ইন্টারনেট পেতে পাহাড় চূড়ায় পড়াশোনা, NEET-এ সফল দুই বোন হবেন ডাক্তার

Published:

NEET Success Story of Odisha Sisters

অনন্যা সরকার, ওড়িশা: কঠিন থেকে কঠিনতম পরীক্ষায় পাস করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শহরের নামি-দামী কোচিংয়ের প্রশিক্ষণ বা দ্রুতগতির ওয়াই-ফাইয়ের (WiFi) প্রয়োজন হয় না। দৃঢ় সংকল্প থাকলে, ভবিষ্যতের ভিত গড়া যায় পাহাড়ের চূড়াতেও। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার মহুলপঙ্খা গ্রামের দুই বোন, যাজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী খাতুয়া (NEET UG Success Story of Odisha Sisters) এই কথাটাই বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। এক দরিদ্র কৃষক ও এক অঙ্গনওয়াড়ি সহকারীর এই দুই কন্যা কোনও প্রাইভেট কোচিং ছাড়াই দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা, নিট (NEET UG) পাস করেছেন। এখন তাঁদের লক্ষ্য সফল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা। 

ইন্টারনেট পেতে পাহাড় চূড়ায় বসে পড়াশোনা দুই বোনের

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম মহুলপঙ্খার বাসিন্দা যাজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী খাতুয়া। দুই বোনই ছোট থেকে পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। দু’জনেই দেখেছিলেন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। নিটের প্রস্তুতির জন্য অনলাইন ক্লাস করা অপরিহার্য ছিল, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে তাঁদের বাড়িতে পাওয়াই যায় না ইন্টানেটে সংযোগ। তবে দুজনের মধ্যেই ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য জেদ। তাই বাড়িতে নেটওয়ার্ক সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা না করে তারা কাছের পাহাড়গুলোতে উঠে যেতেন, যেখানে সিগন্যাল তুলনামূলকভাবে ভালো পাওয়া যেত, সেখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা চলতো তাঁদের অনলাইন ক্লাস ও পড়াশোনা।

যাজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী খাতুয়ার বাবা গৌরাঙ্গ খাতুয়া একজন কৃষক, আর মা সুনিতা খাতুয়া অঙ্গনওয়াড়িতে সহায়িকার কাজ করেন। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে নিটের ব্যয়বহুল কোচিংয়ের খরচ জোগানো তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই বড় কোনও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর না করে তারা অনলাইন ক্লাস, নোটস এবং সেলফ-স্টাডির মাধ্যমে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। তবে অনলাইন শিক্ষার পথটিও তাদের জন্য সহজ ছিল না। মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল পাওয়ার জন্য তাদের প্রায়শই কাছের পাহাড়ে বা ঘন জঙ্গলে ভরা এলাকায় যেতে হত এবং কখনও কখনও দীর্ঘ সময় ধরে সেখানেই বসে পড়াশোনা করতে হত। 

আরও পড়ুন: “ইনি আমার মা” পশুর চারা বিক্রি করে ডাক্তারি পড়ানো জননীকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ছেলের

এক সাক্ষাতকারে তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে দুই বোনে মিলে গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতেন। শহরের শিক্ষার্থীদের কাছে যে সমস্ত সুযোগসুবিধা অত্যন্ত সহজলভ্য, সেই একই সুযোগ পেতে তাদের বাড়তি প্রতিবন্ধকতা জয় করতে হয়েছিল।  বড় বোন যাজ্ঞসেনী তৃতীয়বারের চেষ্টায় নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, আর ছোট বোন দিব্যসেনী সফল হয়েছেন প্রথমবারেই। কোচিংয়ের সুযোগ না থাকায়, ছোট বোনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যাজ্ঞসেনীর ভূমিকা ছিল প্রচুর। 

সীমিত আয় সত্ত্বেও তাদের বাবা-মা সবসময় মেয়েদের পাশে থেকেছেন এবং তাদের পড়াশোনায় যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করেছেন। ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারে পড়ার সামর্থ্য না থাকলেও, যাজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনীর পড়াশোনা কখনোই থেমে থাকেনি, বরং তারা স্মার্টফোন ও অনলাইন শিক্ষার বিভিন্ন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নেন। তাদের এই সাফল্যের যেমন একদিকে, আর্থিক অনটন ও প্রত্যন্ত গ্রামের পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকটি তুলে ধরে, তেমনি দুই বোনের নিরলস কঠোর পরিশ্রমের কাহিনীও সামনে আনে, যা দেশের লক্ষ লক্ষ পরিশ্রমী ছাত্রছাত্রীদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।