পরিচিতরা বলেছিল দিনমজুর হতে, বাস ড্রাইভারের ছেলে UPSC ক্র্যাক করে আজ IAS

Published:

UPSC Success Story of IAS Moin Ansari

অনন্যা সরকার, কলকাতা: সৎ চেষ্টা কখনও বিফল হয় না। যখন আশেপাশের সবাই আশা ছেড়ে দিতে বলা, তখনও নিজের ওপর পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রেখে এগিয়ে গেলে সফলতা আসবেই। ঠিক এমনটাই ঘটেছে মঈন আনসারির (UPSC Success Story of Moin Ansari) জীবনেও। বাবা পেশায় একজন বাসচালক, কিন্তু মঈনের স্বপ্ন দেখেছিল সে সিভিল সার্ভিসে (Civil Service) যোগ দেবে এবং তিনি তার জন্য নিষ্ঠার সাথে প্রস্তুতিও শুরু করেন। প্রথমদিকের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে চেনা পরিচিতরা তাঁকে কায়িক শ্রমের কাজে যোগদান করতে বলে। তবে, সমাজের সব কটূক্তি ও প্রতিকূলতার মাঝেও মঈন পড়াশোনাকেই তাঁর হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। জিতবেন বলে দৃঢ় সংকল্প করেন এবং তার ফলও পান হাতেনাতে। ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজ তিনি একজন আইএএস (IAS) অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আসুন তাঁর এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক। 

ইউপিএসসি-তে উত্তীর্ণ হওয়ার সংগ্রামময় যাত্রা 

উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার জাতপুরা গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা মইন আনসারির। তাঁরা বাবা ছিলেন একজন চুক্তিভিত্তিক বাস চালক। তাঁর আয় নির্দিষ্ট ছিল না এবং পরিবারের সাতজন সদস্যের ভরণপোষণের পর মঈনের পড়াশোনার খরচ চালানো তাঁর বাবার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি, একসময় স্কুলের বেতন দিতে না পারায়, তাঁকে গ্রামের একটি স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাবার এই জীবনসংগ্রাম এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখে মঈন জীবনে বড় কিছু করার সংকল্প করেন।

আরও পড়ুন: LLB-এর পর UPSC ক্র্যাক, গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবারের মেয়ে আজ আইএএস অফিসার

দ্বাদশ শ্রেণিতে ভালো ফলাফল করতে পারেননি মঈন, তাই তাঁকে অনেক কটাক্ষও শুনতে হয়। তবে তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পরিবারে আর্থিক অনটনের মধ্যেও, তিনি পদার্থবিজ্ঞান, গণিত এবং রসায়নের জন্য গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর বাবা রাজি না হলেও, তাঁর মা নিজের জমানো টাকা দিয়ে ছেলেকে পড়িয়েছিলেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য, মইন দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন, যা তাঁকে সামান্য হলেও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। 

পড়াশোনা শেষ করে মঈন ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন। তিনি মোরাদাবাদের সরকারি স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণের জন্য নাম লেখান এবং প্রতিদিন কোচিং ক্লাস করার জন্য ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার যাতায়াত করতেন। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে দামী প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, ক্রিকেট কিট বা একটি ভালো জুতো কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরে রোজগারের জন্য মঈন তাঁর গ্রামে একটি সাইবার ক্যাফেও খুলেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন ক্রিকেটার হওয়ার পথ তার জন্য সহজ নয়। এই সময়েই সিভিল সার্ভিসের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় এবং তিনি নিজের ক্যারিয়ারের পথ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন।

নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে মঈন তাঁর দোকানটি বন্ধক রেখে ঋণ নেন, কিছু টাকা জোগাড় করেন এবং ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি নিতে দিল্লিতে আসেন। কিন্তু প্রথম দেড় বছরের মধ্যেই তাঁর প্রায় সব টাকাই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু হাল ছাড়েননি মঈন। ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসেন এবং পরপর তিনবার ফেল করেন। এই সময়  তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা তাঁকে বিদ্রূপ করে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দিত। 

আরও পড়ুন: মা ঝাড়ুদার, দু’বছর বয়সে হারান বাবাকে! NEET-এ সফল সঞ্জিত আজ ডাক্তারির ছাত্র

কারও কথায় বিচলিত না হয়ে লক্ষ্য স্থির রেখেছিলেন মঈন। তিনি নিজের আগের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে চতুর্থ ও শেষ প্রচেষ্টার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। অবশেষে ২০২২ সালে তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষায় ২৯৬ র‍্যাঙ্ক (AIR) অর্জন করে সমস্ত কটূক্তির জবাব দেন। আজ তিনি বেঙ্গল ক্যাডারের একজন আইএএস অফিসার। তাঁর এই সাফল্য এটাই প্রমাণ করে যে, লড়াই করার সাহস ও মনের জোর থাকলে কোনো কিছুই স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না।