অনন্যা সরকার, রাজস্থান: গতানুগতিক রাস্তায় না হেঁটেও যে সঠিক পরিকল্পনা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে সফল হওয়া যায়, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন রাজস্থানের ভরতপুরের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী গৌরব পাচৌরি (Success Story of Pearl Farmer Gaurav Pachauri)। তিনি চার বছর ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়েও সফল হতে পারেননি। এরপর একদম ভিন্নধর্মী পেশা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, শুরু করেন মুক্তোর চাষ (Pearl Farming)। ২০১৭ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর, বন্ধুদের মতোই তিনিও রাজস্থান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (RAS) পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দিল্লিতে চলে যান। তবে প্রায় দুই বছর আগে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। এখন তাঁর এই উদ্যোগ থেকে আয় হচ্ছে বছরে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আসুন তাহলে গৌরব পাচৌরির এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।
টিভি দেখে পান ব্যবসা শুরুর অনুপ্রেরণা
টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান দেখে মিষ্টি জলের মুক্তো চাষের প্রতি গৌরবের আগ্রহ জেগেছিল। তাঁর পারিবারিক জমিতে গম, বাজরা ও সর্ষের মতো ফসলের চাষ হতো, কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অভ্যস্ত গৌরবের মাঠে নেমে কাজ করার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁর বাবা-মা চেয়েছিলেন তিনি যেন ভালো বেতনের কোনো চাকরি করেন, তাই তাঁদের রাজি করানো শুরুতে বেশ কঠিন ছিল।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিবারকে রাজি করানোর পর, গৌরব উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ফার্ম পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিনি ৮,০০০ টাকা খরচ করে ওড়িশার ‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার’ (CIFA)-এ পাঁচ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তিনি কাঁচামাল সংগ্রহ, নিউক্লিয়াস স্থাপন, খাদ্যের সংস্থান, অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন আকৃতির ও গোলাকার মুক্তো উৎপাদনের কৌশল শেখেন। প্রশিক্ষণ শেষে এ বিষয়ে একটি সার্টিফিকেটও অর্জন করেন।
আরও পড়ুন: সেনায় চাকরির সুযোগ ছেড়ে শুরু কৃষিকাজ, বছরে ৭৫ হাজার কেজি পেঁপে ফলাচ্ছেন হুগলির কৃষক
সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি তাঁর গ্রামের ১৫০ × ৮০ ফুট আয়তনের একটি পুকুরে ১ লাখ ১৫ হাজার ঝিনুক ছাড়েন। এর মধ্যে ৫০ হাজার ঝিনুক ছিল তাঁর নিজস্ব বিনিয়োগ, আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষকরা অংশীদার হন। মুক্তোর চাষ শুরু করার সময় তাঁর মোট বিনিয়োগ ছিল ২১ লক্ষ টাকা, যার মধ্যে কেবল পুকুর তৈরির পেছনেই খরচ হয় ৮ লক্ষ টাকা।
গৌরব জানান, এই নিউক্লিয়াস স্থাপন করা, ঝিনুকগুলোকে জালের ব্যাগে ভরা ও তারপর পুকুরে ছাড়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি শেষ করতে দেড় মাস সময় লেগেছিল। এরপর ২১ মাস ধরে নিয়মিত খাবার সরবরাহ ও জলের অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখার পর মুক্তো সংগ্রহের সময় হয়। প্রতিটি মুক্তা ১১০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় শুরুতেই তাঁর মোট ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা থেকে তিনি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেন। এই উপার্জন থেকে গৌরবের ব্যক্তিগত অংশ ছিল ৫৫ লক্ষ টাকা, যা তার প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রায় আড়াই গুণ। গৌরবের দাবি, দেড় বিঘা জমিতে মুক্তোর চাষ করে যে মুনাফা পাওয়া যায়, তা ২০০ বিঘা জমিতে গম চাষ থেকে প্রাপ্ত মোট আয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে।
তবে সবকিছুই যে মসৃণভাবে হয়েছে, এমনটা নয়। শুরুতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় গৌরবকে। ওড়িশা থেকে রাজস্থানে ট্রেনে ঝিনুক পরিবহনের ক্ষেত্রে জল ছাড়া দুই দিনের দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করতে হয়। এরফলে শুরুতে ৫০ শতাংশ ঝিনুক মারা যেত। ঝিনুক সংগ্রহের সময়কাল সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে পরিবর্তন করে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে নিয়ে আসায়, তিনি এই মৃত্যুর হার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হন। হাতে-কলমে কাজ শেখার মাধ্যমে এবং পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও প্রথম ফসল তোলার আগেই তিনি আরেকটি পুকুর তৈরি করেন। বর্তমানে তিনি রাজস্থানে তিনটি এবং পশ্চিমবঙ্গে দুটি পুকুরে মাছ ও ঝিনুক চাষ করছেন। গৌরব পাচৌরি জানান, এই উদ্যোগ এখন ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের বড় সুযোগ করে দিয়েছে এবং তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।










