১৫ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নজর নবান্নের, বড় পদক্ষেপ সরকারের

Published:

CM Nabanna

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের শাসনকাল ঘিরে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন বণ্টনে অনিয়ম, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত। শিক্ষক নিয়োগ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ২৫,৭৫৩ জনের নিয়োগ বাতিল করেছে। অন্যদিকে, রেশন বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এবার পূর্ববর্তী সরকারের আমলের সেই সমস্ত বিতর্ক ও অনিয়মের ছায়া সরিয়ে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরানো এবং রাজ্যকে নতুন করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। সেই লক্ষ্যেই নবান্নের (Nabanna) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, গত ১৫ বছরে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে হওয়া চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি (Group D) কর্মী নিয়োগের হিসাব খতিয়ে দেখা।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ঘিরে কী কী অভিযোগ?

বিগত সরকারের আমলে সরকারি দফতরে স্থায়ী শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে বিপুল সংখ্যায় চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি ছিল, নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিভিন্ন দফতরে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ নেতা-কর্মীদের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক মহলের অভিযোগ, স্থায়ী পদে নিয়মমাফিক নিয়োগের প্রক্রিয়া এড়িয়ে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের প্রবণতা ক্রমশ বেড়েছে। ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত যোগ্যতা, নির্বাচন পদ্ধতি এবং সরকারি নির্দেশিকা মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

এবার সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই উদ্যোগী হয়েছে নবান্ন। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরকে তাদের অধীনস্থ চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নির্দিষ্ট ছকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সেচ ও জলসম্পদ দফতরের নিয়োগ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই দফতরের সমস্ত সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে ইতিমধ্যেই রিপোর্ট চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র-সহ তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থ দফতরের জারি করা নির্দেশিকা মেনে নিয়োগ হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হবে। ওই নির্দেশিকার ৯, ১১ এবং ১৪ নম্বর ধারার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়োগের নথি, ফৌজদারি মামলার রেকর্ড এবং কোনও অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে কি না, সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

নিয়োগের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির ছবি,

  • ২০১২ সালে দমকল বিভাগে একসঙ্গে ১,৬৯২ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
  • ২০১৩ সালে পুলিশি সহায়তার জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক পুলিশ নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।
  • ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের সংখ্যা মিলিয়ে ১ লক্ষ ১৫ হাজারেরও বেশি।

ওই বছরের রাজ্য বাজেটে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ সি ও ডি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাজ্যে মোট চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অল বেঙ্গল কনট্র্যাকচুয়াল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, স্থায়ী পদ খালি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ায় রাজ্যের কোষাগারের উপর চাপ পড়েছে এবং নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: চোরবাগান কাণ্ড থেকে শিক্ষা, কালী-জগদ্ধাত্রী-ছটপুজোয় একগুচ্ছ নির্দেশিকা নবান্নের

নবান্নের এই উদ্যোগে আপাতত বিভিন্ন দফতরের নিয়োগ সংক্রান্ত নথি ও তথ্য যাচাইপর্ব শুরু হচ্ছে। কোথাও সরকারি নির্দেশিকা অমান্য করে নিয়োগ হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। তবে যাচাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার আগে কোনও নিয়োগকে নিয়মবহির্ভূত বা বেআইনি বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে না। দফতরভিত্তিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পরই পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সরকার। এর ফলে প্রশাসনিক নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগেরও নিষ্পত্তি ঘটবে।

google button