জানেন, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কেন ঘুড়ি ওড়ানো হয়?

Published:

Vishwakarma Puja

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দেবতার কারিগর বিশ্বকর্মা, তাঁর পুজো (Vishwakarma Puja) এলেই বাঙালির মনে দুর্গাপুজোর আগমনের আনন্দটা যেন দ্বিগুণ যায়। তবে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বিশেষ পরিচিত ছবি। আর সেটা হল, পাড়ায় পাড়ায় ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানো। কিংবা মাঠে গিয়ে লাটাই ঘুরিয়ে পেটকাটি চাঁদিয়ালের লড়াই। ছোট থেকে বড়, অনেকেই এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আকাশে রঙিন ঘুড়ির ভিড় আর ছাদ থেকে ভেসে আসা ‘ভো-কাট্টা’ রব বিশ্বকর্মা পুজোর অন্যতম পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু ঘুড়ি তো রোজই ওড়ানো যায়, তাতে কোনও বাধা নেই। তাহলে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটিকেই কেন বেছে নেওয়া হল? এর পিছনে রয়েছে পুরাণের একটি প্রচলিত কাহিনি এবং বাংলার ঘুড়ি ওড়ানোর নিজস্ব ইতিহাস।

পুরাণের গল্পেই কি লুকিয়ে রয়েছে উত্তর?

হিন্দু পুরাণে বিশ্বকর্মাকে দেবতাদের প্রধান কারিগর বা নির্মাতা হিসেবে দেখা হয়। দেবতাদের নানা ধরনের নির্মাণ ও কারিগরি কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও শোনা যায়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা একসময় দেবতাদের জন্য তৈরি করেছিলেন একটি উড়ন্ত রথ। সেই আকাশপথে চলা রথের স্মৃতির সঙ্গেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ঘুড়ি ওড়ানোর যোগসূত্রের কথা আছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ, আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর এই রীতিকে সেই উড়ন্ত রথের প্রতীকী স্মরণ হিসেবেই অনেকে দেখেন।

বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানোর শুরু কীভাবে?

তবে বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানোর ইতিহাস কিন্তু আরও পরের। প্রায় ১৮৫০ সালের দিকে বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানোর চল শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। শুরুর দিকে অবশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘুড়ি ওড়ানোর শখ বা ইচ্ছে খুব একটা সক্রিয় ছিল না। মূলত বিত্তশালী ও অভিজাতদের মধ্যেই ঘুড়ি ওড়ানোর প্রবণতা দেখা যেত। লোকমুখে শোনা যায় বর্ধমান রাজবাড়িতেও ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন ছিল। রাজা মহতাবচাঁদ নাকি নিজেও ঘুড়ি ওড়াতেন। বর্ধমানের রাজপরিবারের শিকড় পাঞ্জাবের সঙ্গে যুক্ত ছিল, আর সেখানে ঘুড়ি উৎসবের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা ছিল। সেই সূত্রেই বর্ধমানে এই সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছিল বলে মনে করা হয়।

আরও পড়ুন: বাড়িতে এই গাছ থাকলে ধারেকাছে ঘেঁষবে না মশা, মিলবে হাজারো উপকারিতাও

জানেন কলকাতার আকাশে ঘুড়ির লড়াই এল কার হাত ধরে?

এই কলকাতার বুকে ঘুড়ি ওড়ানোর এত ঘনঘটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৫৬ সালে লখনৌয়ের রাজত্ব হারিয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছেছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ। মেটিয়াব্রুজে তাঁর নতুন ঠিকানা তৈরি হয়, পাশাপাশি তাঁর সঙ্গেই কলকাতায় আসে ঘুড়ি ওড়ানোর সংস্কৃতিও। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তখন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন থাকলেও কলকাতায় তেমন একটা জনপ্রিয় ছিল না। পরে ধীরে ধীরে শহরের সংস্কৃতির একটি অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে এই ঘুড়ি ওড়ানো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ঘুড়ির সংখ্যাও অনেক কমেছে। এখন আর আগের মতন আকাশের রঙের মেলা দেখা যায় না। শুধু বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সেই পুরনো ছবি ফিরে আসে শহরের আকাশে। রঙিন ঘুড়িতে ভরে ওঠে আকাশ, ছাদে জমে ওঠে আড্ডা আর প্রতিযোগিতা। তাই বিশ্বকর্মা পুজো মানেই শুধু দেবশিল্পীর আরাধনা নয়, বাঙালির কাছে এই দিনটি পালিত হয় ঘুড়ির উৎসব হিসেবে।