তারপর সেখান থেকে ছেড়ে সিয়নে কিছুক্ষণের জন্য থামত। এখনকার দিনে ট্রেনগুলি মধ্যবর্তী স্টেশনগুলিতে দুই থেকে পাঁচ মিনিটের জন্য থামে। কিন্তু সেই সময়ে এটি দুটি মধ্যবর্তী স্টেশনে ১৫ মিনিট করে থামত।










