ইন্টারনেট বন্ধ, জারি কার্ফু! বিগত ৩ বছর ধরে কেন জ্বলছে মণিপুর?

Published:

Manipur Violence

সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: জ্বলছে মণিপুর (Manipur Violence)! কিন্তু এর পিছনে আসল কারণ কী? ২০২৩ এর মে মাস থেকে শুরু হওয়া জাতীগত দাঙ্গার ক্ষত এখনও পর্যন্ত কাটেনি রাজ্যটিতে। গত বছর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও ২০২৬ এর এপ্রিল মাসে ২ নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু আর পরবর্তী হিংসাত্মক ঘটনা মণিপুরকে আবারও খাদের কিনারায় ফেলে দিয়েছে। কার্ফু থেকে শুরু করে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, দফায় দফায় বনধের জেরে একেবারে জনজীবন বিপর্যস্ত। সবথেকে বড় ব্যাপার, প্রধানমন্ত্রীর (Narendra Modi) ভূমিকা নিয়েও এখানে উঠছে প্রশ্ন।

কী কারণে সাম্প্রতিক উত্তেজনা?

আসলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মূলে রয়েছে গত ৭ এপ্রিলের এক মর্মান্তিক ঘটনা। বিষ্ণুপুর জেলার ত্রংলাওবি এলাকায় গভীর রাতে এক সন্দেহভাজন রকেট হামলায় পাঁচ বছর বয়সী এক বালক এবং তাঁর মাত্র ছয় মাস বয়সী এক বোন প্রাণ হারায়। ঘুমন্ত অবস্থাতে ওই দুই শিশুর মৃত্যু রাজ্যজুড়ে ক্ষোভের আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে উত্তেজিত জনতা সিআরপিএফ ক্যাম্পে হামলা চালায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনজনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি আরও ২৪ জন আহত হয়। এই ঘটনার রেশ ধরে ইম্ফল উপত্যকা আর পাহাড়ি জেলাগুলিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে দুই শিশুর মৃত্যু এবং ১৮ এপ্রিল উখরুলাগামী একটি কনভয়েতে উগ্রপন্থী হামলায় প্রাক্তন সেনা কর্মীসহ আরও দু’জনের মৃত্যুর প্রতিবাদে বর্তমানে উত্তল পরিস্থিতি রাজ্যটিতে। যার জেরে প্রভাবশালী নারী সংগঠন মেইরা পাইবিস পাঁচ দিনের বনধ ডেকেছে। এমনকি উখরুলার সেনাপতি জেলায় তিন দিন টোটাল শাটডাউনের ডাক দিয়েছে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল। আর বর্তমানে ইম্ফল উপত্যকার সবকটি জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাজার, গণপরিবহন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। পাশাপাশি রাজধানী ইম্ফলের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করছে সাধারণ মানুষ।

গত শনিবার ইম্ফলের থাংমেইব্যান্ড অঞ্চলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে। বিক্ষোভকারীরা খয়রামব্যান্ড ইমা মার্কেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও সিআরপিএফ তাদেরকে বাধা দিয়েছিল। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে। এদিকে পাল্টা ইটবৃষ্টির জেরে তিন মহিলা সিআরপিএফ কর্মীসহ ৬ জন আহত হয়।

৩ বছর ধরেই চলছে অশান্তি

একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাটলে আমরা জানতে পারব—মণিপুরের এই জাতিগত সংঘাতের ইতিহাস আজ থেকে তিন বছরের পুরনো। ২০২৩ এর মে মাসে মণিপুর হাইকোর্টের এক নির্দেশকে কেন্দ্র করে সংখ্যাগুরু মেইতেই এবং কুফি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। আসলে মেইতেই সম্প্রদায়কে তপশিলি জনজাতির মর্যাদা এবং সংরক্ষিত এলাকায় জমি কেনার অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব মূলত সেই বিতর্কের সূত্রপাত। গত তিন বছর ধরে এই হিংসায় অন্তত ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। যার রেশ এখনও পর্যন্ত কাটেনি।

আরও পড়ুন: জাহাজে ফের হামলা হলে ইরানকে পাল্টা দেবে ভারতও? হরমুজ নিয়ে বড় বয়ান নৌসেনার

বর্তমানে এই রাজ্যের পরিস্থিতি একেবারে ভঙ্গুর বললেও কম হবে। যদিও সরকার শান্তি ফেরানোর জন্য অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করছে এবং কিছু জেলায় কার্ফু জারী করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবথেকে বড় ব্যাপার, রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হস্তক্ষেপ নিয়েও এখানে উঠছে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন। এখন দেখার, মণিপুরের এই অশান্তি কবে মেটে।