বাড়িতে শিব পুজো (Shiv Puja Niyam in Bengali) হলো দেবাধিদেব মহাদেব শিবের অপার করুণা, পারিবারিক শান্তি ও সর্বপ্রকার বাধা-বিঘ্ন কাটানোর সবচেয়ে সরল ও পবিত্র সনাতন পুজো পদ্ধতি। খাঁটি ভক্তি ও সঠিক আচারের সাথে মাটির শিবলিঙ্গ গঠন, আচমন, আসন ও পুষ্প শুদ্ধি, সূর্য ও গণেশ পূজা, পঞ্চমুদ্রা আবাহন, পঞ্চামৃত স্নান, অষ্টমূর্তি পূজা, পুষ্পাঞ্জলি এবং প্রণাম ও ক্ষমা প্রার্থনা মন্ত্র পাঠ করে শিব পূজা করলে পরমেশ্বর ভোলেনাথ ভক্তের সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ করেন।
বাড়িতে ভোলানাথ শিবের পুজো আয়োজনের জন্য নিম্নলিখিত পবিত্র সামগ্রী ও ফর্দমালা সংগ্রহ করতে হয়—
| উপকরণের নাম | বিবরণ ও বিবরণী |
| ১. শিবলিঙ্গ ও পাত্র | ১টি তামা/কাঁসার পাত্র (পিনাক), গঙ্গা মাটি (মৃত্তিকা), গঙ্গা জল, ১টি ঘটি। |
| ২. ফুল ও পুষ্পমালা | আকন্দ ফুল ও আকন্দ ফুলের মালা, ধুতুরা ফুল ও ফল, অপরাজিতা, শোলার মালা, অক্ষত ৩ পাতা যুক্ত বেলপাতা ও দূর্ব্বা। |
| ৩. পঞ্চামৃত ও উপচার | কাঁচা দুধ, দই, খাঁটি ঘি, মধু, ক্ষীর ও চিনি। সিদ্ধি, আবাটা, হলদি বাটা, তিল, হরিতকী, আতপ চাল, মধুপার্কের বাটী। |
| ৪. ধূপ, দীপ ও বস্ত্র | ধূপকাঠি, ঘৃত প্রদীপ, ধূনা, আসনাঙ্গুরীয়ক ২ টি, শিবের ধুতি এবং দুর্গা বা গৌরীর শাড়ি। |
পবিত্র পোশাক ও ত্রিপুণ্ড্র ধারণ: পূজায় বসার পূর্বে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন। কপালে শোধিত ভস্ম বা চন্দন দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ত্রিপুণ্ড্র এবং গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করে উত্তর মুখে কুশের আসনে বসবেন।
মাটি দিয়ে শিবলিঙ্গ তৈরি: '(নমঃ) হরায় নমঃ' মন্ত্র উচ্চারণ করে গঙ্গা মাটি নেবেন। এরপর '(নমঃ) মহেশ্বরায় নমঃ' মন্ত্রে ডান হাতের বুড়ো আঙুলের সমান শিবলিঙ্গ গড়ে মস্তকে ছোট গোলাকার ব্রজ মাটি স্থাপন করবেন। কাঁসা বা তামার পাত্রের পিনাক উত্তরমুখী রেখে বেলপত্রের মসৃণ পিঠের মাঝের পাতার ওপর তা বসাবেন।
আত্ম ও তত্ত্ব সংকল্প: আসনে বসে উত্তর দিকে মুখ করে ৩ বার মন্ত্র জপ করবেন—
ডান হাতের তালুতে সামান্য জল নিয়ে তিনবার পান করে আত্মশুদ্ধি করুন—
সচন্দন ফুল দিয়ে আসন স্পর্শ করে পাঠ করবেন—
সূর্য অর্ঘ্য মন্ত্র: "এহি সূর্য সহস্রাংশো তেজোরাশে জগৎপতে। অনুকম্পয় মাং ভক্তং গৃহাণার্ঘ্যং দিবাকর। ইদমর্ঘ্যং শ্রীসূর্যায় নমঃ (এষ অর্ঘ্যঃ শ্রীসূর্যায় নমঃ)।"
কূর্মমুদ্রায় বেলপাতা হাতে নিয়ে মহাদেবকে ধ্যান করবেন—
হৃদয়ের দেবতাকে শিবলিঙ্গে আবাহন করে ৫টি আবাহনী মুদ্রায় পঞ্চমন্ত্র পাঠ করুন—
শিবলিঙ্গের আটটি কোণে আটটি চন্দনাঙ্কিত বিল্বপত্র বা অক্ষত অর্পণ করে শিবের ৮টি মহাজাগতিক রূপের পূজা করুন—
| দিক | অষ্টমূর্তি পূজা মন্ত্র | তত্ত্ব রূপ |
| পূর্ব | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ শর্বায় ক্ষিতিমূর্তয়ে নমঃ | ভূমি (পৃথিবী) |
| ঈশান | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ভবায় জলমূর্তয়ে নমঃ | জল |
| উত্তর | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ রুদ্রায় অগ্নিমূর্তয়ে নমঃ | অগ্নি |
| বায়ু | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ উগ্রায় বায়ুমূর্তয়ে নমঃ | বায়ু |
| পশ্চিম | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ভীমায় আকাশমূর্তয়ে নমঃ | আকাশ |
| নৈঋত | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ পশুপতয়ে যজমানমূর্তয়ে নমঃ | আত্মা (যজমান) |
| দক্ষিণ | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ মহাদেবায় সোমমূর্তয়ে নমঃ | চন্দ্র |
| অগ্নি | এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ঈশানায় সূৰ্যমূর্তয়ে নমঃ | সূর্য |
