আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: নারীর অধিকার (Woman’s Rights) ও স্বাধীনতার প্রশ্নে সমাজের একাংশের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আজও বড় বাধা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা আর্থিক স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে মহিলারা এগিয়ে গেলেও ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এখনও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। বিশেষ করে যাঁরা অবিবাহিত, একা থাকেন কিংবা পরিবারের কোনও পুরুষ সদস্যের সাহায্য ছাড়াই জীবনযাপন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট। নিজের উপার্জনে সংসার চালানো থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, কর্মজীবনের দায়িত্ব সামলানো কিংবা অসুস্থ অবস্থায় নিজের দেখভাল, সবই যখন একজন নারী একা করতে পারেন, তখন কর্মক্ষেত্রে অসুস্থতার খবর দেওয়া, ছুটির আবেদন করা বা হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য কেন তাঁকে স্বামী কিংবা পুরুষ অভিভাবকের পরিচয় দিতে হবে? একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর অধিকার কি তাঁর বৈবাহিক পরিচয় বা পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল?
হঠাৎ কেন উঠছে এই প্রশ্ন?
ভারতীয় সংবিধান ব্যক্তির অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থাকে কোনও শর্ত হিসেবে গণ্য হয় না। সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের চোখে সমানাধিকার, ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ২০১৭ সালের Justice K.S. Puttaswamy বনাম Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়। ব্যক্তির মর্যাদা, নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পরিসরের গুরুত্বও সেখানে বিশেষভাবে উঠে আসে। আবার ২০২২ সালের X বনাম Principal Secretary মামলায় আদালত স্পষ্ট করে যে, প্রজননস্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবাহিত এবং অবিবাহিত মহিলার মধ্যে বৈষম্য করা যায় না। অর্থাৎ, একজন নারীর অধিকার ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি তাঁর নিজের অস্তিত্ব। কোনও পুরুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ভিত্তি কখনোই সেই নারীর পরিচয় হতে পারে না।
কর্মক্ষেত্রেও অসুস্থতার ছুটি পাওয়ার জন্য স্বামী বা পুরুষ অভিভাবকের উপস্থিতিকে সাধারণ আইনি শর্ত হিসেবে দেখানোর কোনও ভিত্তি নেই। পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্ট বেঙ্গল সপস এন্ড এস্ট্যাবলিশমেন্টস অ্যাক্ট (West Bengal Shops and Establishments Act) 1963-এর ১১ নম্বর ধারায় কর্মীদের ছুটির অধিকার সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট শর্তে বছরে ১৪ দিন অর্ধবেতনে অসুস্থতাজনিত ছুটি, ১৪ দিন পূর্ণবেতনে প্রাপ্য ছুটি এবং ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটির কথা বলা হয়েছে। অসুস্থতার ছুটির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মেডিক্যাল সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু স্বামী বা পুরুষ অভিভাবকের পরিচয় দেওয়ার কথা এই ধারায় নেই। অন্যদিকে, অফিস বা হাসপাতালের ক্ষেত্রে ‘ইমার্জেন্সি কন্ট্যাক্ট’ অর্থাৎ জরুরি যোগাযোগের নম্বর চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। তবে জরুরি সময়ে যোগাযোগের জন্য কোনও বন্ধু, বিশ্বস্ত সহকর্মী বা মনোনীত ব্যক্তির নম্বর দেওয়া এবং তাঁকে আইনি অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রশাসনিক প্রয়োজনে যোগাযোগের তথ্য চাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার অজুহাতে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা বা তাঁকে মানসিক অস্বস্তিতে ফেলা উচিত নয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একজন নারীর একক পরিচয় তাঁর অধিকার পাওয়ার পথে বাধা হতে পারে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) প্রস্তাবিত ‘চার্টার অফ পেশেন্টস রাইটস’-এ রোগীর মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জানার অধিকার এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে সম্মতির গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। সেখানে জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৯ সালের Parmanand Katara বনাম Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানায়, জরুরি অবস্থায় আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতাল বা চিকিৎসকরা আইনি প্রক্রিয়া কিংবা অন্য কোনও অজুহাতে সময় নষ্ট করতে পারেন না। ফলে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ও সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম মহিলা অসুস্থ হলে তাঁর পাশে স্বামী, বাবা বা ভাই নেই বলে চিকিৎসার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে জটিল অস্ত্রোপচার, রোগীর অচেতন অবস্থা কিংবা বিশেষ চিকিৎসাগত পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সম্মতি বা সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
সমস্যার গভীরে রয়েছে সমাজের দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজন পুরুষ একা থাকলে তাঁকে স্বাবলম্বী কিংবা স্বাধীনচেতা হিসেবে দেখা হলেও একজন নারী একা থাকলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে শুরু হয় নানা প্রশ্ন। তাঁর স্বামী কোথায়, বিয়ে করেননি কেন, অসুস্থ হলে কে দেখাশোনা করবেন, এমন অপ্রাসঙ্গিক কৌতূহল অনেক সময় তাঁর যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও আত্মসম্মানকেও আড়াল করে দেয়। অথচ কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব কর্মীর কাজের মূল্যায়ন করা, তাঁর বৈবাহিক পরিচয় যাচাই করা নয়। একইভাবে হাসপাতালের দায়িত্ব রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেওয়া। একজন কর্মীর অসুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় নথি চাওয়া বা হাসপাতালের নিয়ম মেনে জরুরি যোগাযোগের তথ্য নেওয়া প্রশাসনিক প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কোনও নারীকে হেনস্থা করা বা তাঁর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। বিয়ে কোনও প্রশাসনিক পরিচয়পত্র নয়, স্বামীও কোনও নারীর অধিকার পাওয়ার আইনি নিশ্চয়তা নন।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের পার্টি অফিসে টাকার পাহাড়! উদ্ধার ১ কোটি ২ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা
একজন নারী নিজের উপার্জনে জীবনযাপন করলে তাঁকে নিয়ম মানতে হবে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য আত্মসম্মান ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে আপস করতে হবে কেন? নারী স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু অর্থ উপার্জন কিংবা বাড়ির বাইরে কাজ করা নয়, বরং অসুস্থ হলে নিজের চিকিৎসা করানোর অধিকার, নিজের ছুটির কারণ নিজে জানানোর অধিকার এবং কোনও পুরুষের অনুমোদন ছাড়াই সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা। বাবা, ভাই কিংবা স্বামী পাশে না থাকলেও একজন নারীর পরিচয় ও অধিকার সম্পূর্ণ। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যদি তাঁকে নিজের স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষ অভিভাবকের পরিচয় খুঁজতে হয়, তবে নারী স্বাধীনতা নিয়ে যাবতীয় প্রচার ও সামাজিক অগ্রগতির দাবিই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে।










