অনন্যা সরকার, হুগলি: বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র হালদার। ১৯৭৬ সালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ – উভয় ক্ষেত্রেই চাকরির জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি কৃষিকাজকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে তিনি পেঁয়াজ, লঙ্কা, ফুলকপি, আম ও স্থানীয় প্রজাতির পেঁপের চাষ শুরু করেন। তবে স্থানীয় জাতের পেঁপেতে রোগবালাইয়ের প্রবণতা বেশি থাকায় এবং ফলন কম হওয়ায় তিনি নতুন কোনো উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তাঁর সেই উদ্যোগই আজ তাঁকে বাংলার অন্যতম সফল পেঁপে চাষি করে তুলেছে (Success Story of Krishna Chandra Halder)। দ্য বেটার ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন সত্তরোর্ধ্ব কৃষক বছরে ৭৫ হাজার কেজি পেঁপের চাষ করছেন তিনি।
পেঁপে চাষে ব্যাপক সাফল্য হুগলির চাষির
কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার স্থানীয় পেঁপের সাথে ‘রেড লেডি ৭৮৬’ (Red Lady 786) প্রজাতির সংকরায়ণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা করার চ্যালেঞ্জ পার করে দীর্ঘ সময় ধরে কৃত্রিম পরাগায়ন (hand-pollination) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি শেষ পর্যন্ত সফল হন। তাঁর দাবি, এখনো নামকরণ না হওয়া এই নয়া প্রজাতির পেঁপে রোগপ্রতিরোধী এবং অধিক ফলনশীল।
হুগলির উত্তর সিমলাপাল গ্রামের তিনটি জমিতে তিনি মোট ১,৮৭৫টি পেঁপে গাছ চাষ করছেন, যেগুলিতে যথাক্রমে ১,২০০, ৫০০ ও ১৭৫টি গাছ রয়েছে। এখান থেকে বছরে সবমিলিয়ে ৭৫,০০০ কেজি পেঁপে উৎপাদিত হয়, অর্থাৎ প্রতি গাছে গড়ে প্রায় ৪০ কেজি ফল মেলে। এতে তাঁর আয় হয় ২২.৫ লক্ষ টাকা। ১৯৮৬ সাল থেকেই তিনি পেঁপের চাষ করে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা অর্জন করে আসছেন।
আরও পড়ুন: অভাবকে হারিয়ে জয় কৃষকের ছেলের! মাইক্রোসফটে ১ কোটির চাকরি পেলেন খড়্গপুরের সুমন
লম্বাকৃতির এই পেঁপেগুলো ১৫–২০ সেন্টিমিটার লম্বা ও প্রতিটি ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম ওজনের হয়। মিষ্টি ও সুগন্ধযুক্ত কমলা রঙের লাল শাঁসযুক্ত এই পেঁপের ফলন সারা বছরই হয়। সাধারণত ৫ কেজি পেঁপে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়, তবে রমজান মাসে এর দাম বেড়ে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার প্রতিদিন চন্দননগরে ১০০ কেজি পেঁপে সরবরাহ করেন।
তিনি এঁটেল মাটিতে ছয় থেকে আট ফুট দূরত্বে চারা রোপণ করেন ও বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছগুলোকে অবলম্বন দেন। প্রতি দুই বছর অন্তর গাছ পরিবর্তন করতে হয়, যার জন্য প্রতি বিঘাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ লাগে ১ লক্ষ টাকা। তিনি সর্ষে ও চীনাবাদামের খইল, ইউরিয়া, মেরাইভন (Merivon) এবং কীটনাশক রোগর (Rogor) ব্যবহার করেন। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং ড. ডি. কে. ঘোষের নির্দেশনায় চাষাবাদের ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেছেন কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের ডেটা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পেঁপের মোট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩ লক্ষ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ আসে ভারত থেকে। প্রতিদিন হুগলি থেকে ২,৫০০ কেজি ফসল কলকাতায় পাঠানো হয়।
সত্তরোর্ধ্ব কৃষক কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার তাঁর এই কৃতিত্বের জন্য বেশ কিছু পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তিনি এখন অন্যান্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞান তাদের সাথে ভাগ করে নেন। বিশেষ করে ছোট আকারের পেঁপের বাজারে চাহিদা সম্পর্কে তিনি অন্য চাষিদের সচেতন করেন। তিনি আশা করেন যে, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আশেপাশের এলাকায় কৃষকরা অধিক ফলন পেতে ও তাদের আয় বাড়াতে সক্ষম হবেন। সত্তর পেরিয়ে আজও কৃষিকাজের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ খুঁজে পান কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার।










