অনন্যা সরকার, কলকাতা: ভারতের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা বা গোদাবরীর মতো অনেক প্রধান নদী। কিন্তু জানেন কি এদেশের গভীরতম নদী (India’s Deepest River) কোনটি? না, গঙ্গা বা নর্মদা নয়। এর সঠিক উত্তরটি হল ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra River)। এটিকে শুধু ভারতের নয়, সারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও রহস্যময় নদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতের সাথে সাথে এই নদী বয়ে গেছে তিব্বত ও বাংলাদেশে ওপর দিয়েও। ব্রহ্মপুত্রের গভীরতা এতটাই বেশি যে, কিছু কিছু জায়গায় এটি প্রায় ৩৮০ ফুট (প্রায় ১১৬ মিটার) গভীরতায় পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, নদীগর্ভে ৫০ তলা বাড়িও তৈরি করা হলেও, তা সম্পূর্ণ জলের তলায় ডুবে থাকবে।
তিব্বত থেকে যাত্রা শুরু ব্রহ্মপুত্রের
ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। সেখানে এটি ইয়ারলুং সাংপো (Yarlung Tsangpo) নামে পরিচিত। এরপর নদীটি হিমালয় পর্বতের কিছু অংশ অতিক্রম করে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করেছে। সেখানে একে সিয়াং বা দিহাং (Siang) নামে ডাকা হয়। তারপর আসামে অনেক উপনদীর সাথে মিলিত হয়ে এটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয় ভারতের বাকি অংশে। নদীটি এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যেখানে এর নাম যমুনা। অবশেষে এটি গঙ্গা ও মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ও বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ গঠন করেছে।
আরও পড়ুন: কমছে স্টপেজ, এই স্টেশনগুলো দাঁড়াবে না শিয়ালদা-রানাঘাট এসি লোকাল, বিজ্ঞপ্তি রেলের
কতটা গভীর ব্রহ্মপুত্র?
ব্রহ্মপুত্র নদীর যাত্রাপথে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম গভীরতা দেখা যায়। সাধারণত, এর গড় গভীরতা প্রায় ১২৪ ফুট বা ৩৮ মিটার বলে ধরা হয়। তবে, কিছু কিছু জায়গায় এর গভীরতা ৩৮০ ফুট পর্যন্তও পৌঁছে যায়। তাই এটিকে ভারতের গভীরতম নদী হিসেবে গণ্য করা হয়। এর গভীরতার কারণে এই নদীতে জলের স্রোত প্রবল। বর্ষাকালে এর রূপ হয়ে ওঠে ভয়ানক।
এছাড়া, ব্রহ্মপুত্রের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি বিশ্বের অন্যতম গভীরতম নদী গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিব্বতের নামচা বারওয়া (Namcha Barwa) পর্বতমালার কাছে নদীটি একটি বিশাল বাঁক সৃষ্টি করেছে। এই এলাকাটিই ইয়ারলুং সাংপো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন নামে পরিচিত। এই গিরিখাতের গভীরতা আনুমানিক ৬,০০০ মিটার বা প্রায় ১৯,৭০০ ফুট, যা আমেরিকার সুপরিচিত গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর।
আরও পড়ুন: বর্ষায় জেগে ওঠে এই আশ্চর্য সুন্দর ঝর্ণা, ঘুরে আসুন বীরভূমের খয়েরবানির জলধারা
উল্লেখ্য, ব্রহ্মপুত্র নদ আসামের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই এটিকে আসামের ‘লাইফ লাইন’-ও বলা হয়। কৃষিকাজ, মৎসশিকার থেকে শুরু করে পানীয় জল এবং জল পরিবহনের জন্য আসামের মানুষ ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভর। কোনো না কোনোভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে এই নদীর সঙ্গে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে তাই গড়ে উঠেছে ভারতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এছাড়া, নদী বরাবর গঠিত ছোট ছোট দ্বীপগুলো আলাদা করে ব্রহ্মপুত্রকে চিনিয়ে দেয়। এগুলি মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদী দ্বীপ মাজুলিও।
একদিকে ব্রহ্মপুত্র যেমন হাত ভরে দেয়, তেমনই কেড়ে নেওয়ার সময়ও ভয়ংকর এই নদী। বর্ষার ভারী বৃষ্টিপাতের সাথে হিমালয় থেকে আসা নেমে আসা বরফগলা জলের কারণে দ্রুত বাড়ে এই নদীর জলস্তর। ফলে প্রতি বছর বর্ষাকালে আসাম ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার মানুষ বন্যায় ঘরছাড়া হন। কৃষিকাজ, পরিবহন এবং অন্যান্য জরুরী পরিষেবাও ব্যাহত হয়। তবে বন্যা শেষে মাটিকে উর্বর করে দিয়ে যায় ব্রহ্মপুত্রের জল, যা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি নদী নয়, এটি বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গভীরতা, তীব্র জলস্রোত ও অন্যতম গভীর গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলায় ব্রহ্মপুত্র ভারতের অন্যান্য নদীগুলির মধ্যেও স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছে।










