"জাগো তুমি জাগো" গানের প্রতিটি চরণের গভীর বাংলা অর্থ ও ভাবার্থ
বাণীকুমার রচিত প্রতিটি সংস্কৃতমিশ্রিত শব্দের গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
গানের চরণ
সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলা ভাবার্থ
জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা...
হে জগন্মাতা দুর্গা, তুমি এবার নিদ্রা ত্যাগ করে জাগ্রত হও। আশ্বিনের শারদপ্রাতে সন্তানদের রক্ষার জন্য তুমি আবির্ভূতা হও।
জাগো দশপ্রহরণধারিণী...
দশ হাতে দশটি দিব্য অস্ত্র (ত্রিশূল, চক্র, খড়্গ, তীর, ধনুক ইত্যাদি) ধারণকারিণী মহাশক্তি মা দুর্গা, তুমি জাগ্রত হও।
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো...
যিনি ভক্তদের সমস্ত ভয় হরণ করে পরম অভয় প্রদান করেন এবং মনের দুর্বলতা দূর করে আত্মবল ও শক্তি দান করেন, সেই দেবী তুমি জাগ্রত হও।
প্রণমি বরদা, অজরা অতুলা...
আমি প্রণাম জানাই যিনি বরদাত্রী (মনস্কামনা পূরণকারিণী), অজরা (যাঁর কখনো বার্ধক্য বা ক্ষয় নেই, চিরন্তন যুবতী) এবং অতুলা (যাঁর সৌন্দর্যের ও তেজের কোনো তুলনা নেই)।
বহু-বলধারিণী রিপুদলবারিণী জাগো মা...
অসীম শক্তির অধিকারিণী এবং কাম, ক্রোধ, মোহ রূপ অন্তরের ও বাইরের সকল শত্রু ও রিপুকুলকে দমনকারিণী মা, তুমি জাগ্রত হও।
শরণময়ী চণ্ডিকা শংকরী জাগো...
যিনি শরণাগতকে অভয় আশ্রয় দেন, যিনি দুষ্টের দমনে চণ্ডিকা এবং ভক্তের কল্যাণে শিবপত্নী শংকরী—হে মা, তুমি জাগ্রত হও।
জাগো অসুরবিনাশিনী, তুমি জাগো...
মহিষাসুরসহ জগতের সকল অসুর ও অন্যায় ধ্বংসকারিণী মহামায়া, তুমি অবিলম্বে মর্তে আবির্ভূতা হও।
দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে "জাগো দুর্গা" গানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাঙালির মনে মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের পরই যে সুরটি রক্তে নাচন ধরায়, তা হলো দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া "জাগো তুমি জাগো"।
নাটকীয় মাহাত্ম্য: আকাশবাণী মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে যখন মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গচ্যুত হয়ে হরি-হরের শরণাপন্ন হন এবং দেবতাদের সম্মিলিত তেজরশ্মি থেকে মহামায়ার জ্যোতির্ময় রূপ আবির্ভূত হয়—ঠিক সেই মুহূর্তে দেবগণের পক্ষ থেকে দেবীকে আহ্বান জানাতে এই আবাহনী গানটি গাওয়া হয়।
দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গায়কি: রবীন্দ্রসঙ্গীত ও আধুনিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় যখন তাঁর বুকভাঙ্গা ভক্তি ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরে "অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো" উচ্চারণ করেন, তখন যেন আকাশ-বাতাস দেবীর আগমনে শিহরিত হয়ে ওঠে।
পঙ্কজ মল্লিকের অনবদ্য সুরসংযোজনা: ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের রাগাশ্রয়ী সুরে বীররস ও শান্তরসের অদ্ভুত সমন্বয়ে পঙ্কজ মল্লিক গানটির সুর সৃষ্টি করেছিলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালির হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
সম্পর্কিত মহালয়া ও দুর্গা বন্দনা
মহালয়ার অন্যান্য অমর সঙ্গীত ও স্তোত্রসমূহ পড়তে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন:
বিনামূল্যে "জাগো তুমি জাগো" লিরিক্স PDF ডাউনলোড ও প্রিন্ট
সহজে পাঠ ও অনুশীলনের জন্য নিচের বোতামে ক্লিক করে সরাসরি সম্পূর্ণ গানের লিরিক্স ও অর্থ প্রিন্ট বা PDF আকারে সংরক্ষণ করুন:
"জাগো তুমি জাগো" সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্র. "জাগো তুমি জাগো" গানটি কে গেয়েছেন?
উ. আকাশবাণী কলকাতার কালজয়ী 'মহিষাসুরমর্দিনী' অনুষ্ঠানে এই বিখ্যাত গানটি গেয়েছেন কিংবদন্তি শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়।
প্র. "জাগো দুর্গা" গানটির গীতিকার ও সুরকার কে?
উ. গানটির রচয়িতা হলেন বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য) এবং সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন সুরগুরু পঙ্কজ কুমার মল্লিক।
প্র. এই গানে দেবী দুর্গাকে কী কী বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে?
উ. গানে দেবীকে 'দশপ্রহরণধারিণী', 'অভয়াশক্তি', 'বলপ্রদায়িনী', 'বরদা', 'অজরা', 'অতুলা', 'বহু-বলধারিণী', 'রিপুদলবারিণী', 'শরণময়ী', 'চণ্ডিকা', 'শংকরী' এবং 'অসুরবিনাশিনী' বলে আবাহন জানানো হয়েছে।
প্র. মহালয়ায় এই গানটির বিশেষ গুরুত্ব কী?
উ. মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের মূল নাটকীয় সন্ধিক্ষণে যখন অসুরদের বিনাশে মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটে, তখন এই গানের মাধ্যমে দেবীকে সশ্রদ্ধ আহ্বান জানানো হয়। এটি বাঙালির কাছে দেবীপক্ষের সূচনার এক অন্যতম প্রধান প্রতীক।