সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে রথযাত্রা কত তারিখে (Rath Yatra 2026)? আর মাত্র কিছুদিনের অপেক্ষার। তারপরেই ওড়িশার পুরীতে ভক্তি আর শ্রদ্ধার মহাসঙ্গম অর্থাৎ শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের পূর্ণ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, রথযাত্রার পুণ্য লগ্নে যে সমস্ত ভক্তরা রথের দড়ি টানার সুযোগ পান, তারা পুণ্য লাভ করেন। কিন্তু এবছর রথযাত্রা কত তারিখে পড়ছে? সময়সূচি কী রয়েছে আর মাহাত্ম্য কী আছে, সবটাই জানাবো এই প্রতিবেদনে।
২০২৬ সালে রথযাত্রা দিনক্ষণ | Date of Rath Yatra 2026 |
এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে। ভক্তদের সুবিধার্থে মহাপ্রভুর নগর পরিক্রমার সম্পূর্ণ সূচি নিচে আলোচনা করা হল—
- ১৬ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার, এই দিন রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা। আর এই দিন রথে চরে মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন।
- ১৭ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই ২০২৬, এই দিনগুলিতে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা দেবী মাসির বাড়িতেই অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরে অবস্থান করবে। আর সেখানে আগত লক্ষ লক্ষ ভক্তদেরকে দর্শন দেবেন।
- ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, এই দিন হবে উল্টোরথ। ৯ দিনের উপবাস শেষ করে মহাপ্রভু আবারও তাঁর মূল শ্রীমন্দিরে ফিরে আসবেন এদিন।
রথ টানার ধর্মীয় গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্য
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রার মাধ্যমে ভগবান জগন্নাথ নিজেই তাঁর রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত সাধারণ মানুষকে দর্শনের সুযোগ দেন। এমনকি পুরানে উল্লেখ করা রয়েছে, রথযাত্রার সময় শ্রী হরির প্রধান রথ নন্দী ঘোষের দর্শন লাভ করলেই মানুষের জন্মান্তরের পাপ মুছে যায়। আর সেই কারণে রথের দড়ি একটু ছোঁয়ার জন্য বা রথকে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরীতে ভক্তদের ভিড় একেবারে উপচে পড়ে। এমনকি একে সরাসরি মোক্ষ লাভের পথ হিসেবে গণ্য করা হয়।
রথযাত্রার প্রধান আচার এবং নিয়ম
জানিয়ে রাখি, রথযাত্রার মূল উৎসব শুরু হওয়ার আগে বেশ কিছু প্রাচীন এবং আকর্ষণীয় ধর্মীয় আচরণ পালন করা হয়। যেমন—
- জৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমার দিন ১০৮ কলস জলে মহাপ্রভুর স্নান হয়। এরপর অতিরিক্ত স্নানের কারণে ভগবান ১৫ দিনের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাকে অনাশর বা অনবসর কাল বলা হয়ে থাকে। আর এই সময় গর্ভগৃহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে।
- এদিকে আষাঢ় মাসের দ্বিতীয় দিন রথ টানার ঠিক আগে পুরীর গজপতি রাজা এসে সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের মন্ডপ আর চারপাশ পরিষ্কার করেন। এই প্রথা থেকে শেখা যায়, ভগবানের দরবারেও রাজা একজন সাধারন সেবক।
- আর গজবতি রাজার ঝাড়ু দেওয়ার পর্ব শেষ হলেই শঙ্খধ্বনি এবং জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।
রথযাত্রা পালনের নিয়ম
জগন্নাথ দেব, বলরাম এবং সুভদ্রার মন্দির থেকে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাওয়ার উৎসব এই রথযাত্রা। তবে এই দিন কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরী। যেমন—
- রথযাত্রার দিন সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরতে হয়। জগন্নাথ দেবের মূর্তি থাকলে জল বা দুধ দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
- ভগবানকে এদিন নতুন পোশাক, সুন্দর মালা আর অলংকার দিয়ে সাজাতে হয়। তারপর ধূপ, প্রদীপ জ্বালিয়ে ফল, মিষ্টি এবং অন্যান্য প্রসাদ নিবেদন করতে হয়।
- দেবতাদের ছোট রথে বা সিংহাসনে বসিয়ে ভক্তিগীতি গেয়ে রথ টানার আয়োজন করা হয়। আর রথের দড়ি টানা অত্যন্ত পুণ্য কর্ম বলেই বিশ্বাস করা হয়।
- রথযাত্রার দিনগুলিতে নিরামিষ আহার করতে হয়। এই সময় পেঁয়াজ, রসুন, আমিষ খাবার বা কিছু নির্দিষ্ট শাক যেমন পুঁইশাক, কলমি শাক ইত্যাদি এড়িয়ে চলতে হয়।
- উল্টো রথের দিন পুনরায় দেব দেবতাদের নিজের মন্দিরে ফিরিয়ে আনতে হয়। আর এই দিনগুলোতেও নিষ্ঠাভরে পূজা এবং ভোগ নিবেদন করতে হয়।
আরও পড়ুন: স্নাতক পাসেই চাকরি, স্টেট ব্যাঙ্কে ৭ হাজারের বেশি শূন্যপদে নিয়োগ
রয়েছে রথের মেলার আকর্ষণ
তবে রথ যে শুধুমাত্র পুজোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এমনটা নয়, কারণ রথের মেলা হিন্দু ধর্মের মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মেলা বলেই মনে করা হয়। এই মেলার সঙ্গে রয়েছে ধর্মের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য। এই মেলাতে বিভিন্ন মিষ্টি ও খাবার পাওয়া যায়। পাপড় ভাজা, নিমকি, জিলিপি কত কী। এছাড়া অনেকে মাটির খেলনা, কাঠের পুতুল, হাতপাখা, বাঁশি বা গৃহস্থলীর টুকটাক জিনিসপত্র কিনতে ভালবাসে। আর সবথেকে বড় ব্যাপার, রথের মেলার দিন অনেকে গাছ কেনে। গাছ কেনাকে শুভ বলেই মনে করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেও বিখ্যাত কিছু রথের মেলা হয়। যেমন শ্রীরামপুরে মাহেশের রথ, যেটি ওড়িশার পুরীর পর ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ও বাংলার সবথেকে পুরনো রথযাত্রা। এছাড়া কলকাতার ইসকনের রথযাত্রা হয় বেশ জাকজমকপূর্ণভাবে। তাছাড়া গুপ্তিপাড়ার রথ বাংলার ঐতিহ্যবাহী একটি মেলা।










