আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক ছবিটাই বদলে গিয়েছে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতা হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress), রাজ্যে জয় পেয়েছে বিজেপি (Bhartiya Janata Party)। শুধু সরকার বদল নয়, এই নির্বাচনের পর দলের অন্দরেও তৈরি হয়েছে বড়সড় ভাঙন। একদিকে মমতা ব্যানার্জির (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির, অন্যদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জির (Ritabrata Banerjee) নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবির, দুই শিবিরের সংঘাত এখন প্রকাশ্যে। যে দলের নেতৃত্বে একসময় রাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন মমতা, সেই দলেরই নেতা ঋতব্রত আজ তাঁকে অসুস্থ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা ব্যানার্জিকে ঘিরে রাজনৈতিক কটাক্ষ অব্যাহত। বিশেষ করে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা হচ্ছে। নন্দীগ্রামের মানুষের অভিমান এবং ভবানীপুর কেন্দ্র ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে মমতাকে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “নন্দীগ্রামের জনগণকে ধন্যবাদ। তাঁরা অভিমান করে বলেছিল আমায়, যাতে ভবানীপুর কেন্দ্র ছেড়ে দিই। আমি বলেছি, যিনি দুবার আমার কাছে হেরেছেন, তিনি আবার দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেন। এই বয়সে আর না দাঁড়ানোই ভালো। ৭৫ বছর বয়স। এখন বিশ্রাম নেওয়ার কথা।” এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে মমতার বয়স ও নির্বাচনী পরাজয়কে নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ঋতব্রতর বক্তব্য
একই সুরে কথা বললেন ঋতব্রত ব্যানার্জি। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মমতা ব্যানার্জির বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “দেখুন, আমি আগেও বলেছি, ৪ তারিখ রেজাল্ট বেরোনোর পর ৬ তারিখ কালীঘাটের মিটিংয়ে উনি বলেছিলেন ১৮০টা আসনে জিতেছি। ১৯ তারিখ বললেন ২৩০টা আসনে জিতেছি। এটা একটা ডিনায়াল সিন্ড্রোম। এটা হচ্ছে মানেই ভালো করে ডাক্তার দেখানো উচিত।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: “ওনার প্রতীকেই জিতেছি” ঋতব্রত শিবির ছেড়ে ফের মমতার তৃণমূলে ফিরলেন এক বিধায়ক
এদিকে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে আইনি ও সাংগঠনিক লড়াই। মমতা ব্যানার্জি এবং ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন দুই পক্ষই নিজেদের আসল তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে মূল দলের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দুই গোষ্ঠীর জন্য আলাদা নাম ও প্রতীকও নির্ধারণ করা হয়। মমতা শিবির পেয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক। অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবিরের নাম হয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’, তাদের প্রতীক ‘খাম’। ফলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি দলের পরিচয়, নেতৃত্ব ও প্রতীকের অধিকার নিয়েও টানাপড়েন অব্যাহত।
আরও পড়ুন: বীরভূমের লাভপুরে রামমন্দিরে ভাঙা হল রাম-সীতার মূর্তি, ছড়িয়ে রহস্যজনক পদার্থ
সত্তরের দশকে কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর ১৯৯৮ সালে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তোলেন তিনি। বাম শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতা দখল, প্রতিটি ধাপে নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন মমতা। কিন্তু আজ সেই দলেরই একাংশের বিরোধিতার সম্মুখীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচনী পরাজয়, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং নাম-প্রতীকের লড়াই, সব মিলিয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী। নিজের হাতে গড়ে তোলা দলের মধ্যেই ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছেন মমতা। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, নিজের অবস্থানে অনড় থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তাই দিয়ে চলেছেন তিনি।










