অনন্যা সরকার, ঝাড়খণ্ড: যদি দৃঢ় সংকল্পের সাথে জুড়ে যায় জীবনে বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা, তবে দারিদ্র ও প্রতিকূলতা কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা। ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের বাসিন্দা সঞ্জিত কুমারের গল্পটিও এরই এক জীবন্ত উদাহরণ (NEET UG 2026 Success Story of Sanjeet Kumar)। মাত্র দুই বছর বয়সে সঞ্জিত হারান তার বাবাকে। সংসারের হাল ধরেন মা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বাড়িতে ঝাড়ুদারের কাজ করতেন তিনি। মাসে মাত্র ৬,০০০ টাকা উপার্জন করার জন্য তার মায়ের কঠোর পরিশ্রম দেখে বড় হওয়া সঞ্জিত দৃঢ় সংকল্প করেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে জীবনে বড় কিছু করে দেখানোর। আর সেই কথা রেখে সঞ্জিত এবছরের ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় (NEET UG 2026) অসাধারণ ফল করে নিজের লক্ষ্যের দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছেন। আসুন তাঁর এই সাফল্যর কাহিনীটি সর্ম্পকে জেনে নেওয়া যাক।
চরম অর্থনৈতিক সংকটও স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারেনি
ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের বাসিন্দা সঞ্জিত কুমার দ্বাদশ শ্রেণিতে ৯৪.৪% নম্বর পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। কিন্তু অর্থ ছাড়া নিটের মতো কঠিন ডাক্তারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াটা তাঁর কাছে এক অসম্ভব স্বপ্নের মতো মনে হতো। কিন্তু চরম দারিদ্র্যও সঞ্জিতের সংকল্পকে দমাতে পারেনি। অবশেষে, তাঁর একাগ্রতা এবং জিন্দেগি ফাউন্ডেশনের (Zindagi Foundation) নির্দেশনায় সঞ্জিত নিট পরীক্ষায় খুবই ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়ে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছেন।
আরও পড়ুন: বোন আক্রান্ত ক্যান্সারে, ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে NEET ক্র্যাক সাগরের
দারিদ্র্যের মধ্যেই ছোটবেলাটা কেটেছে সঞ্জিত কুমারের। যখন তার মা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন, তখন তাঁর চিকিৎসার জন্য কোনো টাকা ছিল না। সেই যন্ত্রণায় সঞ্জিত তাঁর মাকে ভুগতে দেখেছিলেন। এছাড়াও, তাঁদের এলাকার এক ব্যক্তিকে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মারা যেতে দেখেন সঞ্জিত। এই দুই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা সঞ্জিতের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেদিনই তিনি মনে মনে সংকল্প করে নেন যে, তিনি একজন ডাক্তার হবেন এবং তাঁরই মতো অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষজনের সেবা করবেন, যাতে চিকিৎসার অভাবে কোনো গরীব মানুষকে প্রাণ হারাতে না হয়।
দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই সঞ্জিত নিজের প্রচেষ্টায় নিট ইউজি (NEET UG)-এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু অধ্যাবসায় থাকলেও, সঠিক নির্দেশনার অভাবে কোনো ভালো কলেজে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। তা সত্ত্বেও, হাল ছাড়তে নারাজ সঞ্জিত যোগদান করেন জিন্দেগি ফাউন্ডেশনে, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা অজয় বাহাদুর সিং সঞ্জিতের প্রতিভা এবং নিষ্ঠা প্রত্যক্ষ করেন এবং ফাউন্ডেশন তাকে বিনামূল্যে কোচিং, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং বইয়ের জোগান দেন। অজয় স্যার শুধু সঞ্জিতকে পড়াশোনাই শেখাননি, তার পাশাপাশি প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে কীভাবে মানসিক শক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে হয় তারও পাঠ পড়িয়েছেন। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হলেই সঞ্জিতের মনে তাঁর মুখটা ভেসে উঠতো, মনে পড়ে যেত কত কষ্ট করে তিনি তাঁকে বড় করে তুলেছেন। এটাই আবার তাঁকে লেগে পড়ে থাকার শক্তি যোগাতে।
আরও পড়ুন: মায়ের হার্টের অসুখ, ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা, পরিবার সামলে NEET ক্র্যাক নদিয়ার অলীকের
সঞ্জিত কুমার এবছর নিট ইউজি পরীক্ষায় ৭২০-এর মধ্যে ৬৬৬ নম্বর পেয়েছেন। ওবিসি বিভাগে তাঁর সর্বভারতীয় র্যাঙ্ক (AIR) ১৯৭ এবং সাধারণ বিভাগে তিনি ৬৪৪ র্যাঙ্ক করছেন। সারা ঝাড়খণ্ডের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন সঞ্জিত। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, প্রতিভা কোনো বড় শহর বা অর্থের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিভার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা হয় না। সঞ্জিতের মতো ছাত্রছাত্রীরা যদি সঠিক নির্দেশনা পায়, তাহলে তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে।










