ডায়নোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া উল্কাটিকে চেনা গেল এতদিনে, আলোড়ন বিজ্ঞানীমহলে

Published:

Dinosaur Extinction

অনন্যা সরকার, কলকাতা: একটা সময় ছিল যখন ডাইনোসররা (Dinosaur) পৃথিবীতে রাজত্ব করত। মানুষের আগমনের লক্ষ লক্ষ বছর আগেই সম্পূর্ণ ডাইনোসর প্রজাতির বিলুপ্তি হয়। কীভাবে পৃথিবী থেকে অস্তিত্ব শেষ হয়েছিল এই বিশালাকার প্রাণীগুলির – তা নিয়ে অসংখ্য গবেষণা ইতিমধ্যেই হয়েছে। এখন এরকমই একটি গবেষনা  সামনে এসেছে। গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল ক্রিটেশিয়াস-প্যালিওজিন (Cretaceous-Paleogene) সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট মাটির একটি পাতলা স্তরে বিদ্যমান নিকেল আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে নতুন তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে। বিজ্ঞানীরা সেই উল্কাপিণ্ডটির (Meteorite) ধরন শনাক্ত করেছেন, যা ৬.৬ কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি ছিল একটি সিও কন্ড্রাইট(CO Chondrite), যা আমাদের সৌরজগতের অন্যতম বিরল ও প্রাচীন উল্কাপিণ্ড।

ডাইনোসরদের ধ্বংস করে সিও কন্ড্রাইট উল্কাপিণ্ড

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (UBC), প্যারিস, ব্রাসেলস এবং ভিয়েনার গবেষকদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল এই তথ্য সামনে এনেছে। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ (Science Advances)-এর এক প্রবন্ধে তাদের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলি প্রকাশিত হয়েছে। এর থেকে জানা যায় যে, ৬.৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের ইতিহাসে বৃহত্তম গণবিলুপ্তিটি ঘটে। উল্কাপিন্ডের আঘাতে উড়তে অক্ষম ডাইনোসর এবং অন্যান্য জীবজন্তু একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

এই তথ্য অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা সামনে এনেছেন যে, ১০ কিলোমিটার চওড়া একটি গ্রহাণু পৃথিবীর ইউকাটান উপদ্বীপে আঘাত হেনেছিল। এই আঘাতে একটি বিশাল গর্ত (Chicxulub crater) তৈরি হয় এবং সমস্ত ডানাবিহীন ডাইনোসর সহ পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই বিধ্বংসী আঘাতের ফলে ব্যাপক ভূমিকম্প ও সুনামির সৃষ্টি হয়, ভয়ঙ্কর দাবানলে ছাই হয়ে যায় বিস্তীর্ণ জঙ্গল এবং বায়ুমণ্ডলে এত বেশি ধুলো ও গ্যাস নির্গত হতে থাকে, যে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা পায়, যা সারা বিশ্বের জলবায়ুকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই উল্কাপিণ্ডটিকে একটি কার্বনেশিয়াস সিও কন্ড্রাইট হিসেবে শনাক্ত করেছে। এটি একটি বিরল ধরনের উল্কাপিণ্ড। পৃথিবীতে পাওয়া সমস্ত উল্কাপিণ্ডের মাত্র ৫ শতাংশ হল এই সিও কন্ড্রাইট। গবেষকরা মনে করেন, এটি সম্ভবত বৃহস্পতির বাইরের গ্রহাণু বলয় অথবা সৌরজগতের দূরবর্তী কোনো ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছে। উল্কাপিণ্ডটির সাথে সংঘর্ষ কেন এত বিধ্বংসী ছিল, সেই বিষয়ে নতুন করে আলোকপাত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানান, সিও কন্ড্রাইটে খুব অল্প পরিমাণে সালফার থাকে। তাই বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ উল্কাপিণ্ডটির নিজস্ব সালফার নয়। কারণ হল মহাকাশে ও বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া ধূলিকণা, যা বছরের পর বছর ধরে সূর্যালোককে আটকে রেখেছিল।

আরও পড়ুন: ‘মানব সভ্যতার সূচনা ভারতেই!’ গুজরাটের প্রাচীনতম বন্দর দেখিয়ে দাবি ব্রিটিশ ঐতিহাসিকবিদের

প্রসঙ্গত, অন্যান্য উল্কাপিণ্ডের তুলনায় সিও কন্ড্রাইটে জিঙ্ক, কার্বন, জল এবং বিশেষ করে সালফারের মতো উপাদান অনেক কম পরিমাণে থাকে। এই নয়া আবিষ্কার সংঘর্ষ সম্পর্কিত পূর্বধারণাগুলিকে পাল্টায় না, তবে এটা স্পষ্ট করে যে উল্কাপিণ্ডের সালফার এই ব্যাপক গণবিলুপ্তির মূল কারণ ছিল না। বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা এবং ধ্বংসাবশেষই ছিল প্রধান কারণ। গবেষকরা জানিয়েছেন, তাঁদের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে এই উল্কাপাতের ঘটনাটি কতটা বিরল ছিল, যখন পৃথিবীর সাথে সৌরজগতের অন্যতম বিরল একটি উল্কাপিণ্ডের সংঘর্ষ হয়।

আরও Dinosaur Meteorite