অনন্যা সরকার, কলকাতা: ভারতের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এবিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। এখন ইউক্যালিপটাস গাছের (Eucalyptus Tree) চাষের পরিবেশগত প্রভাব উদ্বেগ সারা বিশ্বের পরিবেশবিদদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ইউক্যালিপটাস গাছের প্রসার হয়েছে, যার ফলে বহু জায়গায় এই গাছের বিশাল বাগান গড়ে উঠেছে। তবে, বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই বাগানগুলো দেশগুলির অনেক অংশের দৃশ্যপটই পাল্টে দিয়েছে। বর্তমানে এই গাছগুলির ধারণ করা জলসম্পদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চারটি প্রধান দেশজুড়ে পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউক্যালিপটাস গাছ নিয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য উঠে এসেছে।
একাধিক দেশের জলস্তরে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে ইউক্যালিপটাস
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে ইউক্যালিপটাসের বাগান গড়ে তোলার মূল লক্ষ্যই ছিল দ্রুত গাছ বড় করা, পাল্প তৈরির জন্য সেগুলো কাটা এবং বিশ্বব্যাপী কাগজ শিল্পের জন্য একটি পুনঃব্যবহারযোগ্য সরবরাহ তৈরি করা। তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, শিল্পের বিকাশ করতে গিয়ে এটি ভূগর্ভস্থ জলের স্তরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মিনাস জেরাইসের একটি বিস্তৃত ইউক্যালিপটাস বাগানে, ৪৫ বছরে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ৪.৫ মিটার কমে গেছে। স্থানীয়রা এটিকে গ্রিন ডেসার্ট ‘সবুজ মরুভূমি’ বলতে শুরু করেছে।
এদিকে, একসময় ইউক্যালিপটাস গাছে ঢাকা আর্জেন্টিনার সুবিশাল পম্মাস তৃণভূমির ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ওপর বিপজ্জনক প্রভাব পড়েছে। বিজ্ঞানীরা মধ্য আর্জেন্টিনার বন্যাপ্রবণ পাম্মাস অঞ্চলের ৪০ হেক্টরের একটি বাগান নিয়ে গবেষণা করেছেন। বাগানের গাছগুলি রোপণ করা হয়েছিল ১৯৫১ সালে। দুই বছরব্যাপী এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইউক্যালিপটাস গাছ থাকা এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর তৃণভূমির তুলনায় ০.৫ মিটারেরও বেশি নীচে নেমে গেছে। এর ফলে মাটির নীচে একটি ঢাল তৈরি হয়েছে, যা তৃণভূমির জলকে আনুভূমিকভাবে বাগানগুলোর দিকে প্রবাহিত হতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ, ইউক্যালিপটাস গাছগুলো শুধু এর নীচে থাকা জল ব্যবহার করছে না, তার সাথে আশেপাশের এলাকা থেকেও ভূগর্ভস্থ জল শোষণ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইন্টারনেট পেতে পাহাড় চূড়ায় পড়াশোনা, NEET-এ সফল দুই বোন হবেন ডাক্তার
ইউক্যালিপটাস গাছের বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে দক্ষিণ আমেরিকার আরেক দেশ উরুগুয়েতেও। এদেশে পরিচালিত একটি ২০ বছরের গবেষণা এই প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান করেছে। গবেষকরা ২০০০ সাল থেকে দুটি সংলগ্ন ওয়াটারশেড বা জলবিভাজিকা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। একটিকে চারণভূমি হিসেবে রাখা হয়েছিল, আর অন্যটিতে ইউক্যালিপটাস ও পাইনের বাগান তৈরি করা হয়েছিল। দেখা গেছে গাছ লাগানোর ১৭ বছর পর, তৃণভূমির তুলনায় বনভূমিযুক্ত জলবিভাজিকাটিতে জলের পরিমাণ ৩৫% কমে গেছে।
আরও পড়ুন: ঘূর্ণাবর্তের জেরে দাপট দেখাবে বর্ষা! ভারী বৃষ্টি দক্ষিণবঙ্গের ৫ জেলায়, আজকের আবহাওয়া
পূর্ব আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় বাইরের দেশ থেকে আগত ইউক্যালিপটাসের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি শোষণ করে নেয়, যার ফলে অন্যান্য ব্যবহারের জন্য মাটির উর্বরতা কমছে। সেখানকার গবেষকরা জলের ব্যবহারের পাশাপশি মাটির গুণমান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রুয়ান্ডায় ইউক্যালিপটাস প্রধান ‘গার্ডেন ট্রি’-তে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বনভূমির ৭৮ শতাংশই ছিল ইউক্যালিপটাস। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে রুয়ান্ডা, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া এবং সুদানে মোট ৯৫,৬৮৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে ইউক্যালিপটাস বাগান ছিল, যার মধ্যে শুধু রুয়ান্ডাতেই ছিল প্রায় ২৩,০০০ হেক্টর। দক্ষিণ আমেরিকা হোক বা পূর্ব আফ্রিকা – সারা বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদরা এখন ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ওপর ইউক্যালিপটাসের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।










