অনন্যা সরকার, কলকাতা: মাত্র দুটি শার্ট, দুটি প্যান্ট আর ঝাঁ চকচকে জীবনের বাইরেও আরো কিছু পাওয়ার আছে সেই বিশ্বাস নিয়ে দুবাই থেকে ভারতগামী ফ্লাইটে চড়ে বসেছিলেন সুইজারল্যান্ড নিবাসী সান্ড্রা লাভি গোজকোভিচ (Sandra Lavie Gojkovic)। তার সেই বিশ্বাস আজ পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপের (Sagardwip) এক প্রত্যন্ত গ্রামের শত শত মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে (Social Worker)। সান্ড্রা এখন সেখানে শিশুদের জন্য একটি বিনামূল্যের স্কুল চালান। আসুন তাঁর এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রটির (Inspirational Story) সর্ম্পকে জেনে নেওয়া যাক।
সুইজারল্যান্ড ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষিকা সান্ড্রা
একসময় সুইজারল্যান্ড এবং দুবাইতে সান্ড্রার একটি সফল কর্পোরেট ক্যারিয়ার ছিল। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং আর্থিক নিরাপত্তার সাথে আরামদায়কভাবে জীবনযাপন করতেন তিনি। কিন্তু এই সমস্ত বাহ্যিক সাফল্য সত্ত্বেও, তাঁর মনে হত এর বাইরে গিয়ে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তার কিছু করা উচিত। সান্ড্রা তাই পাকাপাকিভাবে তাঁর পুরোনো জীবন ছেড়ে ভারতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শুধু টাকাই তাঁকে সুখী করতে পারবে না। তিনি এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন, যা সমাজে অর্থবহ হবে। তবে তাঁর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। নিজের সহজে প্রবৃত্তি অনুসরণ করে একদিন দুবাইয়ের অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি এবং ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে ভারতের উদ্দ্যেশে একমুখী ফ্লাইটের টিকিট কেটে বিমানে চেপে বসেন।
আরও পড়ুন: রাজ্যবাসীকে বিনামূল্যে সোমনাথ যাত্রা করাবে নবান্ন, জানুন আবেদন পদ্ধতি
তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রা অবশেষে তাঁকে সাগর দ্বীপে নিয়ে আসে, যেখানে তিনি প্রথমে এনজিওগুলির (NGO) সাথে কাজ করার আশা করেছিলেন। কিন্তু, সেখানে গিয়ে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি বুঝতে পারেন যে, অনেক প্রাথমিক স্তরের উদ্যোগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে অথবা এগুলি দীর্ঘস্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই সান্ড্রা কয়েক ধাপ পিছিয়ে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে স্কুল তৈরি করা নয়, বরং স্থানীয় গ্রামবাসীদের বিশ্বাস অর্জন করাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মাসের পর মাস বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদেরকে তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য রাজি করান এবং শিক্ষা কিভাবে তাদের জীবন পাল্টে দিতে পারে, তাও বোঝান।
সান্ড্রা লাভি গোজকোভিচের সেই প্রচেষ্টাই আজ একটি কমিউনিটি-চালিত উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। তার সংস্থা এখন প্রায় ১৫০ জন শিশুর জন্য একটি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল চালায় এবং সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়া আরও ১২০ জন শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি দিতে সহায়তা করে ও পুষ্টিকর খাবার দেয়। শিক্ষা ছাড়াও, এই সংস্থা প্রায় ২০ জন গ্রামীণ মহিলাকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা তাদের উপার্জন করতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, পারিবারিক উৎপীড়ন এবং মানব পাচারের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনও চালান সান্ড্রা।
আরও পড়ুন: রাজ্যের এইসব কর্মীদের বেতন বাড়ল ৫০০০ টাকা, জারি বিজ্ঞপ্তি
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সান্ড্রা উপলব্ধি করেছেন যে, স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন শহর থেকে অনেক দূরে গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু হয়। ভারতে কাজ করার সময় এই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি শিখেছেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার মাধ্যমে গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নই দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আরামদায়ক জীবন ত্যাগ করা সত্ত্বেও সান্ড্রা কখনও পিছনে ফিরে তাকাননি। তিনি জানান, তাঁর যা কিছু প্রয়োজন, তার সবই আছে তাঁর কাছে। স্কুলের এই ছোট ছোট শিশুদের মুখের হাসি টাকা দিয়ে কেনা যেকোনো মূল্যবান জিনিসের থেকেও বেশি আনন্দ দেয় তাঁকে। এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে চলাই সান্ড্রার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এখন অন্য কিছু করার কথা ভাবতেও পারেন না তিনি।