"ওঁ নমঃ শিবায়" মন্ত্র ১০ বা ১০৮ বার জপ করে কোশার জল দেবতার দক্ষিণ হস্তে অর্পণ করবেন—
অতঃপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে গালে আঘাত করে 'বম্ বম্' শব্দে মুখবাদ্য করবেন।
পূজার শেষে ভক্তিভরে প্রণত হয়ে শিবের এই ৬টি মহা স্তোত্র শ্লোক পাঠ করবেন—
সংহারমুদ্রায় ফুল ঘ্রাণ নিয়ে "মহাদেব ক্ষমস্ব" বলে শিবলিঙ্গে জল দিয়ে শিবলিঙ্গটি সামান্য কাৎ করে রাখবেন। ঈশানকোণে ত্রিকোণ মণ্ডল এঁকে 'চণ্ডেশ্বরায় নমঃ' বলে নির্মাল্য স্থাপন করবেন। সব সময় মনে রাখবেন, দিবারাত্রি সকল সময় শিব পূজা **উত্তরমুখী** হয়ে করা শাস্ত্রীয় নিয়ম।
উত্তর: প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের পর ৩ ঘণ্টার মধ্যে অথবা দুপুর ১২টার পূর্বে শিব পূজা শেষ করা সবচেয়ে শুভ বলে মানা হয়। সন্ধ্যাপূজার ক্ষেত্রে প্রদোষকাল (সূর্যাস্তের ঠিক আগে ও পরে) অতি উত্তম।
উত্তর: শিবলিঙ্গে জল বা পঞ্চামৃত স্নান করানোর সময় "ইদং স্নানীয়োদকং পশুপতয়ে নমঃ" অথবা সরল মূল মন্ত্র "ওঁ নমঃ শিবায়" জপ করতে হয়।
উত্তর: শাস্ত্রমতে এবং বিধিসম্মতভাবে শিবলিঙ্গের পিনাক (সোমসূত্র বা জল নির্গমনের পথ) সর্বদা **উত্তর দিকে** রেখে উত্তরমুখী হয়ে পূজায় বসতে হয়।
উত্তর: শিবলিঙ্গে ভুলবশতও **তুলসী পাতা, হলুদ, সিঁদুর, কেতকী ফুল এবং শঙ্খের জল** দেওয়া শাস্ত্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ।
উত্তর: বাড়িতে শিবলিঙ্গ না থাকলে শুদ্ধ পাত্রে গঙ্গা জল বা নদীজল স্থাপন করে জলকে সাক্ষী রেখেও মহাদেবের মনস্ক পূজা করা যায়। সেক্ষেত্রে আবাহন বা বিসর্জনের প্রয়োজন হয় না।
আমাদের সনাতন হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্রে ও সংহিতায় শিব পূজার বহুবিধ আঞ্চলিক ও পারিবারিক নিয়মকানুন ও পদ্ধতি বর্ণিত রয়েছে। উপরে বর্ণিত শিব পুজো মন্ত্র ও পদ্ধতিটি সনাতন ঐতিহ্যের অন্যতম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সহজতম পুজো পদ্ধতি। এই নিবন্ধটি শ্রী পরমেশ্বরের দাস কালীপদ-এর বিখ্যাত রচনা ও নির্দেশিকাকে অনুসরণ করে সংকলিত ও সহজপাঠ্য করে রচিত হয়েছে।
যদি আপনি শিব পুজো মন্ত্র ও সম্পূর্ণ পদ্ধতির বাংলা পিডিএফ (PDF) ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে রাখতে চান, তবে নিচের বোতামে ক্লিক করুন।
শ্রীরাম ভক্ত সংকটমোচন হনুমানজির শক্তি, ভক্তি, হনুমান চালিশা ও মন্ত্রসমূহ।
দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার মন্ত্র, মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র ও চণ্ডী পাঠের মাহাত্ম্য।
ধন, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী মা লক্ষ্মীর ব্রতকথা, মন্ত্র ও আরতি।
সিদ্ধিদাতা ও বিঘ্নহর্তা গণপতির আরাধনা, গণেশ স্তোত্র ও সিদ্ধিমন্ত্র।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বাণী, কৃষ্ণাষ্টকম ও মধুর স্মারকাবলী।
মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামের রামরক্ষা স্তোত্র, রামচন্দ্র আরতি ও জীবনকথা।
কালীপুজো, আদ্যাস্তোত্র, শ্যামাসঙ্গীত ও মা কালীর সিদ্ধ বীজমন্ত্রাবলী।
বিষ্ণু সহস্রনাম, সত্যনারায়ণ ব্রতকথা ও শ্রী হরির সহস্র অবতার কথা।
বিদ্যা, জ্ঞান ও চারুকলার দেবী মা সরস্বতীর পুষ্পাঞ্জলি ও স্তোত্র।
শনিদেবের সাড়ে সাতি প্রতিকার, শনি চালিশা ও শনি স্তোত্রাবলী।
আদিত্য হৃদয় স্তোত্র, সূর্য অর্ঘ্য দান বিধি ও গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ।
শিরডির সাই বাবার কাকড় আরতি, মন্ত্র ও শ্রদ্ধা-সবুরি বাণী।
রথযাত্রা, পুরীর জগন্নাথ ধাম, জগন্নাথাষ্টকম ও মহাপ্রসাদ মাহাত্ম্য।
রবি থেকে কেতু-৯টি গ্রহের বীজমন্ত্র, নবগ্রহ পীড়াহর স্তোত্র ও প্রতিকার।