অনন্যা সরকার, কলকাতা: উত্তরপ্রদেশের ঔরাইয়ার বাসিন্দা গোবিন্দ যাদব নিজের জেলার ঐতিহ্যবাহী পরিচয় সারা দেশের সামনে তুলে ধরার জন্য সফল ব্র্যান্ড বানিয়ে আজ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন (Success Story)। আইআইএম (IIM)-এর এই প্রাক্তন ছাত্র ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে ২০২২ সালে ‘অকল্পম’ (Akalpam) নামে একটি ব্র্যান্ড চালু করেন। আজ এটি একটি সফল ওডিওপি (One District One Price) সার্টিফায়েড খাঁটি দেশি ঘি-এর ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। তার ব্র্যান্ডের বার্ষিক আয় এখন ৪৩ কোটি টাকা। চলুন তাহলে গোবিন্দ যাদবের সাফল্যের কাহিনী (Success Story of Govind Yadav) সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
শৈশবের দুগ্ধ খামার থেকে ডেয়ারি ব্র্যান্ডের যাত্রা
গোবিন্দ যাদব উত্তরপ্রদেশের ঔরাইয়া জেলার বেলা গ্রামের বাসিন্দা। তার শৈশব কেটেছে পশুপালন, ডেয়ারি ফার্ম, খাঁটি ঘি তৈরি দেখে। তিনি ছোট থেকে খাঁটি দুগ্ধজাত পণ্যের স্বাদ ও গন্ধ চিনে নিতে পারতেন অনায়াসেই। স্কুলজীবন শেষ করে গোবিন্দ আইআইএম কাশিপুর থেকে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি আইআইএম আহমেদাবাদ থেকে ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টে এক্সিকিউটিভ প্রোগ্রাম শেষ করেন।
পড়াশোনা শেষ করে গোবিন্দ কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দেন। সেই কোম্পানিতে ফুড টেস্টিং, ফুড এক্সপোর্ট, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং লজিস্টিকস নিয়ে কাজ হতো। চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখেছেন কীভাবে একটি সুসংগঠিত ব্যবসা কাজ করে এবং কীভাবে প্রোডাক্ট স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে হয়।
যখন গোবিন্দ কর্মসূত্রে শহরে থাকতে শুরু করেন, তখন তিনি একটি জিনিস লক্ষ্য করেন যে, বাজারে “প্রিমিয়াম” বা “ঐতিহ্যবাহী বিলোনা” লেবেলের সাথে বিক্রি হওয়া ঘি আসলে সেই ঘিয়ের মতো নয়, যা তিনি গ্রামে থাকাকালীন খেতেন। বড় ব্র্যান্ডগুলো কেবল স্পিড, প্যাকেজিং এবং খরচ কমানোর ওপর মনোযোগ দেয়, প্রোডাক্ট ও স্বচ্ছতার ওপর নয়। এখানে একটি বড় শূন্যস্থান অনুভব করেন গোবিন্দ। তাই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক লেবেলের সাথে খাঁটি ঘি পৌঁছে দিতে ২০২২ সালে তার ব্র্যান্ড ‘অকল্পম’ চালু করেন। তিনি প্রথমে তার জেলার স্থানীয় কৃষকদের সাথে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেন। মার্কেটিং নয়, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশুদ্ধতা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া।
গোবিন্দ যখন শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসে ব্যবসা শুরু করেন, তখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঐতিহ্যবাহী বিলোনা পদ্ধতি পরিবর্তন না করে প্রতিটি ব্যাচের ঘিতে একই রকম স্বাদ এবং দানাদার টেক্সচার বজায় রাখা। এর জন্য গোবিন্দর টিম দই জমার তাপমাত্রা এবং মন্থনের সময়ের তারতম্য রেকর্ড করতে শুরু করে এবং প্রতিটি ব্যাচের আকার ছোট রাখে। গোবিন্দ ব্র্যান্ডের ইউএসপি (USP) এর দুধ সংগ্রহের মডেল। কোম্পানিটি কোনো বড় দুগ্ধ ব্যবসায়ী সংস্থার কাছ থেকে দুধ কেনে না। তার বদলে ঔরাইয়া জেলার নির্বাচিত কিছু স্থানীয় কৃষক এবং গোশালা থেকে সরাসরি দুধ আসে ফ্যাক্টরিতে। প্রতি লিটার দুধ শুধুমাত্র ঔরাইয়া জেলা থেকেই আসে। এর ফলে ভৌগোলিক এবং জলবায়ুগত সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং ঘিয়ের স্বাদও একরকম থাকে।
কোনো রকম শর্টকাট না নিয়েই গোবিন্দের ব্র্যান্ডটি ভারতীয় বাজারে ইতিমধ্যেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে, অকল্পম ঘিয়ের ৫০,০০০-এরও বেশি সন্তুষ্ট গ্রাহক রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, এর মাসিক সেলের ৭০% আসে লংটার্ম কাস্টমারদের কাছ থেকে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে কোম্পানিটির আয় ছিল ৯ কোটি টাকা, যা এখন ২০২৫-২৬ সালে ৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আরও পড়ুনঃ মহিলাদের ৫০% ছাড়, শুরু হল কলকাতা-পুরী এসি বাস, জানুন রুট ও সময়সূচি
আগামী দিনে, কোম্পানিটি এ২ (A2) দই, সাদা মাখন এবং ঘোল-এর মতো প্রোডাক্ট বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও, আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে গোবিন্দ যাদব তার কোম্পানিকে এনআরআই (NRI) মার্কেট এবং আয়ুর্বেদিক পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রবেশ করানোর কথা চিন্তা ভাবনা করছেন।










